kalerkantho


উন্নয়নে সরব আ. লীগ, নীরবে চাঙ্গা বিএনপি

মনিরুজ্জামান, নরসিংদী   

১৫ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



উন্নয়নে সরব আ. লীগ, নীরবে চাঙ্গা বিএনপি

আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নরসিংদী জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনে প্রচার-প্রচারণায় চাঙ্গা সব কটি রাজনৈতিক দল। তবে কেউ সরবে, কেউ নীরবে। দিন যত ঘনিয়ে আসছে তত বাড়ছে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। এসব জল্পনা-কল্পনার বেশির ভাগ জুড়ে আছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। আবার উন্নয়নের মহাসড়কে সরব থাকলেও বিএনপিকে নিয়ে চিন্তিত আওয়ামী লীগ। আর মামলা ও গ্রেপ্তার আতঙ্কে নীরবে দল গোছাচ্ছে বিএনপি।

নরসিংদী-১ (সদর) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য হলেন লে. কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম হীরু বীরপ্রতীক। তিনি নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী। এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখায় আগামী নির্বাচনে এ আসন থেকে দলের একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকলেও নজরুল ইসলামের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে জানিয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এর বাইরে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি জি এম তালেব ও যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা আইয়ুব খান মনোনয়নপ্রত্যাশী।

অন্যদিকে বিএনপি থেকে এককভাবে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও জেলা বিএনপির সভাপতি খায়রুল কবীর খোকন। তবে এ আসনে তিনবারের জনপ্রিয় সংসদ সদস্য প্রয়াত সামসুউদ্দীন আহমেদ এছাকের ছেলে জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদও এ আসন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশায় এলাকায় পোস্টার-ফেস্টুন লাগিয়ে নিজের অবস্থান জানান দিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি থেকে এ আসনে মো. শফিকুল ইসলাম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে জানিয়েছেন।

নরসিংদী-২ (সদর ও পলাশ) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য কামরুল আশরাফ খান পোটন। তিনি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর বড় ভাই সাবেক সংসদ সদস্য ও পলাশ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ারুল আশরাফ খান দিলীপ। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বর্তমান সংসদ সদস্য কামরুল আশরাফ খান পোটন তাঁর বড় ভাই আনোয়ারুল আশরাফ খান দিলীপকে আসনটি ছেড়ে দিয়ে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী করবেন বলে দলের নেতাকর্মীরা জানিয়েছে। তবে এ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত আহমেদুল কবিরের ছেলে দৈনিক সংবাদের সম্পাদক আলতামাশ কবির মিশুও মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নের প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে গণসংযোগ করে যাচ্ছেন।

এদিকে এ আসনে গত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জোটগত কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে শরিক দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ-ইনু) আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও নরসিংদী জেলার সভাপতি জায়েদুল কবির নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করে স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। এবারও তিনি জাসদ থেকে মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেবেন।

তবে এ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য পরিবারের একক আধিপত্যে অনেকটা কোণঠাসা বিএনপি। গত পাঁচ বছরে বিএনপি স্থানীয়ভাবে দলীয় কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারেনি। এ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান একক প্রার্থী। অন্যদিকে এ আসনে জাতীয় পার্টি থেকে প্রেসিডিয়াম সদস্য আজম খান ও কেন্দ্রীয় যুগ্ম যুববিষয়ক সম্পাদক আবু সাঈদ স্বপন গণসংযোগ করে যাচ্ছেন।

নরসিংদী-৩ (শিবপুর) আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য সিরাজুল ইসলাম মোল্লা। তিনি কেন্দ্রীয় যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হয়েও গত দশম সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য জহিরুল হক ভুইয়া মোহনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করেন। কিন্তু তিনি স্থানীয় আবদুল মান্নান ভূঁইয়া পরিষদের অনুসারীদের সহায়তা নেওয়ায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিরাগভাজন হয়ে পড়েন; যার রেশ এখনো কাটেনি। তবে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন এবং পরিচ্ছন্ন রাজনীতির কারণে তিনি বেশ সুনাম অর্জন করেছেন। তাঁর পাশাপাশি সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি জহিরুল হক ভুইয়া মোহন, শিবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হারুনুর রশিদ খান, সাধারণ সম্পাদক সামসুল আলম ভূইয়া রাখিল এ আসন থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী। 

এ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে সর্বাধিক আলোচনায় রয়েছেন টানা দুইবারের সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সহসভাপতি বিশিষ্ট শিল্পপতি মনজুর এলাহী। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ও খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মাস্টার, শিবপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হারিছ রিকাবদার ওরফে কালা মিয়া ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান মিন্টু।

এ ছাড়া জেলা জাতীয় পার্টির সিনিয়র সহসভাপতি রেজাউল করিম বাসেত, কেন্দ্রীয় সদস্য আলমগীর কবির এবং জেলা জাতীয় পার্টির সহসভাপতি ও শিবপুর উপজেলা সভাপতি জাহাঙ্গীর পাঠানের নাম শোনা যাচ্ছে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে।

নরসিংদী-৪ (মনোহরদী-বেলাব) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন। তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কীয় সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য। তিনি কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছিলেন। এ আসন থেকে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে দলের নেতাকর্মীদের নানা অভিযোগ থাকলেও মনোহরদী ও বেলাব উপজেলায় আওয়ামী লীগের শক্ত ভিত গড়েছেন তিনি। এ আসনে বেলাব উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক উপদেষ্টা অহিদুল হক আসলাম সানি, মনোহরদী উপজেলা চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম খান বীরু, জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. আবদুর রউফ সরদার, কেন্দ্রীয় যুবলীগের উপশিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও পাঠাগার বিষয়ক সম্পাদক কাজী মাজহারুল ইসলাম ও আওয়ামী লীগ নেতা কর্নেল (অব.) আবদুর রউফ বীরবিক্রম মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমান সংসদ সদস্যের বাইরে এই পাঁচ নেতা জোটবদ্ধ হয়ে গণসংযোগ চালাচ্ছেন।

এদিকে জেলা বিএনপির সহসভাপতি জয়নাল আবেদীনের সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে গত ১০ বছরে দলকে সংগঠিত করা যায়নি; যে কারণে এলাকায় দলীয় কোনো কর্মসূচি পালন করা যায়নি। এ অবস্থায় দলীয় নেতাকর্মীদের অনেকে দ্বারস্থ হচ্ছে সংস্কারপন্থী নেতা সাবেক সংসদ সদস্য সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের কাছে। এরই ধারাবাহিকতায় দলীয় নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করতে গত ২৭ সেপ্টেম্বর দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মনোহরদী উপজেলায় সাবেক সংসদ সদস্য সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলকে আহ্বায়ক এবং তাঁরই অনুসারী আমিনুর রহমান সরকার দোলনকে সদস্যসচিব করে ১৪০ সদস্যের কমিটির অনুমোদন দেন। পাশাপাশি এ সংসদীয় আসনের অপর উপজেলা বেলাবতে উপজেলা চেয়ারম্যান আহসান হাবীব বিপ্লবকে আহ্বায়ক এবং আবদুল কাদির জলিলকে যুগ্ম সচিব করে ১৩৪ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন দেন। বেলাব উপজেলা চেয়ারম্যান আহসান হাবীব বিপ্লবও সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। এদিকে এ দুই উপজেলায় নতুন কমিটি গঠনের পর দলীয় দিকনির্দেশনা পেয়ে চাঙ্গা বিএনপির নেতাকর্মীরা। তাই তৃণমূলের নেতাকর্মীরা সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলকে দলে ফিরে পেয়ে আসনটি পুনরুদ্ধার করতে উঠেপড়ে লেগেছে।

নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসনে দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের দখলে থাকায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা বেড়েছে। ২৪ ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত রায়পুরা উপজেলা দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি। ক্ষমতাসীন দলের শক্তিশালী একাধিক প্রার্থী থাকলেও বিএনপিতে তেমনটি নেই। তবে প্রবীণ রাজনীতিবিদ সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহম্মেদ রাজুকে ঠেকাতে মাঠে নেমেছেন আওয়ামী লীগের নবীন-প্রবীণ চার নেতা। এ দলে রাজুর ছোট ভাই সালাউদ্দিন আহম্মেদ বাচ্চুও রয়েছেন। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এ বি এম রিয়াজুল কবির কাওছার, কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশীদ, কেন্দ্রীয় কৃষক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ সামছুল হক ও ব্যারিস্টার তৌফিকুর রহমান মনোনয়ন প্রত্যাশায় মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। এর মধ্যে এ বি এম রিয়াজুল কবির কাওছার ও হারুন অর রশীদ রায়পুরায় বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরে প্রতিদিন গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।

এদিকে দীর্ঘদিন মাঠে না থাকলেও বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে রায়পুরা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি জামাল আহমেদ চৌধুরীর নাম শোনা যাচ্ছে। এ ছাড়া বিএনপির দুর্দিনের কাণ্ডারি বীর মুক্তিযোদ্ধা, কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহসভাপতি ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এ কে নেছার উদ্দিন, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সহসম্পাদক আশরাফ উদ্দিন বকুল মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে দীর্ঘদিন এলাকায় প্রচার ও দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক ও উপজেলার সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার এম এ সাত্তার ও কেন্দ্রীয় নেতা শহিদুল্লাহ ভূঁইয়া মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে মাঠে সক্রিয় আছেন। 

 

উন্নয়নই সব আসনে জয় এনে দেবে

বিএনপির পক্ষে নীরব ভোট বিপ্লব হবে



মন্তব্য