kalerkantho


২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা

পলাতক আসামিরা কে কোথায়

আশরাফ-উল-আলম   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



পলাতক আসামিরা কে কোথায়

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষণা হবে ১০ অক্টোবর। বহুল আলোচিত এ মামলার আসামি ৪৯ জন। এর মধ্যে পলাতক রয়েছেন ১৮ জন। মামলার বিচারের শুরু থেকেই তাঁরা পলাতক রয়েছেন। পলাতকদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান, বিএনপির প্রভাবশালী নেতা হারিছ চৌধুরী, বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, হানিফ পরিবহনের মালিক মো. হানিফ।

অন্য যারা পলাতক রয়েছেন তাঁরা হলেন নিষিদ্ধ ঘোষিত হরকাতুল জেহাদের কর্মী মাওলানা তাজউদ্দিন, রাতুল আহমেদ ওরফে রাতুল বাবু ওরফে রাতুল, মহিবুল মুত্তাকীন, আনিসুল মুরসালিন, মুফতি শফিকুর রহমান, জাহাঙ্গির আলম বদর, মো. খলিল, মো. ইকবাল, মাওলানা লিটন ওরফে দেলোয়ার হোসেন ওরফে জোবায়ের, মুফতি আবদুল হাই, লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন, পুলিশের সাবেক ডিআইজি খান সাঈদ হাসান (২০০৪ সালে ডিসি, ঢাকা দক্ষিণ) ও পুলিশ সুপার মো. ওবায়দুর রহমান খান (সাবেক ডিসি, ঢাকা পূর্ব)।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার পর হতাহতদের কয়েকজন।  —ফাইল ছবি

২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলাসহ একাধিক মামলার আসামি তারেক রহমান এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ৭ মার্চ দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার হন। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, আয়কর ফাঁকি, অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলা হয়। এসব মামলায় প্রায় দেড় বছর কারাভোগ করার পর ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পান। পরে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। এরপর আর দেশে ফেরেননি তিনি। ২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা মামলার তদন্তের পর তাঁকে আসামি করা হয়। তাঁর অনুপস্থিতিতেই মামলার কার্যক্রম চলে। বর্তমানেও তিনি লন্ডনেই আছেন। ইন্টারপোলের মাধ্যমে চেষ্টা করেও তাঁকে দেশে ফেরত আনা সম্ভব হয়নি। তিনি ওই দেশের সরকারের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন। এমনকি তিনি বাংলাদেশি পাসপোর্ট হস্তান্তর করে ওই দেশের পাসপোর্ট গ্রহণের আবেদন করেছেন বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের প্রভাবশালী নেতা সিলেটের হারিছ চৌধুরীর কোনো খোঁজ আজও বের করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। প্রায় দশ বছর ধরে বিদেশে গা ঢাকা দিয়ে আছেন এই হারিছ চৌধুরী। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলার চার্জশিটে অভিযুক্ত হারিছ চৌধুরী পলাতক। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। সিলেটের সীমান্তবর্তী এলাকা কানাইঘাটের দর্পনগর গ্রামের বাসিন্দা হারিছের নানাবাড়ি ভারতের করিমগঞ্জে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি পালিয়ে ভারতে যান। এরপর তিনি পাকিস্তান যান। বর্তমানে তিনি পরিবারের সঙ্গে লন্ডনে আছেন বলে জানা গেছে। তবে কেউ তাঁর সুনির্দিষ্ট খোঁজ দিতে পারছে না।

কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য। একসময় জাতীয় পার্টিতে ছিলেন তিনি। তাঁর এলাকা কুমিল্লার মুরাদনগর থেকে তিনি পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার চার্জশিটভুক্ত অন্যতম আসামি। শারীরিক অসুস্থতার কথা বলে সংসদ থেকে ছুটি নিয়ে চিকিৎসার জন্য তিনি সিঙ্গাপুরে যান ২০০৯ সালে। এরপর আর তিনি দেশে ফেরেননি। কায়কোবাদ বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।

হানিফ পরিবহনের মালিক হানিফও ২১ আগস্ট মামলার আসামি। এই মামলায় চার্জশিটভুক্ত হওয়ার পর তিনি বিদেশে চলে যান। এরপর আর ফেরেননি। তিনি সিঙ্গাপুরে দীর্ঘদিন ছিলেন বলে জানা গেছে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে তিনি পর্যায়ক্রমে থাকছেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন।

হরকাতুল জিহাদ নেতা ও মুফতি হান্নানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মাওলানা তাজউদ্দিন (হামলায় গ্রেনেড সরবরাহকারী) দীর্ঘদিন ধরে পলাতক। গ্রেনেড হামলার পর তারেক রহমান ও তৎকালীন ডিজিএফআইয়ের কতিপয় কর্মকর্তা তাঁকে পাকিস্তান পাঠিয়ে দেন বলে ২১ আগস্ট মামলার অন্য আসামিরা জানিয়েছেন। সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর (মামলার অন্যতম আসামি) ভাই তাজউদ্দিন এখন দক্ষিণ আফ্রিকায় আছেন বলে জানা গেছে। পিন্টুর আরেক ভাই রাতুল বাবু এই মামলার অন্যতম আসামি। রাতুল বাবুও ভারতে পাড়ি জমিয়েছেন বলে এলাকায় জনশ্রুতি আছে। তবে তাঁর সর্বশেষ অবস্থান সম্পর্কে জানা যায়নি।

মহিবুল মুত্তাকীন ও আনিসুল মুরসালিন দুই ভাই। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার রহস্য উদ্ঘাটন শুরু হলে তাঁদের নাম সামনে চলে আসে। এরপর থেকেই তাঁরা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। সেখানে জঙ্গি তৎপরতায় লিপ্ত হন বলে গণমাধ্যমে খবর আসে। বর্তমানে তাঁরা ভারতের তিহার কারাগারে রয়েছেন। আবার অসমর্থিত খবরে কেউ কেউ বলছে ভারতে একটি বোমা বিস্ফোরণে তাঁরা মারা গেছেন। তবে এসংক্রান্ত কোনো দলিলপত্র নেই। ২১ আগস্ট মামলার কাগজপত্রে তাঁরা পলাতক রয়েছেন।

জঙ্গি নেতা মুফতি শফিকুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মো. খলিল, মো. ইকবাল, মাওলানা লিটন ওরফে দেলোয়ার হোসেন ওরফে জোবায়ের ও মুফতি আবদুল হাইও ২১ আগস্টের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন হওয়া শুরু হলে দেশ ছেড়ে পালান। তবে তাঁদের মধ্যে কে কোথায় আছেন তা জানা যায়নি। ভারত ও পাকিস্তানে তাঁরা আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানা গেছে। আবার কেউ কেউ মনে করে, দু-একজন দেশের ভেতরে থেকে জঙ্গি কার্যক্রম চালাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে পরিচয় গোপন করে ভিন্ন নামে তারা তৎপরতা চালাতে পারে বলে অনেকের ধারণা।

ডিজিএফআইয়ের সিটিআইবির সাবেক জিওএস-১  লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার ও পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিনও ২১ আগস্ট মামলার সম্পূরক অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি। আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল হওয়ার আগেই এই দুজন পালিয়ে যান। জোয়ার্দার কানাডায় ও এ টি এম আমিন যুক্তরাষ্ট্রে আছেন বলে জানা গেছে। পুলিশের ডিআইজি খান সাঈদ হাসান (সাবেক ডিসি, ঢাকা দক্ষিণ) ও পুলিশ সুপার মো. ওবায়দুর রহমান খান (সাবেক ডিসি, ঢাকা পূর্ব) মামলার চার্জশিট হওয়ার পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। তাঁরা কেথায় আছেন তা জানা যায়নি। তবে কারো কারো মতে তাঁরা ইউরোপের কোনো দেশে অবস্থান নিয়েছেন।



মন্তব্য