kalerkantho


সেই ১২ ছাত্রকে রবিবার গ্রেপ্তারের কথা বলছে পুলিশ

♦ সবাই শিবিরকর্মী
♦ নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে গুজব ছড়ানোর অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



সেই ১২ ছাত্রকে রবিবার গ্রেপ্তারের কথা বলছে পুলিশ

নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করা ১২ শিক্ষার্থীকে গতকাল সিএমএম কোর্টে হাজির করা হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানীর তেজগাঁওয়ের তেজকুনীপাড়া থেকে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয়ে তুলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠা সেই ১২ শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাঁচ দিন আগে তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয় বলে পরিবার দাবি করলেও পুলিশ বলছে, গত রবিবার রাতে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল সোমবার দুপুরে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন জানানো হয়। আদালত ১১ জনকে দুই দিনের এবং ১ জনকে চার দিনের জন্য রিমান্ডে পাঠিয়েছেন। পুলিশ বলছে, তারা সবাই ছাত্রশিবিরের কর্মী এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় তারা গুজব ছড়িয়েছে এবং ভাঙচুরে অংশ নিয়েছে।

গত ৫ সেপ্টেম্বর রাতে তাদের গ্রেপ্তার করা হয় দাবি করে গত রবিবার সংবাদ সম্মেলন করে ওই শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ ও ক্ষোভ জানান। গতকাল পুলিশের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (ডিসি মিডিয়া) মো. মাসুদুর রহমান বলেন, ‘পরিবার কী দাবি করল, তা জানার বিষয় না। পুলিশ তাদের গত রবিবার রাতে গ্রেপ্তার করেছে। তারা হয়তো আগে থেকে পালিয়ে ছিল। তারা তো নিজের বাসায় থাকত না, মেসে থাকত। এ কারণে পরিবার অনেক কিছু দাবি করতে পারে। তবে আসল ঘটনা কী, তা তো কেউ খুঁজতে আসে না। আন্দোলনকে (নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন) ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেই তারা অনুপ্রবেশ করে ভিন্ন স্বার্থ হাসিল করতে চেয়েছিল।’

গতকাল দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মাসুদুর রহমান বলেন, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় দায়ের করা দুটি মামলায় এই ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তারেক আজিজ নামের একজন সম্প্রতি নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন চলাকালে গুজব সৃষ্টিকারীদের অন্যতম হোতা ছিল।

তারেক আজিজ ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র। গ্রেপ্তার হওয়া অন্যরা হলো ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র ইফতেখার আলম, রায়হানুল আবেদিন জুয়েল, তারেক আজিজ (২), বোরহান উদ্দিন, মাহফুজ আহমেদ, মেহেদী হাসান রাজিব, বাংলাদেশ টেক্সটাইল ইউনিভার্সিটির মুজাহিদুল ইসলাম, তিতুমীর কলেজের জাহাঙ্গীর আলম, করটিয়া সরকারি সা’দত কলেজের সাইফুল্লাহ মানসুর এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তীচ্ছু জহিরুল ইসলাম হাসিব ও আল আমিন। দুটি মামলার মধ্যে তারেক আজিজের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা হয়েছে। অন্য মামলাটি হয়েছে পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া ও গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগে। এই মামলায় ১২ জনকেই আসামি করা হয়েছে।

ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, গ্রেপ্তারের সময় ওই ১২ জনের কাছ থেকে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের মনোগ্রামসহ ভুয়া আইডি কার্ড, ১২ সেট স্কুল ড্রেস বা ইউনিফর্ম, ১৩টি ফিতা, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মপদ্ধতির বিভিন্ন ফরম, শিবিরের কিশোর কণ্ঠ ও ম্যাগাজিনসহ ইসলামী বই, বিভিন্ন কার্যক্রমের বিষয়ে লেখা ডায়েরি, হাতুড়ি, স্ক্রু-ড্রাইভার, ম্যাগনিফাইং গ্লাস, কাটার, হ্যান্ডমাইক, ছুরি, তিনটি ল্যাপটপসহ বেশ কিছু সরঞ্জাম এবং ফেসবুকে পোস্ট করা বিভিন্ন ভিডিওসহ ছবি জব্দ করা হয়েছে। তাদের ফেসবুক ওয়ালে পোস্ট করা কিছু গুজবের নমুনাও পেয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ; যেমন—‘জিগাতলাই কি হয়েছে স্টুডেন্টের মুখ থেকে শুনুন; ৪ জন মারা গেছে; ৪ জনকে ধর্ষণ করা হয়েছে; শিক্ষা মন্ত্রীর গাড়ির লাইসেন্স নাই; পুলিশ ঘুষ খায়; মন্ত্রী এমপি সবাই চোর।’

গত রবিবার বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনে এক ব্রিফিংয়ে ওই শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা দাবি করেন, গত ৫ সেপ্টেম্বর রাতে ১২ জনকে তুলে নিয়ে ডিবি কার্যালয়ে আটকে রাখা হয়েছিল। আটকের কারণ চার দিনেও জানানো হয়নি তাঁদের।

গ্রেপ্তারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, তাদের সবাই শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাদের কেউ সদস্য আবার ওয়ার্ড সভাপতিও রয়েছে। জাহাঙ্গীর একজন সদস্য এবং সে নিজেকে শিবিরের সাংগঠনিক সম্পাদক বলে দাবি করেছে।

যারা হেলমেট পরে সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়েছিল তাদের কোনো খোঁজ মিলেছে কি না জানতে চাইলে ব্রিফিংয়ে বলা হয়, ‘তাদেরও চিহ্নিত করার কাজ চলছে। তাদের কাছ থেকেও হ্যান্ডমাইক, হাতুড়ি ও ছুরি পাওয়া গেছে। তাই শিবিরকর্মীরাও ওই হামলা চালাতে পারে। তবে তাদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে। হেলমেট বাহিনীকেও পাওয়া যাবে।’ 

ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, গত ৬ আগস্ট দুপুরে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার আহছানউল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যলয়ের ৪০০ থেকে ৫০০ জন একত্র হয়ে আহছানউল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে সরকারবিরোধী বিভিন্ন উত্তেজনাকর স্লোগান দিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। উছৃঙ্খল ছাত্ররা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। ছাত্রদের ইটপাটকেলের আঘাতে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার পিআই আবু হাজ্জাজ, এসআই ইমাম হোসেন, এএসআই  আজাদ ও  ইব্রাহিমসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। ছাত্র আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করা ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম মূল হোতা তারেক আজিজ ফেসবুক টাইম লাইনের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত করত।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ঢাকা মহানগর উত্তরের উপকমিশনার মো. মশিউর  রহমান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, গত রবিবার সন্ধ্যায় তেজকুনীপাড়ার একটি ভবনের নিচতলায় গোপন বৈঠকের সময় ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

অভিভাবকদের দাবি

মাহফুজ নামের শিক্ষার্থীর মামা নবী উল্লাহ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার ভাগ্নেকে বুধবার ভোরে তেজকুনীপাড়ার একটি মেস থেকে ধরে নেওয়ার পর নিখোঁজ ছিল।’ ছেলে মুজাহিদুল ইসলামকে ডিবি কার্যালয়ে ৫ সেপ্টেম্বর থেকে আটক রাখা হয়েছিল দাবি করে তার বাবা মাহবুব আলম বলেন, ‘ছেলের মেস থেকে একজন আমাকে ফোন করে জানান, ভোরে ডিবি এসে মুজাহিদকে তুলে নিয়ে গেছে।’ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা হাসিবের বাবা এনামুল হক ডিবি ফটকে থেকে ছেলের সন্ধান না পেয়ে তেজগাঁও থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে যান। কিন্তু পুলিশ জিডি নেয়নি দাবি করে তিনি বলেন, চার দিনেও তাদের আদালতে হাজির না করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আইন লঙ্ঘন করেছেন।



মন্তব্য