kalerkantho


দেশেও বিক্রি হচ্ছে ‘খাত’!

♦ বিমানবন্দরে এবার এই মাদকদ্রব্যের ১৮০০ কেজির বিশাল চালান জব্দ
♦ গ্রিন টির নামে চলছে কারবার

এস এম আজাদ   

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



দেশেও বিক্রি হচ্ছে ‘খাত’!

গ্রিন টির (বিশেষ চা) নামে কয়েক বছর ধরে নিউ সাইকোট্রফিক সাবসটেনসেস (এনপিএস) জাতীয় মাদকদ্রব্য ‘খাত’ দেশে ঢুকছে। একটি-দুটি নয়, দেশের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান এই কারবারের সঙ্গে জড়িত। এমন ১৯টি ঠিকানা পাওয়া গেছে। অবশ্য এসব ঠিকানার বেশির ভাগই ভুয়া বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দারা। তাঁরা বলছেন, এসব চালান এনে মাদক কারবারিরা অন্য দেশে পাঠাচ্ছে। তবে দেশেও এই মাদক বিক্রি হওয়ার তথ্য পেয়েছেন তাঁরা।

আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়া ছাড়াও কেনিয়া থেকে এসেছে এই মাদকদ্রব্যটি। সর্বশেষ গতকাল রবিবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্তত এক হাজার ৮০০ কেজির বিশাল একটি চালান জব্দ করা হয়েছে, যা এখন পর্যন্ত দেশে উদ্ধার হওয়া ‘খাত’ নামের এই মাদকদ্রব্যের চালানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। গতকাল রাত পর্যন্ত অভিযান চলছিল বলে জানিয়েছে একাধিক গোয়েন্দা সূত্র। আজ সোমবার সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ বিষয়ে তারা বিস্তারিত জানাতে পারে।

গত এক সপ্তাহে বিমানবন্দরে চারটি অভিযানে প্রায় দুই হাজার ৬৮০ কেজি ‘খাত’ জব্দ করা হয়।

জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) নজরুল ইসলাম সিকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে বড় চালান ঢোকার তথ্য পেয়ে আমরাও অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এরই মধ্যে গতকাল কাস্টমস ও সিআইডি ওই চালান জব্দ করে। এসব চালানে যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা মিলেছে, তা ধরে কাজ চলছে।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দেশে এটি ব্যবহার হচ্ছে কি না বা কারা করছে, সেটি নিয়েও তদন্ত শুরু হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য ও চালান উদ্ধারের পর এ ব্যাপারে আমরা আরো সতর্ক হয়েছি।’

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গত ৩১ আগস্ট বিমানবন্দরে দেশে প্রথম ‘খাত’ চালান আটক করে ডিএনসি। ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবার জিয়াদ মোহাম্মাদ ইউসুফ নামের এক ব্যক্তি ঢাকার শান্তিনগরের নওয়াহিন এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নামে চালানটি পাঠায়। সেদিন বিমানবন্দর ও শান্তিনগর প্লাজা থেকে মোট ৮৬০ কেজি ‘খাত’সহ নাজিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত বুধবার বিমানবন্দরে তল্লাশি চালিয়ে একই ধরনের ২০ কেজি মাদক জব্দ করেন ডিএনসির গোয়েন্দারা। এরপর শনিবার কার্গো ইউনিটের অভ্যন্তরে ‘ফরেইন পোস্ট অফিসের’ মাধ্যমে ১৬০ কেজির একটি চালান জব্দ করেছে ঢাকা কাস্টমস হাউস। ওই চালানটিও ইথিওপিয়ার জিয়াদ মুহাম্মদ ইউসুফ নামে এসেছে। তবে আমদানিকারক এশা এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে ঢাকার তুরাগ থানাধীন বাউনিয়ার ব্লক-ডি, সড়ক-২, হাউস নম্বর-২৮। ওই ঠিকানায় গিয়ে প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব মেলেনি। তবে তদন্তে বাবু নামের এক ব্যক্তির সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে বলে গোয়েন্দা সূত্রটি জানায়। সূত্রটি জানায়, বাবুকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। জব্দ খাত নমুনাগুলো ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।

এদিকে তিন দফায় চালান জব্দের তদন্তে তথ্য মিলে গত ছয় মাসে আরো কয়েকটি বড় চালান ঢুকেছে দেশে। ডিএনসিসহ কয়েকটি সংস্থা তল্লাশি অভিযানে নামে। এরই মধ্যে গতকাল কাস্টমস হাউসের সহায়তায় সিআইডি চারটি চালানের ৯৬ কার্টন শনাক্ত করে। এগুলো এশা এন্টারপ্রাইজ, মতি এন্টারপ্রাইজ, আলমগীর এন্টারপ্রাইজ ও আরেকটি প্রতিষ্ঠানের নামে আসে। বেশির ভাগই এসেছে ইথিওপিয়ার জিয়াদ মুহাম্মদ ইউসুফের কাছ থেকে। তবে কেনিয়া থেকেও এসেছে কয়েকটি কার্টন। একটি চালান ছয় মাস আগে আসে। মালিকানাসহ অন্য জটিলতার কারণে বিমানবন্দরে আটকে ছিল সেটি। এক সপ্তাহ আগে আসে একটি। বাকি দুই চালান দুই-তিন মাসের মধ্যে এসেছে। এগুলো গ্রিন টির মতো প্যাকেটে ও খোলা রয়েছে।

একটি সূত্র জানায়, সিআইডি এরই মধ্যে গ্রহণকারী বা আমদানিকারকের ঠিকানা যাচাই শুরু করেছে। অন্য সংস্থাগুলোও তদন্ত করছে। তাদের ধারণা, এখন পর্যন্ত ১৯টি ঠিকানা পাওয়া গেলেও আরো বেশিসংখ্যক ব্যক্তি খাত বিক্রির সঙ্গে জড়িত।

একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছেন, গ্রহণকারী হিসেবে যে চারটি প্রতিষ্ঠানের নাম আছে, এর মধ্যে দুটি ঠিকানা যাচাই করে গোয়েন্দারা ভুয়া বলে নিশ্চিত হয়েছে। একইভাবে ১৯ জন গ্রহণকারীর ঠিকানা পাওয়া গেছে, যার বেশির ভাগই ভুয়া। সর্বপ্রথম চালানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঢাকার শান্তিনগরের নওয়াহিন এন্টারপ্রাইজ নামের প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার নাজিম জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, বড় চালান ইউরোপ ও আমেরিকার দেশে রপ্তানি বা পাচার করা হলেও কিছু ছোট চালান ঢাকায় তিনি বিক্রি করেছেন। একজন ক্রেতার নাম-ঠিকানাও পেয়েছে গোয়েন্দারা। ‘খাত’ কারবারে জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযানে নেমেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) ও সিআইডির গোয়েন্দা।

সংশ্লিষ্ট এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, নাজিমকে আদালতের নির্দেশে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। গতকাল ছিল রিমান্ডের দ্বিতীয় দিন। ওই জিজ্ঞাসাবাদে দেশে আরো খাত আমদানিকারক থাকা এবং কয়েকটি চালান ঢুকে পড়ার তথ্য মেলে। দেশি-বিদেশি গোয়েন্দা সূত্রেও কিছু তথ্য পাওয়া গেছে।

ডিএনসির এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, ‘খাত’ গাছটি পপির মতোই। আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে এই গাছের পুরোটাই শুকিয়ে গুঁড়া করে মাদক হিসেবে ব্যবহার করে। তবে মাদকের শ্রেণি অনুযায়ী এটি এনপিএস জাতীয়। এটি বাংলাদেশে ১৯৬১ সালের প্রচলিত মাদক আইন বা ১৯৭১ সালের ওষুধ আইনে নিয়ন্ত্রণযোগ্য নয়। যদিও জনস্বাস্থ্যের জন্য এটি প্রচণ্ড রকমের ক্ষতিকর। পণ্যটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯০ এর ‘খ’ তফসিলে ২ নম্বর ক্রমিকভুক্ত, যা একই আইনের ১৯ (১) টেবিলের ১০ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এটি মূলত চিবিয়ে বা পানিতে গুলিয়ে চায়ের মতো খাওয়া হয়। খাওয়ার পর ইয়াবার মতোই ক্লান্তি না আসা, ঘুম না হওয়াসহ শারীরিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এনপিএস আসক্ত ব্যক্তি মানসিক বৈকল্যে ভোগে। কর্মস্পৃহা হারিয়ে ফেলে। বেঁচে থাকা তার কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। কেউ কেউ আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এনপিএস জাতীয় মাদকদ্রব্য ‘খাত’ দেশে ব্যাপক হারে ব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা। এরই মধ্যে ইয়াবার বিকল্প হিসেবে অল্প পরিসরে ব্যবহার শুরু হয়েছে বলেও গোয়েন্দারা জানতে পেরেছে। মাদকদ্রব্য হিসেবে অপরিচিত হওয়ায় এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইয়াবাসহ প্রচলিত মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরুর কারণে ‘খাত’ কারবার বেড়েছে বলেও ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডিএনসির এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, এনপিএস জাতীয় মাদক এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে। জাতিসংঘ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউনাইটেড নেশন্স অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইম (ইউএনওডিসি) একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বিশ্বে মাদক সেবনপ্রবণ ৮০টি দেশ এবং অঞ্চলে জরিপ করে ৭০টিতেই এনপিএসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। মাদক পাচারের গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল ও গোল্ডেন ক্রিসেন্টের মাঝামাঝি অবস্থান হওয়ায় এবং ইয়াবা বিস্তারের কারণে ২০১৫ সালে সংস্থাটি বাংলাদেশকে এনপিএস জাতীয় মাদকের ব্যাপারে সতর্ক করে।



মন্তব্য