kalerkantho


বগুড়ায় জেএমবির শীর্ষ পাঁচ নেতা গ্রেপ্তার

রাজশাহীর চেয়ারম্যান কুড়িগ্রামের আ. লীগ নেতাকে হত্যার ছক গাজীপুরে!

নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



রাজশাহীর চেয়ারম্যান কুড়িগ্রামের আ. লীগ নেতাকে হত্যার ছক গাজীপুরে!

জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (পুরনো জেএমবি) রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ইছাবা (সামরিক) প্রধানসহ শীর্ষস্থানীয় পাঁচ নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের হেডকোয়ার্টার্স ইন্টেলিজেন্স শাখা ও বগুড়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশের যৌথ টিম মঙ্গলবার গভীর রাতে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার মির্জাপুর-রানীরহাট সড়ক মোড় থেকে তাদের গ্রেপ্তার করেছে। এ সময় তাদের দেহ তল্লাশি করে দুটি বিদেশি পিস্তল, ১০ রাউন্ড গুলি, তিনটি ধারালো চাকু ও এক জোড়া হাতকড়া উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার পাঁচজনকে তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত।

বগুড়া পুলিশের শীর্ষ এক কর্মকর্তা জানান, একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের এক নেতাকে হত্যা করাসহ দল গোছানো, কিলিং টার্গেট সফল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে পুরনো জেএমবি। নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনটির নেতাকর্মীরা একের পর এক পুলিশি অভিযানে ধরা পড়ায় বেকায়দায় পড়েছে জঙ্গি দলটি। এ অবস্থায় দেশের উত্তরাঞ্চলকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে নতুন করে দল গোছানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। অস্ত্র ও অর্থ সংগ্রহে কাজ করে যাচ্ছে দলের একটি বিশেষ ইউনিট। উত্তরাঞ্চলের কিলিং মিশনের শীর্ষ পাঁচ সদস্যকে ডেকে নিয়ে পুরনো জেএমবির বাংলাদেশের প্রধান সমন্বয়ক ও শুরা সদস্য খোরশেদ মাস্টার এসব তথ্য জানায় বলে গ্রেপ্তারকৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে।

গাজীপুরের শ্রীপুর থানা এলাকায় পুরনো জেএমবির আট সদস্যের দলের হাইপ্রফাইল এক গোপন বৈঠক হয় গত মঙ্গলবার। এদের মধ্যে উত্তরাঞ্চলেরই ছিল পাঁচজন। সেখান থেকে ফেরার পথে গ্রেপ্তার হওয়া এই পাঁচ জঙ্গি হলো পুরনো জেএমবির রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ইছাবা (সামরিক) প্রধান জামালপুরের বড়াইকুড়া গ্রামের মৃত লোকমান আলীর ছেলে শহিদুল ইসলাম ওরফে মাসুম ওরফে গোপাল ওরফে ইয়ামিন (৪৬), রাজশাহী বিভাগের সামরিক শাখার প্রধান রাজশাহীর বেলপুকুর থানার ক্ষুদ্র জামিরা গ্রামের আকবর আলীর ছেলে বুলবুল ওরফে সোহাগ (৩২), রাজশাহী বিভাগের সামরিক শাখার সদস্য একই এলাকার একরামুল হকের ছেলে মাসুদ রানা (৩১), সামরিক শাখার সদস্য রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার আস্করপুরের উৎপল হারার ছেলে নওমুসলিম আতিকুর রহমন ওরফে সৈকত (৩৩) এবং সামরিক শাখার সদস্য চারঘাট উপজেলার আশকোরপুর গ্রামের মৃত আবু তালেবের ছেলে মিজানুর রহমান ওরফে দর্জি মিজান (৩৫)।

বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভুঞা গতকাল বুধবার জানান, গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ওই পাঁচ জেএমবি নেতা মঙ্গলবার গাজীপুরের শ্রীপুরে পুরনো জেএমবির বাংলাদেশের প্রধান সমন্বয়ক ও শুরা সদস্য খোরশেদ মাস্টারের সঙ্গে বৈঠক করে। একটি ওভারব্রিজের নিচে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে দেশের উত্তরবঙ্গে জেএমবির বর্তমান কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। পরে ওই পাঁচজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয় উত্তরবঙ্গে সংগঠনের সামরিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের। সে অনুযায়ী তারা মঙ্গলবার রাতে উত্তরবঙ্গের উদ্দেশে গাজীপুর থেকে রওনা হয়। রাত দেড়টার দিকে তারা শেরপুর উপজেলার মির্জাপুর-রানীরহাট সড়ক মোড়ে নেমে দুই দলে ভাগ হয়ে অন্য কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা করছিল। এমন সময় পুলিশের দল তাদের গ্রেপ্তার করে।

জঙ্গি ইস্যুতে কাজ করা একজন শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা জানান, উত্তরাঞ্চলজুড়ে একের পর এক পুলিশি অভিযানে জেএমবির সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় আস্তানা, অস্ত্র ও অর্থ সংকটে ওই অঞ্চলের কিলিং মিশনের সদস্যরাও হাইকমান্ডের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে পারছে না। কিলিং মিশনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল রাজশাহীর পুঠিয়ার একজন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতা এবং কুড়িগ্রামের একজন ইউপি চেয়ারম্যানকে খুন করার। কিন্তু তারা তা বাস্তবায়ন করতে না পারায় খোরশেদ মাস্টার ক্ষুব্ধ হয়। সে উত্তরাঞ্চলের কিলিং মিশনের ওই পাঁচ নেতাকে গাজীপুরে ডেকে এনে বৈঠক করে। তাদের চাহিদামতো অস্ত্র সরবরাহ করে যার যার টার্গেটে চলে যেতে বলে। সেখান থেকে বের হয়ে টার্গেট ঠিকানায় যাওয়ার পথেই তার গ্রেপ্তার হয়।

সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে বুলবুল ওরফে সোহাগ, মাসুদ রানা, নওমুসলিম আতিকুর রহমান ও দর্জি মিজান ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে রাজশাহীর মতিহার এলাকায় ডিবি পুলিশ পরিচয়ে রহমান জুটমিলের ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা ডাকাতি করেছিল। এ ছাড়া ২০১৬ সালে রাজশাহীতে বিকাশকর্মীকে খুন করে টাকা ছিনতাই এবং একই সময়ে রাজশাহীর চারঘাটে দুটি মোটরসাইকেলসহ দুই লাখ টাকা ছিনতাইয়ের সঙ্গেও তারা জড়িত ছিল। এ ছাড়া পুলিশের পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন স্থানে ডাকাতি, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়ের কথা তারা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে। মতিহার এলাকায় ডাকাতির ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে রাজশাহী ডিবি পুলিশের কাছে মামলা তদন্তাধীন।

পুলিশের ওই সূত্র আরো জানায়, বর্তমানে রংপুর বিভাগের কয়েকটি জেলায় জেএমবি গোপনে কাজ করে যাচ্ছে, এমন তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। দলটি নতুন সদস্য ও অর্থ জোগানের দিকে মনোযোগী হয়েছে বেশি। আর অস্ত্র আসছে সীমান্ত দিয়ে চোরাপথে। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশে বড় ধরনের অরাজকতা সৃষ্টির পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে তারা।

গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গিদের মধ্যে শহিদুল ইসলাম ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা নবারণ বিদ্যানিকেতন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৯২ সালে এসএসসি পাস করেছে। নওমুসলিম আতিকুর রহমান ২০১০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে বিএসএস (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করে। তার এসএসসি ও এইচএইচসি ছিল রাজশাহীর সারদায়। মাসুদ রানা ২০১৩ সালে রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে ইসলাম শিক্ষা বিষয়ে প্রিভিয়াস মাস্টার্স ও বুলবুল ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে। আর মিজানুর রহমান স্বশিক্ষিত।

বগুড়া ডিবি পুলিশের ওসি নুরে আলম সিদ্দিকী জানান, গ্রেপ্তারকৃতদের নামে শেরপুর থানায় গোয়েন্দা পুলিশের এস আই ফিরোজ সরকার বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা করেছেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের এসআই নুরুজ্জামান। গতকাল দুপুরে পাঁচজনকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চাইলে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবু রায়হান তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।



মন্তব্য