kalerkantho


যুদ্ধাপরাধের বিচারের বড় ঝুঁকিতে ফেসবুক

মেহেদী হাসান   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



যুদ্ধাপরাধের বিচারের বড় ঝুঁকিতে ফেসবুক

মিয়ানমারের সেনাপ্রধানসহ বেশ কয়েকজন ব্যক্তির পেজ মুছে দিয়েই পার পাচ্ছে না সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক কর্তৃপক্ষ। বরং দিনের পর দিন সেই পেজগুলো থেকে বিদ্বেষ, সহিংসতা ও গণহত্যার যে উসকানি দেওয়া হয়েছে, এর জন্য যুদ্ধাপরাধের বিচারের মুখোমুখি হওয়ার বড় ঝুঁকিতে আছে তারা।

সদ্য বিদায়ী জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার যায়ীদ রা’দ আল হুসেইন গত শুক্রবার তাঁর দায়িত্ব ছাড়ার আগে হুঁশিয়ার করে বলেছেন, ফেসবুকের ভূমিকাই তাকে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলেছে। ফেসবুক ভয়ংকর সব অপরাধের উসকানি দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষ করে, ফেসবুক কর্তৃপক্ষ তাদের যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে মিয়ানমারে উসকানি ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণা প্রতিরোধকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে যায়ীদ রা’দ আল হুসেইনের দেওয়া এ বক্তব্য ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফে গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর দায়িত্বের মেয়াদ গত শুক্রবার শেষ হয়েছে। বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার রক্ষায় নেতৃত্ব দিতে গতকাল শনিবার নতুন মানবাধিকার কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন চিলির দুইবারের প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাশেলেট।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, যায়ীদ রা’দ আল হুসেইন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের প্রধান হিসেবেই ফেসবুককে ওই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এ বিষয়ে নতুন প্রধানেরও ভিন্ন অবস্থান নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ ফেসবুকের বিতর্কিত ভূমিকার বিষয়টি গত সোমবার মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের সত্যানুসন্ধানী দলের প্রকাশিত প্রতিবেদনেও এসেছে। ওই প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার বাহিনীর গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জোরালো সুপারিশ করা হয়েছে।

সত্যানুসন্ধানী দলের ২০ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা গেছে, সেখানে অন্তত ১২ বার ফেসবুকের প্রসঙ্গ উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবেদনটির ৭৪তম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বেশির ভাগ ব্যক্তিই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ইন্টারনেটে ফেসবুক ব্যবহার করে। যারা ঘৃণা ছড়াতে চায় তাদের কাছে ফেসবুক বেশ কাজের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।’

ওই অনুচ্ছেদে আরো বলা হয়, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ফেসবুকের ভূমিকার কিছুটা উন্নতি হলেও সার্বিকভাবে ঘৃণা-বিদ্বেষ সৃষ্টিকারী বার্তা ও লেখালেখির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে ধীরগতি এবং তা অকার্যকর বলে প্রমাণ হয়েছে।

ওই অনুচ্ছেদের শেষাংশে বলা হয়েছে, ‘ফেসবুকের যেসব পোস্ট ও বার্তা বাস্তব জীবনে বৈষম্য ও সহিংসতায় রূপ নিয়েছে, সেগুলো অবশ্যই স্বাধীনভাবে ও পুরোপুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা (তদন্ত) করতে হবে। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ তাদের মাধ্যম ব্যবহার করে ঘৃণ্য বার্তা প্রচার বিষয়ে দেশওয়ারি তথ্য-উপাত্ত দিতে না পারায় সত্যানুসন্ধানী দল দুঃখ বোধ করছে। দলটি মনে করে, ফেসবুক কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছিল কি না, তা যাচাইয়ের জন্য দেশভিত্তিক তথ্য-উপাত্ত পাওয়া আবশ্যক।’

সত্যানুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনের বিভিন্ন অংশে ফেসবুক ব্যবহার করে মিয়ানমার সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ও সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের রোহিঙ্গাবিরোধী বক্তব্য ও প্রচারণার উদাহরণ রয়েছে।

গত সোমবার ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই ফেসবুক কর্তৃপক্ষ মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং, সামরিক বাহিনীর টেলিভিশন চ্যানেল মায়াওয়াদি টিভিসহ দেশটির মোট ২০ ব্যক্তি ও সংস্থাকে নিষিদ্ধ করে। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ সেদিন এক বিবৃতিতে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত ১৮টি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, একটি ইনস্টাগ্রাম আইডি ও ৫২টি ফেসবুক পেজ মুছে ফেলার কথা জানায়। এই অ্যাকাউন্টগুলোর প্রায় এক কোটি ২০ লাখ অনুসারী ছিল। মুছে ফেললেও অ্যাকাউন্টগুলোর তথ্য-উপাত্ত ফেসবুক কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করার কথা জানায়।

ফেসবুক কর্তৃপক্ষের দাবি, এ মাসের শুরুতেই তারা ঘৃণা ও অসত্য তথ্য প্রচার প্রতিরোধে উদ্যোগ নেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিল। ধীর গতিতে হলেও তারা কাজ শুরু করেছে। ঘৃণা, বিদ্বেষ ছড়ানো কথাবার্তা শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, ঘৃণা, বিদ্বেষমূলক তথ্য-উপাত্ত সম্পর্কে জানানোর ব্যবস্থাসহ আরো বেশি বেশি পর্যালোচনার সুযোগ রাখা হচ্ছে।

ফেসবুক কর্তৃপক্ষ অসত্য তথ্য ছড়ানোর সঙ্গে সম্পৃক্ত মিয়ানমারের ৪৬টি পেজ ও ১২টি অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলার তথ্য তুলে ধরে বলেছে, তারা তাদের সাম্প্রতিক একটি অনুসন্ধানে দেখতে পেয়েছে দৃশ্যত স্বাধীন সংবাদ ও মতামতবিষয়ক একটি পেজের আড়ালে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর বার্তা প্রচার করা হয়েছে।

ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বলেছে, ‘ফেসবুকে এ ধরনের আচরণ নিষিদ্ধ। কারণ আমরা চাই, জনগণ যাদের সঙ্গে সংযুক্ত আছে তাদের ওপর আস্থা রাখুক।’

সদ্য বিদায়ী জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার যায়ীদ রা’দ আল হুসেইন বলেছেন, ‘মিয়ানমারে আমরা যা দেখছিলাম তাতে বেশ অস্বস্তিতে ছিলাম। শুরুর দিকে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকে আমরা এ বিষয়টি তুলেছিলাম। তবে তারা এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল বলে আমার মনে হয়নি। আশা করা যায়, এখন তাদের ঘুম ভেঙেছে।’ মিয়ানমার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি এমন একটি দেশ, যেখানে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে এবং ফেসবুক সেখানে প্রভাবশালী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।

ফেসবুক কর্তৃপক্ষকে ইঙ্গিত করে যায়ীদ রা’দ আল হুসেইন বলেন, ‘তাদের নিশ্চিত হতে হবে তারা কোথায় আছে এবং কোন পক্ষে আছে।’ ফেসবুক কর্তৃপক্ষকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুসরণ করতেও তিনি পরামর্শ দিয়েছেন।



মন্তব্য