kalerkantho


অপহরণ মামলা করে বাদী হাওয়া!

আশরাফ-উল-আলম   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



অপহরণ মামলা করে বাদী হাওয়া!

প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা করার পর খোঁজ নেই বাদী ও সাক্ষীদের। এখন বছরের পর বছর দুুই ভাই আদালতে ঘুরে ঘুরে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। মামলার আসামিরা হচ্ছেন ফরহাদ হোসেন অলু ও নাজমুল ইসলাম। রাজধানীর গেণ্ডারিয়া থানার হরিচরণ রোডের বাসিন্দা তাঁরা। তাঁদের দাবি, এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা মামলা। আর মিথ্যা মামলা বলেই গত সাত বছরে সাক্ষীরা হাজির হচ্ছেন না। ফরহাদ হোসেন অলু বলেন, ‘আমরা চরম ভোগান্তিতে আছি। সাক্ষী আদালতে হাজির হয় না। মামলাও শেষ হয় না।’

মামলাটি বর্তমানে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। নথি থেকে জানা যায়, গত ১৪ মার্চ তৎকালীন বিচারক মো. কামরুল হোসেন মোল্লা এক আদেশে বলেছেন, ‘২০১১ সালের ৩ মে দাখিল করা এজাহারের ভিত্তিতে এই মামলার উদ্ভব হয়। ২০১২ সালের ৫ মে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১০ জন এই মামলার সাক্ষী। এর মধ্যে একজন সাক্ষী আদালতে হাজির হয়েছিলেন। সাক্ষীদের প্রতি বিভিন্ন সময়ে সমন, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার পরও তাঁরা আদালতে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছেন না। ফলে মামলাটির ন্যায়বিচারে অহেতুক বিলম্ব হচ্ছে, যা নিতান্তই অনভিপ্রেত।’ বিচারক ওই দিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তাসহ সব সাক্ষীর বিরুদ্ধে অজামিনযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। কিন্তু এরপর তিনটি ধার্য তারিখ পার হলেও কোনো সাক্ষীকেই আদালতে হাজির করতে পারেনি পুলিশ।

গত ৮ আগস্টও এ মামলার ধার্য তারিখ ছিল। ওই দিন রাষ্ট্রপক্ষে  অতিরিক্ত পিপি আদালতকে জানান, সাক্ষীরা এখন আর মামলায় উল্লেখ করা ঠিকানায় নেই। কিন্তু মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক কে এম ইমরুল কায়েশ আসামিপক্ষের মামলা নিষ্পত্তির আবেদনে সাড়া না দিয়ে তদন্ত কর্মকর্তাকে হাজির হতে বলেছেন। এ মামলায় দেখা যায়, মামলার বাদী একবার হাজির হয়ে (২০ অক্টোবর ২০১৬) আংশিক সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনিও আর হাজির হননি। একজন আংশিক সাক্ষ্য দেওয়ায় মামলা নিষ্পত্তিতে আইনগত জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় বিচারক তদন্ত কর্মকর্তাকে এসে সাক্ষ্য দেওয়ার নির্দেশ দেন।

গেণ্ডারিয়া থানা থেকে গত ২৯ এপ্রিল একটি প্রতিবেদন দিয়ে আদালতকে জানানো হয়েছে, মামলার সাক্ষীদের বাসায় গিয়ে জানা গেছে তাঁরা এখন আর ওই ঠিকানায় থাকেন না। তবে বাড়ির মালিককে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর পরও সাক্ষীরা হাজির হননি। মহানগর দায়রা আদালতের অতিরিক্ত পিপি সাজ্জাদুল হক শিহাব কালের কণ্ঠকে বলেন, সাক্ষী হাজির না হলে মামলা আর এগোবে না। আগামী ধার্য তারিখে তদন্ত কর্মকর্তা বা অন্য সাক্ষীদের হাজির করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

মামলার বিবরণে জানা যায়, রাজধানীর গেণ্ডারিয়া থানার হরিচরণ রায় রোডের বাসিন্দা মালেকা বেগম ২০১১ সালের ৩ মে গেণ্ডারিয়া থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন। মামলায় বলা হয়, আগের দিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে তাঁর স্বামী মো. জসিম বাসা থেকে বের হন। এরপর তাঁর পূর্বপরিচিত অলি, শাকিল, জুলহাসসহ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর তিনি বাসায় ফোন করেন। পরে সূত্রাপুরের দিকে যান। রাত পৌনে ১১টার দিকে এক ব্যক্তি ফোন করে জানান, তাঁর স্বামী জসিমকে কয়েকজন লোক রিকশা থেকে জোর করে নামিয়ে অপহরণ করে নিয়ে গেছে।

মামলার নথি থেকে দেখা যায়, ঘটনাটি তদন্ত করেন গেণ্ডারিয়া থানার এসআই আবদুল আলী। ২০১১ সালের ৩১ ডিসেম্বর তিনি ফরহাদ হোসেন অলি ও নাজমুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন। ওই অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, মামলার ভিকটিম জসিম উদ্দিনের জবানবন্দি ও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা পর্যবেক্ষণ করে তিনি দুজন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণ করেছেন।

ভিকটিমের ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে দেখা যায়, তাঁকে কারো হেফাজত থেকে উদ্ধার করা হয়নি। তিনি জানিয়েছেন, তাঁকে অপহরণ করার পর তিনি অলি ও নাজমুলকে চিনতে পেরেছেন। তবে সেখানে ছয়-সাতজন ছিল। তাঁকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়া হয়। কোথায় নেওয়া হয় তা তিনি জানেন না। তবে তাঁকে মারধর করার পর মারা গেছে মনে করে সোনারগাঁর একটি রাস্তায় ফেলে রেখে যায়।

মামলার এজাহার, চার্জশিট ও ভিকটিমের জবানবন্দিতে তাঁকে অপহরণের কোনো কারণ উল্লেখ নেই। পূর্বশত্রুতা আছে এমন কথাও কোথাও উল্লেখ নেই। তবে ঢাকার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আসামিদের বাবা আবুল হাসেম হাওলাদার একটি মামলা করেছিলেন। এ মামলায় সাক্ষী জসিম, ইকবাল ও ইকবালের স্ত্রীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ করা হয়।

গেণ্ডারিয়া এলাকার এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর ঘনিষ্ঠজন এ মামলার ভিকটিম জসিম। এ বিষয়ে এলাকাবাসী পুলিশ কমিশনারের কাছে ২০০৯ সালে বিভিন্ন অভিযোগ এনে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানায়। এ কারণেই অপহরণ মামলা সাজানো হয়েছে বলে আসামিরা দাবি করেন। এই হয়রানির শেষ হবে কবে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন দুই আসামি।



মন্তব্য