kalerkantho


সিলেট আওয়ামী লীগ

‘বিশ্বাসঘাতকদের’ খোঁজে কাদের

পার্থ সারথি দাস, সিলেট থেকে ফিরে    

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



‘বিশ্বাসঘাতকদের’ খোঁজে কাদের

সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পরাজয়ের পর দলে অনৈক্য ও কলহকেই দায়ী করেছিল আওয়ামী লীগ। গত বৃহস্পতিবার সিলেট গিয়ে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। গতকাল শুক্রবার সকাল পর্যন্ত তিনি সেখানে ছিলেন। এ সময় স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ছাড়াও নেতাদের কাছ থেকে পরিস্থিতি অবহিত হন। এর আগে থেকেই তিনি সিলেট আওয়ামী লীগের ওপর বিশেষ নজর রাখছেন।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরুর আগেই সিলেট আওয়ামী লীগের ভেতর ‘বিশ্বাসঘাতকদের’ বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সিলেট আওয়ামী লীগে বিশ্বাসঘাতকদের খুঁজছেন ওবায়দুল কাদের।

বৃহস্পতিবার বিকেলে স্থানীয় রেজিস্টারি মাঠে শোক দিবসের আলোচনাসভায় দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে ওবায়দুল কাদের যোগ দেন। এটা যে নেহাতই সভায় যোগ দেওয়া নয়, সেটা জানা গেল দলের বিভিন্ন সূত্রে। ওই সব সূত্র বলছে, দলের অনেকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখতেই মূলত ওবায়দুল কাদের সিলেট সফর করেন। বৃহস্পতিবার রাতে সিলেট সার্কিট হাউসে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন তিনি। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় মেয়র প্রার্থীর পরাজয়কে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রতারণার শামিল বলে আখ্যায়িত করেছেন তিনি। ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এভাবে সংগঠন চলতে পারে না। তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, সিটি নির্বাচনে দলীয় মেয়র প্রার্থীর পরাজয়ের পেছনে যে বা যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা সে যত প্রভাবশালীই হোক।

গত ৩০ জুলাই সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী জয়লাভ করেন। পরাজিত হন আওয়ামী লীগের মেয়র পদপ্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরান।

দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম সিলেটে গিয়ে অনৈক্য ও কলহকেই পরাজয়ের কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। নির্বাচনে কে কী করেছেন সব খবর জানা আছে বলে উল্লেখ করেন ওবায়দুল কাদের।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, রাত সোয়া ৮টা থেকে ঘণ্টাব্যাপী ওই বৈঠকটি সঞ্চালন করেন আওয়ামী লীগের সিলেট বিভাগের দায়িত্ব প্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন।

বৈঠকে ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, এনামুল হক শামীম ও দপ্তর সম্পাদক ড. আব্দুস সোবহান গোলাপ।

বৈঠকের শুরুতে সহযোগী সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন। একপর্যায়ে সাধারণ সম্পাদকের উপস্থিতিতেই ছাত্রলীগ সিলেট মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম তুষারকে তিরস্কার করা হয়।

জানা গেছে, সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্বাচন চলাকালে নগরের আম্বরখানার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে তুষার দুটো ব্যালট বাক্স কেন্দ্রের বাইরে নিয়ে যান। আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থীর ভোট নষ্ট বা দলের ভাবমূর্তি নষ্টের জন্য তা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে তুষারের কাছে জানতে চান আহমদ হোসেন। তখন নীরব থাকেন তুষার।

এরপর ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের এক নার্সের ওপর স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা মুমিনুর রশীদ সুজনের হামলার বিষয়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগ সিলেট মহানগর কমিটির সভাপতি দেবাংশু দাশ মিঠুর কাছে জানতে চাওয়া হয়, হামলাকারী সাবেক ছাত্রদলকর্মী সুজন কিভাবে স্বেচ্ছাসেবক লীগের কমিটিতে স্থান পেল? জানতে চাইলে দেবাংশু জানান, তিনি জানতেন না সুজন যে আগে ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এর পরপরই সুজনকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়।

জানা গেছে, সিলেট সিটি নির্বাচনের কিছুদিন আগে এক নার্সকে ছুরিকাঘাত করেছিলেন সুজন। ওই ঘটনার নেতিবাচক প্রভাবও সিটি নির্বাচনে পড়েছে।

বৈঠকে দলের স্থানীয় নেতারা, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দিতে চাইলে ওবায়দুল কাদের তাঁদের থামিয়ে দিয়ে নিজে বক্তব্য দিতে শুরু করেন। তিনি তাঁদের বলেন, আমার বক্তব্যের শেষে যদি কোনো কথা থাকে বলবেন। তবে ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যেই সংক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের বক্তব্যের প্রতিফলন ঘটে। ওবায়দুল কাদের সিলেটে আওয়ামী লীগের স্থায়ী কার্যালয় না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। জেলা ও মহানগর কমিটির কর্মকাণ্ড নগরের চালিবন্দরের ইব্রাহীম স্মৃতি সংসদ কার্যালয়ে নিয়মিত চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। এ ছাড়া এক মাসের মধ্যে স্থায়ী কার্যালয়ের জন্য জমি নির্বাচন করতে স্থানীয় নেতাদের নির্দেশ দেন।

ছিল বিএনপি কাউন্সিলর প্রার্থীদের সঙ্গে আঁতাত : বৈঠকে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সাতটি ওয়ার্ডে আমাদের প্রার্থী ছিল না। এটা একটি সাংগঠনিক দুর্বলতা। বিএনপির কাউন্সিলর প্রার্থীদের সঙ্গে অনেক আওয়ামী লীগ নেতা আঁতাত করেছেন। তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে। যেখানে আওয়ামী লীগের কার্যালয় পর্যন্ত নেই, সেখানে আওয়ামী লীগ জিতবে কেমনে? এখানে যেন নোঙরছাড়া নৌকা, পালছাড়া নৌকা।’

সাত উপজেলায় কমিটি নেই : জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী বৈঠকে সাধারণ সম্পাদককে জানান, ছয়টি উপজেলায় সম্মেলন হয়েছে। সাত উপজেলায় সম্মেলন করা হয়নি। জানা গেছে, প্রতিটি আসনভিত্তিক ও উপজেলাভিত্তিক প্রতিবেদন দ্রুত কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশও দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

জানা যায়, আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন জেলা ছাত্রলীগের কমিটি নেই। প্রায় চার বছর আগে ছাত্রলীগ মহানগর কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হয়েছিল। এরপর আর পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হয়নি। জেলা যুবলীগের কমিটিও নেই দীর্ঘদিন ধরে। যুবলীগ মহানগর কমিটির আহ্বায়ক, যুগ্ম আহ্বায়কের নাম ঘোষণা করা হয়েছিল। তারপর পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হয়নি।



মন্তব্য