kalerkantho


মিয়ানমার সামরিক বাহিনীতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

দায়ী অন্যদেরও চিহ্নিত করে ব্যবস্থা

মেহেদী হাসান   

১৯ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



মিয়ানমার সামরিক বাহিনীতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ নৃশংসতা বন্ধ করতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনে মার্কিন অর্থ দপ্তর গত শুক্রবার রাতে এক ঘোষণায় মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞে সম্পৃক্ত ৩৩ লাইট ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন ও ৯৯ লাইট ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন এবং নেতৃত্বে থাকা চার জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। মিয়ানমার প্রসঙ্গে মার্কিন অর্থ দপ্তর বলেছে, ‘২০০৮ সালে সামরিক বাহিনী প্রণীত সংবিধান অনুযায়ী, বার্মিজ (মিয়ানমারের) সামরিক বাহিনীর হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে। বার্মিজ সামরিক বাহিনী বার্মাজুড়ে (মিয়ানমার) রোহিঙ্গা, কাচিন, শানসহ অন্যান্য নৃগোষ্ঠী ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে।’

মার্কিন অর্থ দপ্তর আরো জানায়, ‘নিপীড়নের জন্য দায়ী ওই স্বতন্ত্র ইউনিট ও তাদের অধিনায়কদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত এমন হুঁশিয়ারি হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত যে নিরাপত্তা বাহিনীগুলোকে অনতিবিলম্বে এ ধরনের আচরণ বদলাতে হবে এবং বার্মার (মিয়ানমারের) সব নৃগোষ্ঠী ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর অধিকারকে সম্মান ও সুরক্ষা দিতে হবে।’

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, আগামী ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালানোর বার্ষিকীর প্রাক্কালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর একটি কড়া বিবৃতি দেওয়ার কথা রয়েছে। ওই বিবৃতির প্রাক্কালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দপ্তর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দুটি ইউনিট ও চারজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে স্পষ্ট করেছে যে তাদের এ ব্যবস্থা নির্দিষ্ট কোনো দিবসকে উপলক্ষ করে নয়। বরং নিপীড়নের বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েই তারা বিবেচনা করছে। যুক্তরাষ্ট্র গত বছরের শেষদিকে মিয়ানমারের একজন জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছিল।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, মিয়ানমার বাহিনীর ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে তাদের অপরাধকে যে কড়া ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কানাডা সরকারও এ উদ্যোগে সমর্থন জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দপ্তরের টেররিজম অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের আন্ডার সেক্রেটারি সিগাল মেন্ডেলকার বলেছেন, বার্মিজ নিরাপত্তা বাহিনী বার্মাজুড়ে সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে জাতিগত নির্মূল, হত্যাযজ্ঞ, যৌন নিপীড়ন, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ সহিংস কর্মসূচিতে লিপ্ত হয়েছে। মানুষের ব্যাপক মাত্রার এসব ভোগান্তির জন্য দায়ীদের জবাবদিহি করাতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কৌশলের অংশ হিসেবে এই ভয়ংকর আচরণ দেখভালকারী ইউনিট ও নেতাদের ওপর অর্থ দপ্তর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে।

তিনি বলেন, নিপীড়িত ব্যক্তিদের এবং নৃশংসতার তথ্য প্রকাশ করা ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার অবশ্যই নিশ্চিত হবে। জঘন্য এসব অপরাধের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার মাধ্যমে এটি করা হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দপ্তরের আন্ডার সেক্রেটারি বলেন, ‘বার্মিজ সামরিক ইউনিট ও তাদের নেতাদের এসব বর্বরতা বন্ধ ও বিচার নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। এই অঞ্চলে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অন্যান্য অপরাধের জন্য দায়ীদের পরিচয় আমরা পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করব।’

ইউরোপের পর যুক্তরাষ্ট্রেও নিষিদ্ধ : রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞে নেতৃত্ব দেওয়া মিয়ানমারের মেজর জেনারেল মং মং সোয়ের বিরুদ্ধে গত বছরই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এরপর চলতি বছরের ২৫ জুন ইউরোপের ২৮টি দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও কানাডা মেজর জেনারেল মং মং সোয়েসহ মিয়ানমারের সাত জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দপ্তর গত শুক্রবার রাতে মিয়ানমারের যে চারজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে তাঁদের মধ্যে তিনজনের বিরুদ্ধে আগে থেকেই ইইউ ও কানাডার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

এ ছাড়া মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দুটি ইউনিটকে ‘গোষ্ঠী’ হিসেবে নিষিদ্ধ করায় এর বড় প্রভাব পুরো বাহিনীর ওপর পড়বে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন। কারণ নিষেধাজ্ঞা এখন আর শুধু ব্যক্তিবিশেষের ওপর নেই। পুরো ইউনিট/দলের ওপর পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেউ আর তাদের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক রাখতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্রের আওতাধীন এলাকায় তাদের অর্থ বা সম্পত্তি থাকলে তা বাজেয়াপ্ত করা হবে। এই নিষিদ্ধ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবে না।

জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি গতকাল শনিবার ভোরে এক টুইট বার্তায় বলেন, মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তিনি আরো বলেন, ‘আমরা এসব নৃশংসতার ওপর আলোকপাত ও দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অব্যাহত রাখব। একই সঙ্গে আমরা সাংবাদিক ওয়া লোন ও কিয়াও সো ও’র মুক্তির আহ্বান জানিয়ে যাব।’

কার কী অপরাধ : যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, মিয়ানমারের ব্যুরো অব স্পেশাল অপারেশন্স-৩-এর অধিনায়ক অং কিয়াও জও ২০১৫ সাল থেকে ২০১৮ সালের প্রথম দিক পর্যন্ত দেশটির পশ্চিমাঞ্চল, দক্ষিণাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সামরিক বাহিনী ও বর্ডার গার্ড পুলিশের কর্মকাণ্ড দেখভাল করেছেন। তাঁর অধীন সদস্যরাই রাখাইনসহ অন্যান্য অঞ্চলে জাতিগত নির্মূল অভিযান পরিচালনাসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে।

মিলিটারি অপারেশন্স কমান্ড-১৫-এর অধিনায়ক খিন মং সোয়ের অধীন সেনারাই ২০১৭ সালের ২৭ আগস্ট রাখাইনের মং নু গ্রামে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ও অন্যান্য নিপীড়ন চালায়। মং নুতে সেনারা রোহিঙ্গাদের শারীরিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন চালানোর পাশাপাশি জবাই বা অন্যান্যভাবে হত্যা করেছে বলে জানা যায়।

মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশের অধিনায়ক থুরা সেইন লুইন ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে গত বছরের অক্টোবর মাস পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের বিচারবহির্ভূত হত্যা, যৌন নিপীড়ন, নির্যাতনসহ গুরুতর সব মানবাধিকার লঙ্ঘনে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

৯৯ লাইট ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের অধিনায়ক খিন হ্লিইং তাঁর ডিভিশনের চারপাশে ১৩ দিন ধরে রোহিঙ্গা গ্রামবাসীকে শুইয়ে রেখে মানবপ্রাচীর রচনা করতে বাধ্য করেছিলেন। ওই ডিভিশন শুধু রাখাইন রাজ্যেই নয়, শান রাজ্যেও হত্যা, গুম, নির্যাতন, নিপীড়নের সঙ্গে জোরালোভাবে সম্পৃক্ত।

পুরো ৯৯ লাইট ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনই রাখাইন ও শান রাজ্যে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটিয়েছে। বেসামরিক লোকজনকে লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ, হত্যা ও যৌন নির্যাতন এ ডিভিশনের নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে।

৩৩ লাইট ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের গত বছরের ২৭ আগস্ট রাখাইন রাজ্যের ছুট পিন গ্রামে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায়। তাদের এক অভিযানেই ছুট পিনের শতাধিক গ্রামবাসী রোহিঙ্গা নিহত হয়। এ ছাড়া ইন দিন গ্রামের হাজারো বাসিন্দাকে তাড়িয়ে বাংলাদেশে পাঠাতেও ওই ডিভিশন মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।



মন্তব্য