kalerkantho


জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ

সমালোচনা সহ্য না করে সরে গেল যুক্তরাষ্ট্র

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

২১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



সমালোচনা সহ্য না করে সরে গেল যুক্তরাষ্ট্র

এক দিন আগেই মেক্সিকো সীমান্তে মা-বাবার কাছ থেকে শিশুদের আলাদা করার মার্কিন নীতির সমালোচনা করেছিলেন জাতিসংঘের শীর্ষ মানবাধিকার কর্মকর্তা। এটি মোটেও পছন্দ হয়নি ট্রাম্প প্রশাসনের। ফল হিসেবে গত মঙ্গলবার রাতে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থা মানবাধিকার পরিষদ ছাড়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি মানবাধিকার পরিষদকে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের মঞ্চ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরায়েলের বাড়াবাড়িমাত্রায় সমালোচনা করছে মানবাধিকার পরিষদ। ওই পরিষদ মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেও ব্যর্থ হয়েছে।

নিকি হ্যালি স্পষ্ট করে বলেছেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীরাই মানবাধিকার পরিষদে নির্বাচিত হবে ও দায়িত্ব পালন করে যাবে। মানবাধিকার পরিষদ অনেক আগে থেকেই মানবাধিকার নয় বরং মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের রক্ষক হিসেবে কাজ করছে।

তবে জাতিসংঘের কর্মকর্তারা বলছেন, এক বছর আগেই জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে গিয়ে রীতিমতো হুমকি দিয়ে এসেছিলেন—তাঁদের পছন্দ মতো পরিষদের সংস্কার না হলে যুক্তরাষ্ট্র এতে থাকবে না। মানবাধিকার পরিষদ যে প্রায়শই ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের বর্বরতার সমালোচনা করে থাকে যুক্তরাষ্ট্র তা মানতে নারাজ।

জেনেভাভিত্তিক ৪৭ সদস্যবিশিষ্ট জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে ২০১৬-২০১৯ মেয়াদে সদস্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র। গত মঙ্গলবার রাতে ওই সদস্য পদ ছেড়ে দেওয়া প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এক টুইট বার্তায় লিখেছেন, মানবাধিকার পরিষদ অনেক আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থবিরোধী হয়ে উঠেছে। তাই এতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ নেওয়ার দিন ফুরিয়ে এসেছে।

জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেছেন, মানবাধিকার পরিষদ বিশ্বে মানবাধিকার সুরক্ষা ও উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস যুক্তরাষ্ট্রকে মানবাধিকার পরিষদেই দেখতে চান।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার যায়ীদ রা’দ আল হুসেইন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওই সিদ্ধান্ত হতাশাজনক। কিন্তু এটি মোটেও বিস্ময়কর কোনো সংবাদ নয়। বর্তমান বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার ইস্যুতে এগিয়ে যাওয়া উচিত, পেছানো উচিত নয়।

বেশ কয়েকটি দাতা ও মানবাধিকার সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার পরিষদ ছাড়ার নিন্দা জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওকে চিঠি লিখেছেন। তবে মানবাধিকার পরিষদ ছাড়ার সিদ্ধান্তকে ‘সাহসী’ হিসেবে অভিহিত করে একে স্বাগত জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনিও দাবি করেন, তথাকথিত মানবাধিকার পরিষদ ইসরায়েলবিরোধী ও বিদ্বেষী পরিষদ হিসেবে কাজ করছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব সলিল শেঠি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবারও প্রমাণ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যে মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতার কথা বলে তার প্রতি তিনি পুরোপুরি অশ্রদ্ধাশীল। মানবাধিকার পরিষদ কোনোভাবেই যথার্থ নয়। এর পরও এই পরিষদে সদস্যদের প্রায়শই মানবাধিকার ইস্যুতে জবাবদিহি করতে হয়। ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার জন্য এটি এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’

বাংলাদেশি কূটনীতিকরা বলছেন, তাঁরা পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টি রাখছেন এবং মানবাধিকার পরিষদের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। আগামীতেও এটি অব্যাহত রাখার ব্যাপারে তাঁরা আশাবাদী।

যুক্তরাষ্ট্রে মানবাধিকার পরিস্থিতি ও বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদেও সমালোচনা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। অনেক দেশ সমালোচনা করে থাকে যে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রভাব বিস্তারের জন্য এ ধরনের প্রতিবেদন ব্যবহার করে।

যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিবেদনের বিষয়ে বিভিন্ন সময় প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশি কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের বলেছেন, মানবাধিকার পরিস্থিতি বিশ্লেষণের জন্য তাঁরা জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদকেই যথার্থ ফোরাম বলে মনে করে থাকেন।

যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার পরিষদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত বিষয়ে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, যারা মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মতকে সম্মান জানানোর ব্যাপারে সারা বিশ্বকে পরামর্শ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে বলে মনে করে, তাদের এই সিদ্ধান্ত ‘কপটতা’ ছাড়া আর কিছু নয়। সদস্য না থাকলে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো মানবাধিকার পরিষদে অর্থায়ন বন্ধ করে দেবে এবং এ পরিষদের সিদ্ধান্তে কর্ণপাত করবে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক কালের কণ্ঠকে বলেন, বিভিন্ন আঞ্চলিক গ্রুপ থেকে সদস্যরা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ভোটের মাধ্যমে মানবাধিকার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। এখানে প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সিদ্ধান্ত হয়। নিরাপত্তা পরিষদের মতো মানবাধিকার পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভেটো’ ক্ষমতা না থাকলে দেশটি তার খেয়ালখুশিমতো প্রস্তাব আটকে দিতে পারে না। ওই কূটনীতিক আরো বলেন, মানবাধিকার পরিষদে ইসরায়েলবিরোধী প্রস্তাবগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে গৃহীত হয়েছে। এ প্রক্রিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের অসম্মান জানানো সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকে অবজ্ঞা ও অসম্মান জানানোর শামিল।

জাতিসংঘের প্রকাশনা ইউএনডিসপাচে গতকাল বুধবার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মানবাধিকার পরিষদ থেকে বেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে নেতৃত্ব দেওয়ার আরেকটি মাধ্যম হাতছাড়া করছে। ২০০৬ সালে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ সৃষ্টির সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্র এর সমালোচনা করে আসছে। বুশ প্রশাসন মানবাধিকার পরিষদের সদস্য হতে চাইলেও এর তীব্র বিরোধিতায় সফল হয়েছিলেন জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত জন বোল্টন। ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর দেশটি মানবাধিকার পরিষদে যোগ দেওয়ার সময় মনে করেছিল, ওই পরিষদের বাইরে থেকে ইসরায়েলকে রক্ষা করার চেয়ে বরং পরিষদের সদস্য হয়ে প্রভাব খাটাতে পারলে অপেক্ষাকৃত ভালো ফল আসবে।

যুক্তরাষ্ট্রের নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের গত বছরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার পরিষদের সদস্য হওয়ার পর ইসরায়েল বিষয়ক প্রস্তাব অর্ধেকেরও বেশি কমেছে। ধারণা করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার পরিষদ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর পরিষদের ইসরায়েল বিষয়ক প্রস্তাবগুলো ওয়াশিংটনের কাছে জাতীয় স্বার্থবিরোধী হিসেবে অভিহিত হবে। আর নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার পরিষদের বাইরে থেকেও সেগুলো সমর্থন করবে না। যুক্তরাষ্ট্র প্রমাণ করার চেষ্টা করবে, তার অনুপস্থিতিতে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ অকার্যকর ও গুরুত্বহীন।



মন্তব্য