kalerkantho


ঈদের ছুটিতে পাহাড়ে অস্ত্রের গর্জন

জনসংহতির তিন সদস্য কর্মীকে গুলি করে হত্যা

রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি   

১৯ জুন, ২০১৮ ০০:০০



জনসংহতির তিন সদস্য কর্মীকে গুলি করে হত্যা

এবার ঈদের ছুটিতে (শুক্র, শনি ও রবিবার) আগ্নেয়াস্ত্রের গর্জনে কেঁপে উঠল পার্বত্য চট্টগ্রাম। রাঙামাটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) এক সদস্য ও এক সাবেক কর্মী এবং খাগড়াছড়িতে সংগঠনটির এক সদস্যকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টকে (ইউপিডিএফ) দায়ী করেছে জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা)। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইউপিডিএফ।

নিহতরা হলেন রাঙামাটির লংগদু উপজেলার দোসরপাড়ার বাসিন্দা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) সাবেক কর্মী বিনয় চাকমা জংগলী (৪০), বাঘাইছড়ি উপজেলার রূপকারী ইউনিয়নের দোখাইয়া গ্রামের বাসিন্দা ও সমিতির (এমএন লারমা) সদস্য সুরেন বিকাশ চাকমা (৫৫), খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার পাইয়ংপাড়ার বাসিন্দা ও সমিতির (এমএন লারমা) সদস্য বিজয় ত্রিপুরা (৩৫)।

স্থানীয়রা জানিয়েছে, শুক্রবার সকালে (১৫ জুন) লংগদুর দুর্গম দোসরপাড়ায় বিনয় চাকমা জংগলীকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। বিনয় প্রায় দুই বছর আগে সংগঠন ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিলেন। 

লংগদু থানার ওসি রঞ্জন কুমার সামন্ত জানান, লাশ ময়নাতদন্ত শেষে নিহতের স্বজনদের কাছে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার বা আটক করা যায়নি।

পুলিশ জানায়, এই হত্যাকাণ্ডের এক দিন পর রবিবার সন্ধ্যায় দুর্বৃত্তের গুলিতে বাঘাইছড়ির রূপকারী ইউনিয়নে নিজ বাড়িতে নিহত হন সুরেন বিকাশ চাকমা। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) রূপকারী ইউনিয়নের সদস্য বলে দাবি সংগঠনটির।

এ দুটি হত্যাকাণ্ডের জন্য প্রসিত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফকে দায়ী করেছে জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা)। সমিতির মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয় কমিটির সহতথ্য ও প্রচার সম্পাদক প্রশান্ত চাকমা বলেন, ‘পাহাড়ের এসব হত্যাকাণ্ড যে ইউপিডিএফই করে তা তো আপনারা জানেনই। তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে ত্রাসের রাজস্ব কায়েম করেছে।’ তবে ইউপিডিএফের প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের প্রধান ও মুখপাত্র নিরন চাকমা বলেন, ‘এসব ঘটনায় আমাদের সম্পৃক্ততা নেই। এটা তাদের (সমিতি-এমএন লারমা) নিজেদের মধ্যে কিংবা এলাকার স্থানীয় ঝামেলাও হতে পারে। আমাদের ওপর দোষ চাপানো তাদের অভ্যাস হয়ে গেছে।’

বাঘাইছড়ি থানার ওসি আমির হোসেন জানান, এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে চারজনকে আটক করা হয়েছে।

এদিকে শনিবার দুপুরে খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার দুর্গম পাইয়ংপাড়ায় দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) সদস্য বিজয় ত্রিপুরা। একদল অস্ত্রধারী ঘরে ঢুকে খুব কাছ থেকে তাঁকে গুলি করে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় পানছড়ি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সর্বোত্তম চাকমা, লোগাং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রত্যুত্তর চাকমা, জনৈক সমাজপতি চাকমাসহ অজ্ঞাতপরিচয় ১০ জনকে আসামি করে পানছড়ি থানায় রবিবার মামলা করেন নিহতের স্ত্রী কালিন্দ্রী ত্রিপুরা।

পানছড়ি থানার ওসি মিজানুর রহমান জানান, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে এই হত্যাকাণ্ড হতে পারে। আঞ্চলিক দলগুলোর বিরোধের জেরে ঘটনাটি ঘটেছে বলে শোনা গেছে। তিনি জানান, মামলা হয়েছে। তদন্ত করে দোষীদের খুঁজে বের করা হবে।

বিজয় ত্রিপুরার লাশ রবিবার খাগড়াছড়ি জেলা আধুনিক সদর হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে বিকেলে জেলা সদরের তেঁতুলতলা এলাকায় দাহ করা হয়। নিরাপত্তাজনিত কারণে পরিবারের সদস্যরা লাশ পানছড়িতে নিয়ে যেতে পারেনি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) কেন্দ্রীয় তথ্য সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা ঘটনার জন্য ইউপিডিএফকে দায়ী করেছেন। অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইউপিডিএফ।

ছয় মাসে ২৮ হত্যা

গত ২ মে রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলায় নিজ কার্যালয়ের সামনে অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকধারীদের গুলিতে নিহত হন উপজেলা চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতির (লারমা) প্রভাবশালী নেতা শক্তিমান চাকমা। এর পরদিন তাঁর দাহক্রিয়ায় যোগ দিতে যাওয়া গাড়িবহরে সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) প্রধান তপনজ্যোতি চাকমা বর্মাসহ পাঁচজন। এ হত্যার ঘটনায় সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি ও প্রসিত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফকে দায়ী করেছে জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)। পার্বত্য চট্টগ্রামে এই পাল্টাপাল্টি সশস্ত্র হামলায় গত ছয় মাসে অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছে। তাদের বেশির ভাগই দল চারটির সশস্ত্র শাখার ক্যাডার বা রাজনৈতিক অনুসারী। নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে চাঁদাবাজির এলাকা বিস্তৃত করা ও পুরনো খুনের বদলা নিতেই দল চারটির সশস্ত্র বিরোধ চলছে বলে মনে করে পাহাড়ের মানুষ।

 



মন্তব্য