kalerkantho


বিশুদ্ধ ইফতারি

শীতল স্বস্তি মাঠায়

রেজাউল করিম   

১৫ জুন, ২০১৮ ০০:০০



শীতল স্বস্তি মাঠায়

গ্রীষ্মের হাঁসফাঁস করা গরম। এর মধ্যে ১৫ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে প্রতিদিন মাহে রমজানের রোজা পালন করেছে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। তাদের জন্য দিন শেষে ইফতারে থাকে রকমারি আয়োজন। এই আয়োজনে ভিন্নমাত্রা যোগ করে ‘মাঠা’ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সারা দিনের রোজা শেষে মাঠা পান করে রোজাদার যেমন তৃপ্ত হয়, ঠিক তেমনি এটা স্বাস্থ্যসম্মতও। পুষ্টিবিদরা বলেছেন, ইফতারে এই পানীয় রোজাদারের সারা দিনের ক্লান্তি দূর করে ফিরিয়ে দেয় সতেজতা।

মাঠার প্রধান উপাদান হলো দুধ থেকে তৈরি করা ঘোল। ঘোল হলো মাখন বা পনির উৎপাদনের একটি উপজাত। ঘোলের মধ্যে দুধের প্রায় সব উপাদানই বিদ্যমান। তাই এর পুষ্টিগুণ প্রায় দুধের মতোই। সারা দিনের রোজা শেষে বরফ মেশানো ঠাণ্ডা মাঠা যদি পান করা যায়, তাহলে রোজার যে ক্লান্তি, তা শরীরে প্রভাব ফেলতে পারে না। আবার নিয়মিত মাঠা পান করলে শরীরের অতিরিক্ত মেদ কমে বলে পুষ্টিবিদরা বলেছেন। দুধে প্রোটিনের উপস্থিতির জন্য যারা দুধ খেতে পারে না, দুধের বদলে মাঠা তাদের জন্য উপযুক্ত পানীয়।

সারা দেশেই এখন মাঠার প্রচলন ঘটেছে। তবে এটি একসময় শুধু পুরান ঢাকায় জনপ্রিয় ছিল। পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার সুস্বাদু ছানা-মাঠার জন্য এখনো বিখ্যাত। শাঁখারীবাজার পুলিশ ফাঁড়ির সামনে এবং স্বর্ণমন্দিরের আশপাশে রাস্তার মোড়ে ঘোষ সম্প্রদায়ের লোকেরা বিশেষ প্রক্রিয়ায় এই ছানা-মাঠা তৈরি করে থাকে। সারা বছর প্রতিদিন সকালে পুরান ঢাকার প্রতিটি মোড়ে মাঠা পাওয়া যায়। আর রমজান মাসে দুপুরের পর থেকে বসে মাঠা বিক্রির ভাসমান বা অস্থায়ী দোকানগুলো।

পুরান ঢাকার ইসলামপুর, লক্ষ্মীবাজার, নবাবপুর, চকবাজার, লালবাগ, উর্দু রোড, আমলিগোলা, জিন্দাবাহার, ওয়ারী, কায়েতটুলী, নাজিরাবাজার, নারিন্দা, নাজিমুদ্দিন রোড, চানখাঁরপুল ইত্যাদি এলাকায় ছানা-মাঠা পাওয়া যায়। এখানে মাঠার সঙ্গে ছানাও বিক্রি হয়। পুরান ঢাকার তৈরি মাঠা সুস্বাদু হওয়ার কারণে এর চাহিদা এখন ঢাকার অন্যান্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। এর রেশে দেশের প্রতিটি শহরেও এখন মাঠা পাওয়া যায়।

রাজধানীতে মাঠা ব্যবসায়ীদের বেশির ভাগই বংশপরম্পরায় এ কাজে নিয়োজিত। তবে অন্যান্য ব্যবসার জন্য যেমনটি স্থায়ী দোকান থাকে, এ ব্যবসায় তেমন নয়। পুরান ঢাকায় দু-একটি মিষ্টির দোকানে মাঠা পাওয়া গেলেও বেশির ভাগ মাঠা বিক্রেতাই ভাসমান বা রাস্তার কোনো মোড়ে অস্থায়ীভাবে বসে।

পুরান ঢাকার বংশাল রোডের প্রবেশপথে অস্থায়ীভাবে বসেন মাঠা ব্যবসায়ী আশীষ ঘোষ। বংশপরম্পরায় এ ব্যবসার সঙ্গে প্রায় ৪০ বছর ধরে তিনি যুক্ত আছেন। এখন প্রতি গ্লাস মাঠা বিক্রি করেন ১০ টাকা। আর স্পেশাল মাঠা ২০ টাকা। তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, রমজান মাসে দুপুরের পরপরই এই দোকান নিয়ে বসেন। অন্য সময় সকাল ও সন্ধ্যায় বসেন। তবে রমজানে মাঠার কদর বেশি বলে উপার্জনটাও ভালো হয়। এখন ঘোষ সম্প্রদায়ের লোকের বাইরেও অনেকে এ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বলে তিনি জানান। তবে তাঁর মাঠার বিশেষ স্বাদ থাকায় রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন কিনতে আসে।

মাঠা তৈরির জন্য প্রয়োজন হয়, দুধ, চিনি, পেস্তাবাদাম বাটা, লবণ ও বরফ কুচি। প্রথমে পরিমাণমতো দুধ জ্বাল দিয়ে অর্ধেক করে নিতে হবে। এরপর ঠাণ্ডা করে ডাল ঘুঁটনি দিয়ে ভালো করে ঘুঁটে ওপর থেকে ক্রিম উঠিয়ে নিতে হবে। সব ক্রিম বা ননি ওঠানো হয়ে গেলে যেই দুধ থাকবে সেটাই হলো ঘোল। এবার ঘোলে পরিমাণমতো চিনি, পেস্তাবাদাম বাটা ও লবণ দিয়ে ব্লেন্ডারে ভালো করে ব্লেন্ড করে বরফ কুচি দিয়ে পরিবেশন করতে হবে।

পুষ্টিবিদ জিনাত লায়লা বাণী কালের কণ্ঠকে বলেন, শরীর সতেজ রাখতে মাঠা অন্যতম পানীয়; বিশেষ করে রোজাদাররা ইফতারে এ রকম পানীয় রাখলে সারা দিনের ঘাটতি পূরণে বেশ সহায়ক হয়। এ ছাড়া মাঠা শরীর সতেজ এবং চর্বিমুক্ত রাখতে অনেকটা ভূমিকা রাখে।



মন্তব্য