kalerkantho


কবজায় রাখতে চায় আ. লীগ বিএনপি পুনরুদ্ধারে মরিয়া

আবদুল হামিদ মাহবুব, মৌলভীবাজার   

১৯ মে, ২০১৮ ০০:০০



কবজায় রাখতে চায় আ. লীগ বিএনপি পুনরুদ্ধারে মরিয়া

সীমান্তবর্তী বড়লেখা উপজেলার ১০ ইউনিয়ন, এক পৌরসভা ও জুড়ী উপজেলার ছয় ইউনিয়ন নিয়ে মৌলভীবাজার-১ সংসদীয় আসন। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থী সাবেক ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এবাদুর রহমান চৌধুরীকে পরাজিত করে আসনটি দখল করে নেন আওয়ামী লীগের মো. শাহাব উদ্দিন। দশম সংসদ নির্বাচনেও আসনটি দখলে রাখেন তিনি। তিনি সরকারদলীয় হুইপও মনোনীত হয়েছেন।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে আসনটি পুনরুদ্ধার করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিএনপি। বসে নেই বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। তবে নির্বাচনে দলগুলোর জয় নির্ভর করছে প্রার্থী মনোনয়নের ওপর—এমনটাই মনে করে নির্বাচনী এলাকার মানুষ। ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের ৯ জন সম্ভাব্য প্রার্থী নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছেন।

নির্বাচনী এলাকা ঘুরে জানা গেছে, মৌলভীবাজার-১ আসনটি একসময় নৌকার ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। দলটির ভোট ব্যাংক হলো ১৯টি চা-বাগানের শ্রমিক ভোটার। আওয়ামী লীগের এ দুর্গে প্রথম আঘাত হানে জাতীয় পার্টি (এরশাদ)। গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এরশাদের স্বৈরশাসনের অবসানের পরে ’৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে দলটির প্রার্থী এবাদুর রহমান চৌধুরী বিজয়ী হন। ১৯৯৬ সালের (জুন) নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. শাহাব উদ্দিন হারানো

আসন পুনরুদ্ধার করেন। কিন্তু ধরে রাখতে পারেননি পরবর্তী নির্বাচনে। এবাদুর রহমান চৌধুরী জাতীয় পার্টি থেকে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ২০০১ সালের নির্বাচনে আবার সংসদ সদস্য হন। তাঁকে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের ত্রাণ প্রতিমন্ত্রীও করা হয়।

মৌলভীবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য শাহাব উদ্দিন সম্প্রতি জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। জেলার অন্য আসনগুলোতে আওয়ামী লীগে অভ্যন্তরীণ কোন্দল থাকলেও এ এলাকায় প্রকাশ্যে কোনো  কোন্দল নেই। তাই সাংগঠনিকভাবে এই আসনে আওয়ামী লীগ এখনো বেশ শক্তিশালী। আর আওয়ামী লীগে বিকল্প শক্ত কোনো মনোনয়নপ্রত্যাশী না থাকায় হুইপ শাহাব উদ্দিনও আছেন বেশ ভালো অবস্থানে।

তবে সংসদ সদস্য ছাড়াও দলের আরো একজন সম্ভাব্য প্রার্থী ইতিমধ্যে আলোচনা এসেছেন। তাঁরা হলেন বড়লেখা উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সমপাদক রফিকুল ইসলাম সুন্দর।

রফিকুল ইসলাম সুন্দর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দলের অনেকেই আমাকে প্রার্থী হতে বলছেন। তবে কেন্দ্র যদি আমাকে নমিনেশন দেয় তবে আমি নির্বাচন করব।’

কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এবাদুর রহমান চৌধুরী ছাড়াও দলের মনোনয়ন আলোচনায় আছেন ঢাকার জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি, মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও জুড়ী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন আহমদ মিঠু, কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক আন্তর্জাতিকবিষয়ক সহসম্পাদক শরীফুল হক সাজু।

জাতীয় পার্টি থেকে আহমেদ রিয়াজ ছাড়াও আরো দুজন নেতা মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। তাঁরা হলেন দলের বড়লেখা উপজেলা শাখার সভাপতি আফজাল হোসেন। আরেকজন দলের জুড়ী উপজেলা শাখার সভাপতি মাহবুবুল আলম শামীম।

জামায়াত নেতা ও ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন বলে শোনা যাচ্ছে। এলাকায় তিনি বেশ সক্রিয় রয়েছেন।

আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ২০ দলীয় জোটে আছি। জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন হলে আমি মনোনয়ন না পেয়ে অন্য যিনি মনোনয়ন পাবেন সবাই তাঁর পক্ষেই কাজ করব।’

সংসদ সদস্য শাহাব উদ্দিন আগামী সংসদ নির্বাচনেও দলের প্রার্থী হচ্ছেন—এমনটি প্রায় নিশ্চিত বলে মনে করছেন বড়লেখা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার উদ্দিন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, মৌলভীবাজার-১ আসনে দলের একক প্রার্থী হুইপ মো. শাহাব উদ্দিন। এ আসনে তাঁর বিকল্প নেই।’

আনোয়ার উদ্দিন বলেন, সংসদ সদস্য এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। গত দুই মেয়াদে বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলায় উন্নয়নের নানা ফিরিস্তি তুলে ধরেন তিনি।

তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ২১টি স্কুলকে এমপিওভুক্ত, সুজানগর পাথারিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠা ও ৮০টি প্রাইমারি স্কুলে নতুন ভবন হয়েছে। ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে জুড়ী-বড়লেখা-চান্দগ্রাম সিঅ্যান্ডবি সড়ক সংস্কার ও ৫০টি সেতু হয়েছে। তিন কোটি টাকা ব্যয়ে মাধবকুণ্ড ইকোপার্ক এবং সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে চারতলা আধুনিক রেস্ট হাউস হয়েছে। আট কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা হয়েছে কাঁঠালতলী-মাধবকুণ্ড সড়ক। বড়লেখা ও জুড়ীতে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইন হয়েছে। দুই উপজেলায় হয়েছে ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। হয়েছে বড়লেখা থানার আধুনিক ভবন। বিগত জোট সরকারের আমলে বন্ধ হওয়া কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে রেললাইন বসেছে।

সংসদ সদস্য শাহাব উদ্দিন বলেন, ‘ছাত্র থাকাকালেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হই। রাজনীতি করার সুবাদেই ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার, তার পর টানা তিনবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে পরে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। এবার নিয়ে তিনবার হয়েছি সংসদ সদস্য। নেত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী আমি এলাকায় মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আশা করছি আগামী মনোনয়নও আমি পাব।’

বিএনপির এবাদুর রহমান চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সারা জীবন মানুষের সঙ্গে ছিলাম, আছি এবং থাকব। শারীরিক অবস্থা ভালো থাকলে, দল চাইলে, মানুষ চাইলে এবং দেশে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হলে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে এই আসনে নির্বাচন করব।’

জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও জুড়ী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন মিঠু বলেন, ‘আমার বাবা মরহুম আফতাব আলী মহালদার ছিলেন বড়লেখা উপজেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। আমার বড় ভাই জালাল উদ্দিন আহমেদ ছিলেন জুড়ী উপজেলা বিএনপির সভাপতি। বিএনপি পরিবারের সন্তান হিসেবেই এবং বিএনপির হাইকমান্ডের নির্দেশে বিগত আট বছর ধরে মাঠে কাজ করে যাচ্ছি।’

তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপিকে সুসংগঠিত করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালনের বিষয়টি তুলে ধরে নাসির উদ্দিন বলেন, এ আসনে দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকলেও কোনো কোন্দল নেই। মনোনয়নের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দলের কাছে মনোনয়ন চাইব। তবে দল আমাকে মনোনয়ন না দিয়ে অন্য কাউকে দিলে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করব।’

শরীফুল হক সাজু যুবদলের রাজনীতির পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ-আমেরিকায় বিএনপির পক্ষে জনমত সৃষ্টি ও দলকে সুসংগঠিত করার কাজে জড়িত। মৌলভীবাজার-১ আসন থেকে ২০০৮ সালেও তিনি মনোনয়ন চেয়েছিলেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রতিরোধ করতে গিয়ে যেসব নেতাকর্মী হামলা-হয়রানির শিকার হয়েছে তাদের আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

এ ছাড়া প্রতি ঈদে সংসদ সদস্য পদে আগ্রহী প্রার্থী হিসেবে শরীফুল হক সাজু ব্যানার-ফেস্টুন টানিয়ে এলাকার মানুষকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, আশীর্বাদ চাচ্ছেন। তিনি রমজানে দুস্থদের মাঝে খাদ্য-পোশাক এবং দুই হাজার বন্যার্ত পরিবারকে ত্রাণসামগ্রী দিয়েছেন।

শরীফুল হক সাজু বলেন, তৃণমূলের নেতাকর্মীরা তাঁর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে। তিনি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য আহমেদ রিয়াজ বলেন, ‘পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নির্দেশে মূলত আমি মৌলভীবাজার-১ ও ২ আসনে কাজ করছি। যেকোনো একটি আসন থেকেই নির্বাচন করব।’ গত বছর বন্যার সময় দুর্গতদের পাশে থেকে রাত-দিন কাজ করেছেন বলেও জানিয়েছেন আহমেদ রিয়াজ।

 


মন্তব্য