kalerkantho


২০০ জালিয়াতির কথা স্বীকার

কার্ড জালিয়াতি করেই গাঢাকা দিত শরিফুল

এস এম আজাদ   

২৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



২০০ জালিয়াতির কথা স্বীকার

ছবি: কালের কণ্ঠ

ব্যাংকের এটিএম কার্ড জালিয়াতির জন্য প্রতিষ্ঠিত চেইনশপে চাকরি নিতে শরিফুল ইসলাম ভুয়া পরিচয়ে জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) তৈরি করেছিল। নিজের নাম দেয় মিঠু রহমান। রাশিয়ার পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটিতে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে এলেও সিভিতে লিখেছে এইচএসসি পাস। বাবার নাম, ঠিকানা, সবই দিয়েছে ভুয়া। এমনকি জীবনবৃত্তান্তে রেফারেন্স ঘরে যে মোবাইল ফোন নম্বর দেয় সেটি গত তিন বছর ধরে বন্ধ।

ঘড়িতে ‘স্ক্যানিং ডিভাইস’ ব্যবহার করে ক্লোন কার্ড তৈরির পর ব্যাংকের কার্ড ব্যবহারকারীদের টাকা বুথ থেকে তুলে নিয়ে গাঢাকা দিত শরিফুল। অপকর্ম ধরা পড়লেও শনাক্ত করতে না পারায় সে ফের চাকরিতে ফিরে আসে। একপর্যায়ে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট চেইনশপ কর্তৃপক্ষ শরিফুলকে শনাক্ত করে ফেলে। তবে ভুয়া পরিচয়ের কারণে খুঁজে পাচ্ছিল না। গত এপ্রিল মাসে শরিফুলকে শনাক্ত করতে সংবাদপত্রে ছবিসহ বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়। চেইনশপ কর্তৃপক্ষ বনানী থানায় একটি মামলাও করেছিল। ছদ্ম পরিচয়ের কৌশলে সাত বছর ধরে একইভাবে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছিল শরিফুল। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সংঘবদ্ধ অপরাধ দলের তদন্তকারীরা এসব তথ্য জানান।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটিএম কার্ড জালিয়াতি করেও ভুয়া পরিচয়ের কারণে শরিফুল আগে দুটি মামলায় দণ্ড থেকে রেহাই পেয়ে যায়। এবার গ্রেপ্তারের পর দুই শতাধিক এটিএম কার্ডের (ডেবিট ও ক্রেডিট) গ্রাহকের টাকা তুলে নেওয়ার কথা স্বীকার করেছে সে। চার দিনের রিমান্ডে থাকা শরিফুল দাবি করেছে, ব্যাংকের নিরাপত্তা দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে সে। এটিএম কার্ডের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পরও সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার ভয়ে ভুক্তভোগী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ঘটনা ধামাচাপা দিতে চায়। বিত্তবানদের কার্ড থেকে অল্প অঙ্কের টাকা সরানো হলে তারা বিষয়টি নিয়ে বেশি ঘাঁটায় না। এসব কারণে গুলশান-বনানী এলাকার শপিং মল থেকে কার্ড ক্লোন করে জালিয়াতি শুরু করে সে। শরিফুল পুলিশকে বলেছে, নিয়োগদাতা এজেন্সি প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতার কারণে চেইনশপ কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ তাকে শনাক্ত করতে পারেনি। পুরো জালিয়াতি একাই করেছে বলে দাবি করেছে সে।

সিআইডির সংঘবদ্ধ অপরাধ দলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আসলাম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শরিফুল ছদ্মবেশে চলাফেরা করছিল। মিরপুর থানায় ব্র্যাক ব্যাংক যে মামলা করেছে সে মামলায় তার রিমান্ড চলছে। এ ছাড়া মতিঝিল থানায় সিটি ব্যাংকের মামলাও আছে। অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তে ভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্ত হবে।’ তিনি বলেন, ‘২০১৩ সালে মিরপুর ও চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় একই ধরনের জালিয়াতির মামলা হয়। তবে ওই সব মামলায় কৌশলে রেহাই পেয়েছে সে।’

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার হেমায়েতপুর গ্রামের ইয়াজ উদ্দিন বিশ্বাসের ছেলে শরিফুল ইসলাম তার চাকরির সিভিতে নিজের নাম মিঠু রহমান লিখে দেয়। ২০০৭ সালে রাশিয়ায় গিয়ে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে ২০১০ সালে দেশে ফেরে। তবে সিভিতে লিখেছে এইচএসসি পাস। বাবার নাম, ঠিকানার সঙ্গে রেফারেন্স নম্বরটিও ২০১৫ সাল থেকে বন্ধ আছে। একটি এজেন্সির মাধ্যমে স্বনামধন্য চেইনশপ ‘স্বপ্ন’র বনানী শাখায় ক্যাশে চাকরি নেয় শরিফুল। ২০১৭ সালের জুন মাসে চাকরি শুরু করে আগস্টে সটকে পড়ে সে। সে সময় মা অসুস্থ বলে ছুটি নিয়ে আর যোগ দেয়নি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ফের কাজে যোগ দেয়। মার্চের শেষ দিকে একইভাবে ছুটিতে গিয়ে ফিরে আসেনি শরিফুল। এরপর গ্রাহকের অভিযোগের ভিত্তিতে স্বপ্ন কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ শরিফুলকে শনাক্ত করে ফেলে। তবে ভুয়া পরিচয়ের কারণে ধরতে পারেনি। শেষে সিআইডির দক্ষ প্রযুক্তিগত তদন্তে শরিফুল শনাক্ত হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, দুই দফায় শরিফুল পাঁচটি ব্যাংকের গ্রাহকদের টাকা হাতিয়ে গাঢাকা দিয়েছিল। প্রথম দফায় ধরা না পড়ায় ফেরত আসে। দ্বিতীয় দফায় স্বপ্ন ও পুলিশ যখন তাকে খুঁজছিল, তখন সে আর ফেরেনি। ব্যক্তিগত জীবনেও প্রতারক শরিফুল। সে একজন ট্রাফিক সার্জেন্টের মেয়েকে ভুয়া পরিচয় দিয়ে বিয়ে করেছে। মিরপুরের সেনপাড়া পর্বতা এলাকায় স্ত্রীকে নিয়ে থাকত। স্বজনরা শরিফুলের এ অপকর্ম সম্পর্কে জানতই না। ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, কাজ ছাড়ার মতোই মোবাইল ফোন ও ঠিকানা বদল করত শরিফুল, এ কারণে তাকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

মামলা করে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল স্বপ্ন : চেইনশপ স্বপ্নর মার্কেটিং বিভাগের প্রধান আফতাবুল করিম তানিম কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রতারক শরিফুলের প্রতারণার শিকার স্বপ্ন। সে স্বপ্নের সম্মানিত ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করে স্বপ্নের সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করেছে। তিনি আরো বলেন, ভুয়া পরিচয়ে জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ায় স্বপ্ন কর্তৃপক্ষ এর মধ্যে বেশ কিছু উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। যার ভেতর অন্যতম হলো সিভি পুলিশ ভেরিফিকেশনের পরে স্বপ্নতে চাকরি দেওয়ার পদ্ধতি চালু করা এবং ব্যাংকের যেসব মার্চেন্ট মেশিনে হুডি আছে (মেশিনের ওপরের আংশ ঢাকা আছে) সেগুলো ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া, ব্যাংকগুলোকে অনুরোধ করা হয়েছে কার্ডগুলো যাতে চিপযুক্ত হয়।’ তিনি স্বপ্নের ক্রেতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘কাস্টমারদেরও অনুরোধ করা হচ্ছে মার্চেন্ট মেশিনে যখন পিন দেওয়া হবে তা যেন লুকিয়ে দেওয়া হয় এবং স্বপ্নের কোনো আউটলেটে যদি কারো চোখে পড়ে স্বপ্নের কোনো কর্মকর্তা বা অন্য কোনো কেউ কার্ডের দিকে বা পিন নাম্বার দেওয়ার সময় তার দিকে তাকিয়ে আছে তা যেন অতিসত্বর আউটলেটের ম্যানেজার বা স্বপ্নের কলসেন্টার ১৬৪৬৯-এ জানানো হয়।

প্রসঙ্গত, গত মঙ্গলবার মিরপুরের সেনপাড়া পর্বতা এলাকা থেকে শরিফুল ইসলামকে (৩৩) ক্লোন কার্ড, সরঞ্জামসহ গ্রেপ্তার করে সিআইডির সংঘবদ্ধ অপরাধ দল। আদালতের নির্দেশে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে তাকে।



মন্তব্য