kalerkantho


জয়-পরাজয়ে গুরুত্ব পাবে চার বিষয়

শরীফ আহেমদ শামীম, গাজীপুর   

২৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



জয়-পরাজয়ে গুরুত্ব পাবে চার বিষয়

গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ে চারটি বিষয় নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এ চারটি বিষয় হলো নারী ও শ্রমিকদের ভোট, আঞ্চলিকতা ও জনদুর্ভোগ। নগরের ভোটার, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও সুধীসমাজের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে তাদের অভিমত জানা গেছে।

১১ লাখ ৩৭ হাজার ভোটারের অর্ধেকই নারী। মোট ভোটারের মধ্যে প্রায় তিন লাখ শ্রমিক। টঙ্গী ও জয়দেবপুর—দুই অঞ্চলে নগর বিভক্ত। ৫৭টি ওয়ার্ডের প্রায় সব কয়টির রাস্তাঘাটের অবস্থা খারাপ। রয়েছে জলাবদ্ধতার সমস্যা।

নগরের কাজী আজিম উদ্দিন কলেজের অধ্যাপক মো. মুজিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, মোট ভোটারের অর্ধেক অর্থাত্ পাঁচ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি ভোটারই নারী। আসন্ন নির্বাচনে মেয়র পদে জয়-পরাজয়ে বড় নিয়ামক হবে এ নারী ভোটাররা। নারীরা যেদিকে ঘুরবে,  সেদিকেই বিজয়ের পাল্লা ঝুলবে।

টঙ্গীর দত্তপাড়া এলাকার বাসিন্দা সরকারি কর্মকর্তা নূরে আক্তার খাতুন বলেন, একটা সময় নারীরা নির্ভরশীল পুরুষ বা পরিবারের কর্তার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভোট দিত। এখন দিন পরিবর্তিত হয়েছে। নারী শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী হয়েছে। নারীরা এখন অনেক বেশি সচেতন। শুধু প্রতীক নয়, প্রার্থীর শিক্ষা, সততা, সুনাম এবং তাদের ইশতেহারে নারীদের কী সুযোগ-সুবিধা আছে, সেসব দেখে তারা ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে।

গাজীপুর সরকারি মহিলা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী শিলা আক্তার বলছিলেন, তিনি এবারই প্রথম ভোট দেবেন। প্রথম ভোট অবশ্যই দেখেশুনে দেবেন। যিনি অধিক যোগ্য, কথা ও কাজে মিল রয়েছে, অবশ্যই দুর্নীতি করবেন না বা দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয় দেবেন না—এমন একজন মেয়র প্রার্থীকে তিনি ভোট দেবেন। তাঁর মতে, নারীর নিরাপত্তা, অধিকার ও সুবিধা নিয়ে ভাবেন—এমন কাউকে ভোট দেওয়া প্রয়োজন। 

চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় কথা হয় নারী নির্মাণ শ্রমিক রেহেনা খাতুনের (৪৫) সঙ্গে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, কোনো মেয়র প্রার্থীকেই তিনি চেনেন না। তাঁর রিকশাচালক স্বামী নৌকায় ভোট দিতে বলেছেন। আর কলেজছাত্র ছেলে ও এলাকার কয়েকজন মুরব্বি বলেছেন ধানের শীষে দিতে। কাকে ভোট দেবেন সিদ্ধান্ত নেননি। কারো কথায় নয়, অতীত ও ভবিষ্যত্ দেখে ভোট দেবেন তিনি।

গাজীপুর নগরের কাশিমপুর এলাকার বাসিন্দা ও কাশিমপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শওকত হোসেন সরকার বলেন, গাজীপুর মহানগরের দুই হাজার ৬০০ কলকারখানায় প্রায় তিন লাখ শ্রমিক ভোটার আছে, যা মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। নগরের ৫৭টি ওয়ার্ডেই তাদের বসবাস। এসব শ্রমিকের ৯০ শতাংশই কাজের জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসেছে। নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে এসব খেটে খাওয়া মানুষের ভোটের প্রভাব থাকবে।

নগরের সাতাইশ এলাকায় কথা হয় গার্মেন্ট শ্রমিক দুই সন্তানের মা রোজিনা আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, এলাকার রাস্তাঘাটের অবস্থা খুবই খারাপ। গ্যাস ও বিদ্যুত্ সমস্যার সঙ্গে রয়েছে জলাবদ্ধতা। বাড়ির মালিকরা সময়ে-অসময়ে ভাড়া বাড়ায়। রয়েছে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য। শ্রমিকদের এসব সমস্যার সমাধান যিনি করবেন, হুজুগে বা কারো কথায় নয়, ভোটের সিল তাঁর প্রতীকেই দেবেন।

মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মতিউর রহমান মতি বলেন, আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম নিজেই একাধিক কারখানার পরিচালক। তা ছাড়া ব্যবসায়িক কারণে শ্রমিকদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক রয়েছে। শ্রমিকদের সব সমস্যাই তাঁর জানা আছে। নির্বাচিত হলে তিনি সব সমস্যার সমাধান করবেন। এ জন্য শ্রমিকরা তাঁকেই ভোট দেবে।

বিএনপি নেতা সুরুজ আহম্মদ বলেন, বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী সারা জীবন শ্রমিক রাজনীতি করেছেন। টঙ্গী শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে বহু আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। শ্রমিকরাই এর আগে ভোট দিয়ে তাঁকে চেয়ারম্যান, মেয়র ও সংসদ সদস্য বানিয়েছেন। শ্রমিকবান্ধব বলে শ্রমিকরা আগামী নির্বাচনে তাঁকেই বেছে নেবে।

টঙ্গী বাজারের ব্যবসায়ী মো. শহিদুল্লাহ বলেন, আয়তনে দেশের সবচেয়ে বড় গাজীপুর নগর টঙ্গী ও জয়দেবপুর—এ দুই ভাগে অলিখিতভাবে বিভক্ত। ঢাকা সবচেয়ে কাছের টঙ্গী দেশের সবচেয়ে প্রাচীন শিল্পনগরী এবং ব্যবসা কেন্দ্র। অন্যদিকে জয়দেবপুরে সরকারি সব অফিস-আদালত। ১১ লাখ ৩৭ হাজার ভোটারের মধ্যে টঙ্গীর ভোট ছয় লাখ ২০ হাজারের মতো। জয়দেবপুর অঞ্চল থেকে টঙ্গী অঞ্চলে ভোটার প্রায় এক লাখ বেশি। তাই আগামী নির্বাচনে আঞ্চলিকতাও একটা নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে।

বিএনপি প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারের বাসা টঙ্গীতে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের বাসা জয়দেবপুর অঞ্চলে। যিনি টঙ্গীতে বেশি ভোট পাবেন, তিনিই জয়লাভ করবেন— এমন ধারণার বিপক্ষে মত দিলেন গাজীপুরের সমাজকর্মী বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. মনির হোসেন। তাঁর মতে, এখন ভোট মানেই দল বা প্রতীক। ঢাকার কাছে বলে গাজীপুরের মানুষ অনেক সচেতন। তারা আঞ্চলিকতা নয়, ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা দলীয় আনুগত্যকেই প্রাধান্য দেবে।

গাজীপুর বারের আইনজীবী রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোমতাজুল ইসলাম বলেন, প্রার্থীদের বিজয়ের ক্ষেত্রে নারী, শ্রমিক ও আঞ্চলিকতার সঙ্গে নগরের জনদুর্ভোগও বিবেচনায় উঠে আসবে। ৫৭টি ওয়ার্ডেই রাস্তাঘাট ভাঙা, যেখানে-সেখানে আবর্জনার স্তূপ। পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় জলাবদ্ধতার সমস্যা আছে। আগামী নির্বাচনে এসব সমস্যা সামনে চলে আসবে।

গাজীপুরের ভাষাশহীদ কলেজের অধ্যক্ষ ও জেলা সুজন সভাপতি মুকুল কুমার মল্লিক বলেন, চারটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। ভোটাধিকারের ব্যাপারে নারী এখন আগের চেয়ে সচেতন। এ কারণে পারিবারিক সিদ্ধান্তের বাইরেও তাদের ভোট দেওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তা ছাড়া এক-চতুর্থাংশ শ্রমিক যারা বাইরে থেকে এসে কাজ করছে, তারা দলীয় স্বার্থের চেয়ে নিজেদের স্বার্থকেই প্রধান্য দেবে। টঙ্গী ও জয়দেবপুর—দুটি অঞ্চলের ভোটারদের আঞ্চলিকতার মোহে ভোট দেওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। সব শেষ সিটি করপোরেশন এলাকায় গত পাঁচ বছরে তেমন উন্নয়ন না হওয়ায় যে জনদুর্ভোগ দেখা দিয়েছে, সেগুলো নিরসনে কোন মেয়র প্রার্থী অধিকতর আন্তরিক ও সচেষ্ট হবেন, সেটাও ভোটারা বিবেচনায় রাখবে।

 


মন্তব্য