kalerkantho


মৃত নবজাতক জীবিত উদ্ধার কাহিনি

চাইল্ড কেয়ারে অনিয়ম, চক্র জড়িত?

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

২০ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



চাইল্ড কেয়ারে অনিয়ম, চক্র জড়িত?

জীবিতটি রেখে মৃত অন্য নবজাতককে দেওয়ার ঘটনাটি ‘শয্যা পরিবর্তনের কারণেই’ ঘটেছে বলে চট্টগ্রাম নগরের বেসরকারি বিশেষায়িত হাসপাতাল ‘চাইল্ড কেয়ার’ কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে। তবে কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে হাসপাতালটিতে অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। কেউ কেউ বলছে, এর নেপথ্যে সংঘবদ্ধ কোনো চক্র জড়িত থাকতে পারে। ঘটনাটি তদন্ত শুরু করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, এ ঘটনার জন্য দায়ী কয়েকজন কর্মচারীকে তারা বরখাস্ত করেছে।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত শনিবার সন্ধ্যায় দুই দিন বয়সের ওই নবজাতককে নগরের প্রবত্তক এলাকার চাইল্ড কেয়ারে ভর্তির আগে-পরে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যবস্থাপত্রে উল্লেখ ছিল মেয়ে। সেখানে ভর্তির সময় চিকিৎসকরাও ব্যবস্থাপত্রে মেয়ে লেখেন। তিন দিন সেখানে নবজাতকটি মেয়ে হিসেবেই চিকিৎসাধীন ছিল। কিন্তু মঙ্গলবার সকালে হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার স্বাক্ষরিত ওই নবজাতকের ‘মৃত্যুর সনদে’ তাকে পুরুষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। যিনি মৃত্যু সনদে স্বাক্ষর করেছেন, সেই চিকিৎসকের নাম সেখানে উল্লেখ করা হয়নি।

ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার মুখে চাইল্ড কেয়ার কর্তৃপক্ষ গতকাল  বৃহস্পতিবার তাদের চারজন সেবিকা ও একজন অভ্যর্থনাকারীকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। তবে এর সঙ্গে চিকিৎসকসহ আরো কয়েকজন জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলেও তাঁরা বহাল আছেন।

জানতে চাইলে চাইল্ড কেয়ার হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. ফাহিম হাসান রেজা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এর সঙ্গে চিকিৎসকের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ওই দিন এনআইসিইউতে যারা কর্মরত ছিল তাদের মধ্যে আমরা চারজন নার্স এবং একজন রিসেপশনিস্টকে সাময়িক বরখাস্ত করেছি। আমাদের তিন সদস্যের একটি কমিটি ঘটনাটি তদন্ত করছে। আগামী রবিবার তারা প্রতিবেদন দেবে।’

পাঁচজনকে সাময়িক বরখাস্ত করার কথা ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানালেও তিনি তাদের নাম জানাতে অপরাগতা প্রকাশ করেছেন।

মেয়ে নবজাতক ভর্তি করানোর তিন দিন পর মারা গেছে উল্লেখ করে গত মঙ্গলবার সকালে প্যাকেট মোড়ানো মৃত এক নবজাতক দেয় স্বজনদের। চট্টগ্রামের ওই হাসপাতাল থেকে নোয়াখালীর গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর দাফনের আগে গোসল করানোর সময় স্বজনরা দেখে পুরুষ নবজাতক। গতকাল কালের কণ্ঠ’র প্রথম পাতায় ‘মৃত’ নবজাতক জীবিত উদ্ধার কাহিনি’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশিত হয়।

এ নিয়ে এখন তোলপাড় চলছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা খোঁজ নেন। চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গতকাল সকাল ১০টা থেকে কাজ শুরু করেছে। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার নাথকে। আর সদস্যসচিব হলেন একই হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. শাহ আলম। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রধান সহকারী শাহেদুল ইসলাম হলেন কমিটির বাকি সদস্য। কমিটির সদস্যরা গতকাল চাইল্ড কেয়ার পরিদর্শন করেছেন। এ ছাড়া বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েল হাসপাতালে নবজাতক মেয়ে এবং তার মা রোকসানা আক্তারকে দেখতে গেছেন। আজ শুক্রবার সকালে তদন্ত প্রতিবেদন চট্টগ্রামের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. এ এ এম মুজিবুল হকের কাছে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।

এ ছাড়া গতকাল রয়েল হাসপাতালে গিয়ে মা ও নবজাতকের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বৃহস্পবাির সকাল ৯টায় আমাদের তদন্ত কমিটি হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে গঠিত এই তদন্ত কমিটিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর এই ব্যাপারে আমরা সবাইকে জানাব। বিভাগীয় পরিচালক স্যার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।’

পাঁচলাইশ মডেল থানার ওসি মহিউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ঘটনাটি নিয়ে থানায় এখন কোনো অভিযোগ নেই। কেউ মামলা করেনি।

রয়েল হাসপাতাল এনআইসিইউর প্রধান ডা. অজয় কুমার দে কালের কণ্ঠকে বলেন, নবজাতকের অবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা উন্নতির দিকে। বুধবার রাতে মেডিক্যাল বোর্ড হয়েছে। বোর্ডের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলছে। এনআইসিইউর পাশে একটি কেবিনে মা ভর্তি রয়েছেন। তাঁর চিকিৎসাও চলছে।

মেডিক্যাল বোর্ডের প্রধান শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বাসনা মুহুরী বলেন, নবজাতকটি আগের চেয়ে একটু ভালো হয়েছে। তবে যতক্ষণ মুখ দিয়ে মায়ের শাল দুধ খেতে না পারবে, ততক্ষণ নিশ্চিত করে কিছু বলা যাবে না। সে এখনো শঙ্কামুক্ত নয়।

পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ চট্টগ্রামের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম সিরাজুল ইসলাম বলেন, চাইল্ড কেয়ার হাসপাতালের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ শোনা যাচ্ছে তাতে বোঝা যায়, এতে বড় ধরনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা ছিল। চরম দায়িত্ব অবহেলা ছিল। তদন্ত করে যদি আসল ঘটনা বেরিয়ে না আসে তাহলে এই ধরনের ঘটনা আরো বাড়তে পারে। যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে এর সঙ্গে জড়িতদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

বিএমএ চট্টগ্রামের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মুজিবুল হক খান বলেন, তদন্ত শেষ হোক। কমিটির প্রতিবেদন দেওয়ার পর তাতে নিশ্চিত হওয়া যাবে এ ঘটনার জন্য কারা দায়ী।



মন্তব্য