kalerkantho


মনোনয়ন নিয়ে লড়াই বড় দুই দলেই

তৈমুর ফারুক তুষার ও শফিক সাফি    

২০ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



মনোনয়ন নিয়ে লড়াই বড় দুই দলেই

ঢাকা-১৪ আসনে বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে প্রতিযোগিতা রয়েছে নেতাদের মধ্যে। এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আসলামুল হক আগামী নির্বাচনেও প্রার্থী হওয়ার চেষ্টায় আছেন। এখানে ক্ষমতাসীন দলের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সাবিনা আক্তার তুহিন এবার সরাসরি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। দলীয় মনোনয়নের আশায় মাঠ গোছানোর চেষ্টা করছেন দারুস সালাম থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী ফরিদুল হক হ্যাপিও। অন্যদিকে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য এস এ খালেক বার্ধক্যজনিত কারণে নিজে প্রার্থী না হয়ে ছেলে এস এ সিদ্দিক সাজুকে প্রার্থী করতে চাইছেন। এ ছাড়া মনোনয়নের শক্ত দাবিদার ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বজলুল বাসিত আঞ্জুও।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মিরপুর, শাহআলী ও দারুসসালাম থানা এবং রূপনগর থানার আংশিক ও সাভার উপজেলার কাউন্দিয়া ইউনিয়ন নিয়ে ঢাকা-১৪ নির্বাচনী এলাকা। এলাকাগুলো ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ঢাকা-১১ আসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০০৮ সালে নির্বাচনের আগে আসন পুনর্বিন্যাসের ফলে ঢাকা-১১ আসনের এলাকাগুলো নিয়ে ঢাকা-১৪, ঢাকা-১৫, ঢাকা-১৬ এই তিনটি আসন গঠন করা হয়। সেই নির্বাচনে ঢাকা-১৪ আসনে বিএনপির প্রভাবশালী প্রার্থী এস এ খালেককে হারিয়ে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আসলামুল হক। ২০১৪ সালের নির্বাচনেও তিনি সংসদ সদস্য হন।

আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী একাধিক নেতা মাঠে সক্রিয় থেকে অনুসারী নেতাকর্মীদের নিয়ে বলয় সৃষ্টির চেষ্টা করায় এলাকায় দলীয় কোন্দল বাড়ছে।

বর্তমান সংসদ সদস্য আসলামুল হক আবারও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। টানা দুইবার সংসদ সদস্য থাকায় এলাকায় যেসব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করেছেন সেগুলো মানুষের কাছে তুলে ধরে তিনি নিজের জনসমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। বসে নেই দলে তাঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী সাবিনা আক্তার তুহিনও। ঢাকা মহানগর উত্তর যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক তুহিন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে রাজপথে সাহসী ভূমিকা রাখায় তুহিন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অনেক নেতারও প্রিয়ভাজন। এলাকায় তাঁর অনুসারী নেতাকর্মীরা নিজেদের সংগঠিত করছেন। নির্বাচনের মাঠ গোছানোর চেষ্টা করছেন আসলামের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত দারুস সালাম থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী ফরিদুল হক হ্যাপিও। তিনি মিরপুর বাঙলা কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও দারুস সালাম যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। তরুণ প্রজন্মের কাছে তাঁর বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

মিরপুর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কাজী আজাদুল কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকা-১৪ আসনে এই মুহূর্তে যাঁরা মনোনয়নপ্রত্যাশী আছেন তাঁদের মধ্যে আসলামুল হকের বিকল্প আমি দেখতে পাচ্ছি না। এখানে বিভিন্ন সময় কেউ কেউ নিজের বলয় তৈরির চেষ্টা করেছেন, তবে সফল হননি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখানকার সংসদ সদস্য আসলামুল হককে দিয়ে যে উন্নয়ন বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন তা সফলতার সঙ্গে করতে পেরেছেন আসলামুল হক। এই এলাকায় কয়েক শ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। এ ছাড়া আসলামুল হক কর্মীবান্ধব নেতা। ফলে আগামী নির্বাচনে স্থানীয় নেতাকর্মীরা তাঁকেই এমপি হিসেবে দেখতে চায়।’

কাজী ফরিদুল হক হ্যাপি বলেন, ‘আমাদের এলাকায় নিজেদের মধ্যে ছোটখাটো গ্রুপিং আছে, এটা একটা বড় দলে থাকেই। তবে যাঁরা প্রার্থী আছেন তাঁদের মধ্যে বর্তমান সংসদ সদস্য আসলামুল হকই সবচেয়ে যোগ্য। নেত্রী (শেখ হাসিনা) যাঁকে নৌকার প্রার্থী করবেন তাঁর পক্ষেই আমরা সবাই কাজ করব।’

শাহআলী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাশেম মোল্লা বলেন, ‘নেত্রী যাঁকে মনোনয়ন দেবেন আমরা তাঁর জন্যই কাজ করব। তবে এই এলাকায় সাবিনা আক্তার তুহিনকে মনোনয়ন দিলে নৌকাকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করা আমাদের জন্য সহজ হবে। তুহিন আপা কর্মীবান্ধব নেত্রী, ঢাকা-১৪ আসনে তাঁর বিকল্প নেই।’

সাবিনা আক্তার তুহিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরেই এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখের সাথি। আমি অনেকের মতো এমপি হয়ে হাজার কোটি টাকার মালিক হইনি। যিনি এমপি নির্বাচিত হয়ে নিজের সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলায় ব্যস্ত থাকেন এমন প্রার্থী দেখতে চায় না স্থানীয় নেতাকর্মীরা। আমি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আমার সঙ্গে আছে। দল চাইলে এই আসনে নৌকার প্রার্থী হব। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে এলাকার উন্নয়নে আমার সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চয়ই সাধারণ ভোটাররা মূল্যায়ন করবে।’

সংসদ সদস্য আসলামুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার কাছে প্রতিটি দিনই নির্বাচনী প্রস্তুতির দিন। প্রতিদিন মানুষের কাছে যাই। তাদের নানা সমস্যার কথা শুনি। সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করি। এখন উঠান বৈঠক শুরু করেছি। আর আমার নির্বাচনী ওয়াদা যা ছিল সেগুলো শতভাগ পূরণ করেছি। একসময় এই অঞ্চল সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল। বিগত ৯ বছরে এখানে বড় কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়নি। মাদকের বিরুদ্ধেও আমরা ব্যাপক সোচ্চার আছি। প্রতিটি ওয়ার্ডে শত শত কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। আরো কয়েক শ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন আছে। এলাকার মানুষের যে পরিমাণ কল্যাণ করেছি তা যদি তারা মনে রাখে তবে আবারও আমাকেই এমপি নির্বাচিত করবে।’ দলীয় কোন্দল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এখানকার হাতে গোনা দু-একজন নেতা বাদে সবাই আমরা ঐক্যবদ্ধ আছি।’

নবম সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন এস এ খালেক। এর আগে এ এলাকায় তিনি পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বয়সের ভারে তিনি ন্যুব্জ ও অসুস্থ, দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতেও নিষ্ক্রিয়। ফলে আগামী নির্বাচনে এখানে বিএনপির নতুন প্রার্থী দেখা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে মহানগর উত্তর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বজলুল বাসিত আঞ্জু এবং এস এ খালেকের ছেলে এস এ সিদ্দিক সাজু এগিয়ে রয়েছেন।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যাওয়ার আগে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন এস এ খালেক ছেলে সাজুকে নিয়ে। খালেক তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে আগামী নির্বাচনে তিনি না পারলে সাজুকে যাতে মনোনয়ন দেওয়া হয় তার জন্য অনুরোধ করেন।

এস এ খালেক বিএনপির টিকিটে প্রথমবার এমপি নির্বাচিত হন ১৯৭৯ সালে। এরপর এরশাদ আমলে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে পর পর দুইবার নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচন এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচন করে বিজয়ী হন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির এ সদস্য। ছেলে এস এ সিদ্দিক সাজু ১৯৯১ সাল থেকেই বাবার হয়ে প্রতিটি নির্বাচনে অন্তরালে থেকে কাজ করেছেন। ২০১৪ সাল থেকে মিছিল-মিটিংয়ে সক্রিয় আছেন। এবার হয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সহসভাপতি।

এস এ সিদ্দিক সাজু কালের কণ্ঠকে বলেন, বিএনপির কর্মী হিসেবে তাঁর বাবা যেমন মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন, তিনিও করে যাচ্ছেন। দলের হাইকমান্ড মনোনয়ন দিলে তিনি আসনটি দলকে উপহার দেবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী বজলুল বাসিত আঞ্জুও মাঠে সক্রিয় আছেন। মিরপুর ছাত্রদলের কর্মী হিসেবে শুরু করেছিলে রাজনীতি। ছিলেন অবিভক্ত মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। বর্তমানে তিনি মহানগর উত্তর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে সভাপতির অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। মিরপুরের মানুষের দাবি আদায়ের জন্য তিনি সব সময় সামনের কাতারে ছিলেন বলে দাবি স্থানীয় বিএনপি নেতাদের। ২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত আঞ্জু ছিলেন ৭ নং ওয়ার্ডের কমিশনার।

বজলুল বাসিত আঞ্জু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সহায়ক সরকারের দাবি আদায় করেই বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে। সেই নির্বাচনে বিএনপি তার দুঃসময়ের কর্মীদের মনোনয়ন দেবে সেটাও সবার প্রত্যাশা। আমি যেহেতু রাজপথে ছিলাম, এই দুঃসময়েও আছি, তাই মনোনয়নের ব্যাপারে আমি আশাবাদী। দলীয় হাইকমান্ডের ইচ্ছায়ই আমি কাজ করে যাচ্ছি।’



মন্তব্য