kalerkantho


সশস্ত্র ট্রেনিংয়ের জন্য তালিকা হয় ’৭০ সালেই

শেখ কামরুজ্জামান টুকু   

১৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



সশস্ত্র ট্রেনিংয়ের জন্য তালিকা হয় ’৭০ সালেই

১৯৬৫ সাল। আমি খুলনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি। পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি হই। ছাত্রলীগের সভাপতি তখন সৈয়দ মাযহারুল হক বাকী, সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক। তবে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় পদ ছেড়ে খুলনা ফিরে এলাম। জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পেলাম।

১৯৬৪ সালের দিকের কথা। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে স্বাধীনতার ধারণা প্রচার শুরু হয়। পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন বাংলা করার কথা বলা হয়। তবে প্রচারটা করা হতো খুব গোপনে। নেতাদের বিশ্বস্ত যারা তাদের মধ্যে।

প্রচারটা শুরু করেছিলেন সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, কাজী আরেফ আহমেদ। পরবর্তী সময়ে তোফায়েল আহমেদও এর সঙ্গে যোগ হন। তবে আবদুর রাজ্জাক আমাদের বলতেন, এ ধারণা প্রচার বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই হচ্ছে।

আসলে সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাঁকে ঘিরেই ছিল আমাদের রাজনীতি। একপর্যায়ে আমরাও বৃঝতে পারি নেতারা যে স্বাধীনতার কথা বলছেন, তাতে বঙ্গবন্ধুর সায় আছে। পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগের যে সভায় স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ হয়, জয় বাংলা স্লোগান ওঠে, নেতারা সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করার বক্তৃতা দেন, সে ছাত্র-জনসভার প্রধান অতিথি ছিলেন বঙ্গবন্ধু। এগুলোর প্রতি সমর্থন না থাকলে কি বঙ্গবন্ধু সে সভার প্রধান অতিথি হতেন? নিশ্চয়ই না।

বাস্তবে পাকিস্তান যুগের রাজনীতির মোড় ঘুরে যায় বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা ঘোষণার পর। ছয় দফা প্রচারের পরপরই অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে মুজিব ভাই ও আওয়ামী লীগের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন বাড়তে থাকে। সে সময় আমরা ছাত্র-কর্মীরা শ্রমিকদের মধ্যে ছয় দফা প্রচার করতাম। শ্রমিকদের ছয় দফা বোঝানোর কাজ করতাম। তেজগাঁ শ্রমিকদের মাঝে টানা প্রায় দুই মাস কাজ করার পর নুরে আলম সিদ্দিকীর সঙ্গে আমিও গ্রেপ্তার হয়ে যাই। মুক্তি পাই ১৬ মাস পর। কারাগার থেকে বের হয়ে খুলনা চলে আসি। নুরে আলম সিদ্দিকীকে কারাগারে থাকতে হয় তিন বছর।

খুলনা চলে এলেও আবদুর রাজ্জাক আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। ১৯৭০ সালের গোড়ার দিককার কথা। তখনো নির্বাচন হয়নি। আবদুর রাজ্জাক আমাদের বলেছিলেন, দেশ স্বাধীন করার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম করতে হবে, যুদ্ধ করতে হবে, সে জন্য অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নিতে হবে। ছাত্র-যুবাদের মধ্যে যারা অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নিতে আগ্রহী তাদের তালিকা করা হচ্ছে বলেও আবদুর রাজ্জাক জানালেন। আমি প্রশিক্ষণের জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছিলাম। জেনেছিলাম গোপন অস্ত্রের প্রশিক্ষণ হতে পারে কিউবা কিংবা রাশিয়াতে। যা হোক পরে তো সে প্রশিক্ষণ নিতে হলো ভারতে।

১ মার্চ ছিলাম ঢাকায়। ইকবাল হল (বর্তমান জহুরুল হক হল) থেকে নুরে আলম সিদ্দিকীর সঙ্গে পল্টনে আওয়ামী লীগ অফিসের দিকে যাচ্ছিলাম। পথে একটি পান-সিগারেটের দোকানে জটলা দেখে থামলাম। রেডিওতে শুনলাম ইয়াহিয়া খান গণপরিষদের অধিবেশন স্থগিত করেছেন। ঢাকা শহরে মিছিল শুরু হলো। নুরে আলম সিদ্দিকীকে বললাম, ভাই এ অবস্থায় আমার খুলনা যাওয়া উচিত। নুরে আলম সিদ্দিকী পল্টনের দিকে গেলেন, আমি হলে এসে ব্যাগ নিয়ে খুলনা রওনা হলাম।

৩ মার্চ খুলনাতে ছাত্র-শ্রমিক-সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে বিশাল মিছিল বের হলো। মিছিলে গুলি চালাল পাকিস্তানি সেনারা। শহীদ হলো ১১ জন। পরদিন আমরা শহরের বন্দুকের দোকান লুট করে অস্ত্রগুলো নিজেদের কবজায় নিলাম। যদিও তার আগে থেকেই খুলনাতে ‘জয় বাংলা বাহিনীর অস্ত্রের প্রশিক্ষণ চলছিল।

প্রথমবার ভারতে যাই এপ্রিলের মধ্যভাগে। কলকাতায় দেখা হয় আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে। তখনো ভারত সরকারের সহায়তায় প্রশিক্ষণ শুরু হয়নি, তবে সীমান্ত এলাকায় বিএসএফ কিছু স্বল্প প্রশিক্ষণ দিয়ে হালকা অস্ত্র দেওয়া শুরু করেছে। বিএসএফের প্রশিক্ষণ ও একটি অস্ত্র নিয়ে দেশে আসি। বাগেরহাটে এসে দেখি এলাকা পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ন্ত্রণে। পাকিস্তানপন্থী লোকগুলোও জেগে উঠেছে। বাগেরহাটে থাকাই অনিরাপদ হয়ে উঠল।

দ্বিতীয়বার ভারতে যাই মে মাসে। ততদিনে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। এবার কলকাতায় দেরি করতে হয়নি। আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ আমাদের দ্রুত প্রশিক্ষণে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। চলে যাই দেরাদুনের টাঙ্গুয়া ক্যাম্পে। প্রশিক্ষণ নিই প্রথম ব্যাচে। আমাদের সঙ্গে ছিলেন ফরিদপুরের শাহ মোহাম্মাদ আবু জাফর, সিরাজগঞ্জের আবদুল লতিফ মির্জা, পাবনার রফিকুল ইসলাম বকুল, চট্টগ্রামের আবদুল মান্নানসহ আরো অনেকে। আমাকে মুজিব বাহিনী খুলনার (বর্তমানে বৃহত্তর খুলনা) প্রধান করা হয়। আমাদের প্রশিক্ষণ ছিল ৪৫ দিনের।

প্রশিক্ষণ শেষে বাহিনী নিয়ে আমরা সরাসরি বিমানে চলে আসি দমদমে। দেশে প্রবেশ করি সাতক্ষীরার হাকিমপুর হয়ে। সীমান্তে আমাদের বিদায় জানান সিরাজুল আলম খান। দেশে প্রবেশের পর পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে আমরা সরাসরি ৩২টি যুদ্ধে অংশ নিই।

লেখক : মুজিব বাহিনী খুলনা জেলা প্রধান। ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহসভাপতি। বর্তমান বাগেরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

অনুলিখন : লায়েকুজ্জামান


মন্তব্য