kalerkantho


ডাব্লিউটিও নিয়ে চিন্তায় ভারত

৫২ দেশের মন্ত্রীরা আজ বসছেন দিল্লিতে

আবুল কাশেম   

১৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



৫২ দেশের মন্ত্রীরা আজ বসছেন দিল্লিতে

বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা নিয়ে চিন্তিত প্রভাবশালী দেশগুলো। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করিয়েছেন। উত্তর আমেরিকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে (নাফটা) যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সংরক্ষণ করে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। সস্তা পণ্যে এশিয়া থেকে আফ্রিকা, ইউরোপ থেকে আমেরিকা পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করছে চীন। এ অবস্থায় স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ রক্ষার একমাত্র বৈশ্বিক ফোরাম বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডাব্লিউটিও) অকেজো। সংস্থাটির বিভিন্ন সম্মেলনে আলোচ্য বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি ও কার্যকর হচ্ছে না।

এ অবস্থায় উদ্বিগ্ন দক্ষিণ এশিয়ার প্রভাবশালী দেশ ভারত ৫২টি দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীদের নিয়ে আজ সোমবার থেকে দুই দিনের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের আয়োজন করেছে। আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসে সংস্থাটির আগামী মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে অতীতের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা ও স্বল্পোন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষায় করণীয় নির্ধারণে এই বৈঠকের আয়োজন করেছে দেশটি।

নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে যোগ দিতে আজ ভারত যাচ্ছেন বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। গতকাল কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে না ডাব্লিউটিও। সংস্থাটির বিভিন্ন সম্মেলনে নেওয়া আলোচ্য বিষয় নিষ্পত্তি হচ্ছে না। দোহা সম্মেলন থেকে শুরু করে সিঙ্গাপুর ও বালি সম্মেলনে কোনো বিষয়ের নিষ্পত্তি হয়নি। এ অবস্থায় ভারত ৫২টি দেশের মন্ত্রীদের নিয়ে আলোচনার একটি উদ্যোগ নিয়েছে। সেখানে যা আলোচনা হবে তা আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠেয় ডাব্লিউটিওর সম্মেলনে তুলে ধরা হবে। যুক্তরাষ্ট্রকেও বৈঠকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত।

বৈঠকের আমন্ত্রণপত্রের সঙ্গে একটি ধারণাপত্র পাঠিয়েছে ভারত। তাতে বলা হয়েছে, বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থায় সুরক্ষা ও শক্তিশালী অবস্থানের গুরুত্ব বর্তমানে যতটা বেড়েছে, আগে ততটা ছিল না। বুয়েনস এইরেসে বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা নিয়ে বিশদ আলোচনা হবে।

নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে স্বাধীন ও খোলামেলাভাবে এসব বিষয়ে আলোচনা হবে। এসব আলোচনা থেকে প্রধান প্রধান বিষয়ে দর-কষাকষি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রেও নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব হবে।

ধারণাপত্রে বলা হয়েছে, আজ সোমবার রাতে মধ্যাহ্নভোজের মধ্য দিয়ে দুই দিনের এ আলোচনা শুরু হবে। মধ্যাহ্নভোজের সময় ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রী সুরেশ প্রভু পরদিনের আলোচনার বিষয়ে ধারণা দিয়ে বক্তব্য দেবেন। মঙ্গলবার সকালে প্রত্যেক মন্ত্রী নিজ নিজ দেশের স্বার্থ সম্পর্কে তিন মিনিট করে বক্তব্য দেবেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ডাব্লিউটিওর সিদ্ধান্তের কারণে স্বল্পোন্নত দেশ উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশগুলোতে শুল্কমুক্ত বিশেষ রপ্তানি সুবিধা পেয়ে থাকে। ভারত উন্নয়নশীল দেশ হওয়ায় এ সুবিধা পায় না। তারা মনে করে, ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোরও উন্নত দেশগুলোতে এ সুবিধা পাওয়া উচিত। কারণ এসব দেশে বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর আয় এখনো অনেক কম ও অঞ্চলভেদে দারিদ্র্যের হারও প্রকট। ডাব্লিউটিওর আগামী সম্মেলনে এ বিষয়ে জোরালো অবস্থান নিতে চায় ভারত। তাতে অন্য দেশগুলোর সমর্থন আদায়ের জন্যই আজ ও আগামীকালের বৈঠক আয়োজন করা হচ্ছে। ভারতের এ উদ্যোগ সফল হলে অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার পরও উন্নত দেশগুলোতে শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা পাবে। এ ছাড়া ডাব্লিউটিও ই-কমার্স ও ক্ষুদ্র, ছোট ও মধ্যম ব্যবসা উদ্যোগ নিয়ে যে নীতি গ্রহণ করতে যাচ্ছে, তাও ভারতের বিপক্ষে যাবে। তাই এ ব্যাপারেও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে ভারত।

গত জানুয়ারি মাসে ডাব্লিউটিওর সাবেক মহাপরিচালক প্যাসকেল লেমি বাংলাদেশে এসেছিলেন। বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থার সমস্যা সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রভাবশালী দেশগুলোর আপত্তির কারণে সংস্থাটির কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় এটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে কি না, এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার ক্ষমতায় আসার পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য উদারীকরণের পরিবর্তে সংরক্ষণমূলক নীতি গ্রহণ করেছে। অথচ বিশ্ব বাণিজ্যের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিই সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়ে থাকে। কারণ চীনের চেয়ে তাদের অর্থনীতির আকার প্রায় চার গুণ।

গত ১২ মার্চ টাইমস অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয়েছে, লোকসভায় লিখিত প্রশ্নের উত্তরে ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প প্রতিমন্ত্রী সি আর চৌধুরী বলেছেন, বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান নানা ইস্যু ও চ্যালেঞ্জ বিষয়ে মতবিনিময়ের জন্য ভারত এই অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের আয়োজন করেছে। তিনি বলেছেন, ডাব্লিউটিওতে ভারতের অবস্থান হলো, কৃষিকে অবশ্যই অগ্রাধিকার দিতে হবে। ভারত ডাব্লিউটিওতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জীবনযাত্রা ও খাদ্য নিরাপত্তা সুরক্ষায় গুরুত্ব দেয়। 

টাইমস অব ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে প্রথম এ ধরনের একটি বৈঠকের আয়োজন করেছিল ভারত। এবারের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়াসহ আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মন্ত্রীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রতিপক্ষ পাকিস্তানকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে দিল্লিতে পাকিস্তানি দূতাবাসের কর্মকর্তাদের হয়রানির অভিযোগ তুলে পাকিস্তান এ বৈঠকে যোগ দেবে না বলে জানিয়েছে। অবশ্য উন্নয়নশীল দেশ হওয়া সত্ত্বেও কয়েক বছর আগে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বিবেচনায় জিএসপি প্লাস কর্মসূচির আওতায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন পাকিস্তানকে শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা দিয়েছে।



মন্তব্য