kalerkantho


শক্ত অবস্থান গড়েছেন নানক বিএনপিতে একাধিক প্রার্থী

তৈমুর ফারুক তুষার ও শফিক সাফি   

১৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



শক্ত অবস্থান গড়েছেন নানক বিএনপিতে একাধিক প্রার্থী

রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শেরেবাংলানগর থানার আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৩ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক। স্থানীয় আওয়ামী লীগে কিছুটা কোন্দল থাকলেও আগামী নির্বাচনে এ আসনে নানকের হাতেই থাকবে নৌকার হাল। ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় অনেক নেতার সঙ্গে কথা বলে এমন আভাস মিলেছে। অন্যদিকে বিএনপির কয়েকজন নেতা মনোনয়নের আশায় মাঠে সক্রিয় আছেন। বিগত পাঁচটি জাতীয় নির্বাচনে এ আসনে দলের স্থানীয় কোনো নেতাকে প্রার্থী করেনি বিএনপি। এবার স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা মনোনয়ন পেতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন।

মোহাম্মদপুরের ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড, আদাবরের ২৯ নম্বর ওয়ার্ড এবং শেরেবাংলানগরের ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের এলাকাগুলো নিয়ে এই আসন। এখানে টানা দুই মেয়াদে সংসদ সদস্য আছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক। ২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রথম এ আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে নানক বিএনপির প্রার্থী মোয়াজ্জেম হোসেন আলালকে হারিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে ২০১৪ সালের নির্বাচনে দ্বিতীয় মেয়াদে সংসদ সদস্য হন তিনি।

১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত কোনো নির্বাচনেই স্থানীয় ভোটার এমন নেতাকে প্রার্থী করেনি বিএনপি। বরাবরই দলটি ‘বহিরাগত’ প্রার্থী দিয়েছে এই আসনে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে নির্বাচন করেছিলেন এখান থেকে। তিনি এই এলাকার ভোটার ছিলেন না। আসনটি তিনি ছেড়ে দেওয়ার পর উপনির্বাচনে নির্বাচিত ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারও এই এলাকার ভোটার ছিলেন না। এবার এই এলাকার ভোটার নন এমন সম্ভাব্য প্রভাবশালী প্রার্থীর পাশাপাশি দলের স্থানীয় একাধিক নেতাও মনোনয়ন পেতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন। ঢাকা মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব ও দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুস সালাম, ঢাকা মহানগর উত্তরের সহসভাপতি আতিকুল ইসলাম মতিন, আইনজীবী ও সাবেক ছাত্রনেতা অ্যাডভোকেট খন্দকার জিল্লুর রহমান এ আসনে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী।

ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়নদৌড়ে এবং নির্বাচনী প্রস্তুতিতে এগিয়ে আছেন ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক। তিনি আগামী নির্বাচনেও দলীয় মনোনয়ন পাবেন বলে মনে করে স্থানীয় আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী।

মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানা আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা জানান, ঢাকা-১৩ আসনের বিভিন্ন এলাকায় ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খানের অনুসারীদের সঙ্গে নানকের অনুসারী কর্মী-সমর্থকদের খানিকটা বিরোধ আছে। তবে মনোনয়নের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা নানকের ওপরই আস্থা রাখবেন। টানা দুই মেয়াদে নানকের দায়িত্ব পালনকালে মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছে। এলাকার রাস্তাঘাট, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির সন্তোষজনক উন্নতি হয়েছে। একসময় দিনে-দুপুরে ছিনতাই, ডাকাতি হতো মোহাম্মদপুর এলাকায়। এগুলো এখন নেই বললেই চলে। মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় বিভিন্ন রাস্তার সংস্কার হয়েছে। ফলে এসব এলাকার সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে।

মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান মিয়া চান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই আসনে কে মনোনয়ন পাবেন তা নেত্রীই (শেখ হাসিনা) ঠিক করে দেন। তিনি যাঁকে মনোনয়ন দেন আমরা তাঁর জন্যই কাজ করি। আমরা নেতাকর্মীরা নৌকার পক্ষে আছি। গত ৯ বছরে এই এলাকায় অনেক উন্নয়ন হয়েছে। আশা করি জনগণ আগামী দিনেও নৌকার পক্ষে ভোট দেবে।’

২৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়ার্ড পর্যায়ে নির্বাচনের কাজ শুরু হয়নি। তবে আমরা নৌকার পক্ষে জনসমর্থন বাড়াতে বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছি। বর্তমান সরকারের আমলে এই এলাকায় অনেক উন্নয়ন হয়েছে। সেগুলো নিশ্চয়ই জনগণ মূল্যায়ন করবে।’

জাহাঙ্গীর কবির নানক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জনসেবার ব্রত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করছি। মানুষের কল্যাণকেই সব সময় অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছি। বিগত ৯ বছর সংসদ সদস্য হিসেবে এই এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। অতীতের তুলনায় রাস্তাঘাট, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে তা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। আমি মনে করি, এই এলাকার সাধারণ মানুষ সার্বিক উন্নয়নকে মূল্যায়ন করেই ভোট দেবে।’

বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও ঢাকা মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব আব্দুস সালামের বসবাস ঢাকার শান্তিনগরে, জন্ম ফকিরাপুলে। তিনি অবশ্য মোহাম্মদপুরের শ্যামলীতে অফিস নিয়েছেন। এখান থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। নবম সংসদ নির্বাচনে এ আসনে দলীয় প্রার্থী দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবারও আলোচনায় আছেন। তবে বিএনপির হাইকমান্ড তাঁকে অন্য আসনে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা করছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। বিএনপিতে এমন আলোচনাও আছে যে আলালকে বরিশালের উজিরপুরে তাঁর নির্বাচনী এলাকায় মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে। এর আগে তিনি সেখান থেকে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। এ ছাড়া ঢাকা-১৫ আসনেও (কাফরুলে) আলালের নাম আলোচনায় রয়েছে। এর বাইরে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সহসভাপতি আতিকুল ইসলাম মতিন, সাবেক ছাত্রনেতা অ্যাডভোকেট খন্দকার জিল্লুর রহমান প্রার্থী হতে আগ্রহী বলে শোনা যাচ্ছে।

জানা গেছে, বিএনপির প্রার্থী চূড়ান্ত না হলেও আব্দুস সালাম এলাকায় গণসংযোগ করছেন। বিভিন্ন সামাজিক, পারিবারিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন। গত ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা উপলক্ষে শুভেচ্ছা বার্তা দিয়ে পোস্টারও সাঁটিয়েছিলেন এলাকায়। ওয়ার্ডভিত্তিক নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন।

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সহসভাপতি আতিকুল ইসলাম মতিন ছিলেন মোহাম্মদপুর ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ২০০২ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ছিলেন এই এলাকার কমিশনার। যাঁরাই এই এলাকায় প্রার্থী হয়েছেন তাঁদেরই নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে আলোচনায় থাকা অ্যাডভোকেট খন্দকার জিল্লুর রহমান আকাশ নীলা ওয়েস্টার্ন সিটি লিমিটেড ও আকাশ নীলা হোমস লিমিটেডের চেয়ারম্যান। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সমবায় দল ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সঙ্গেও জড়িত তিনি। দলের চেয়ারপারসন গ্রেপ্তার হওয়ার পর যে মামলা হয়েছে তাতে গ্রেপ্তার হয়ে তিনি কারাগারে রয়েছেন।

আব্দুস সালাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে আন্দোলন করছি, যে আন্দোলনের কারণে আমাদের নেত্রী জেল খাটছেন। যদি জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত হয় এবং আমার দল নির্বাচনে অংশ নেয়, তাহলে অবশ্যই এই আসন থেকে আমি নির্বাচন করব।’ তিনি আরো বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রতিও আমি বিভিন্ন সভা-সমাবেশে, টক শোতে আহ্বান জানিয়েছি, আপনারা জনগণের ম্যান্ডেট নিশ্চিত করুন। দেখুন তারা কাকে ভোট দেয়। তারা যাঁকে ভোট দেবে তিনিই জনপ্রতিনিধি হবেন। আমার বিশ্বাস মানুষ ভোট দিতে পারলে অবশ্যই বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হব।’

আতিকুল ইসলাম মতিন বলেন, ‘আমার বাবা-মা, ভাই-বোন, চাচা-চাচি, মামা-মামি থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজন সবারই এই এলাকায় জন্ম ও বসবাস। দল-মত-নির্বিশেষে সবার সঙ্গেই আমার সুসম্পর্ক। আমার দল আমাকে মনোনয়ন দিলে এই সুসম্পর্ক কাজে লাগিয়ে মানুষের কল্যাণের জন্য এই আসনটি আমি বিএনপিকে উপহার দেব।’

 

 



মন্তব্য