kalerkantho


দেশঘরের গান

শিকড় সুরের আসর

নওশাদ জামিল   

১৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



শিকড় সুরের আসর

ওয়াহিদুল হক স্মরণে ধানমণ্ডি রবীন্দ্রসরোবরে অনুষ্ঠানে ধামাইল নৃত্যগীত পরিবেশনা। ছবি : কালের কণ্ঠ

গ্রামীণ আদলে সাজানো মঞ্চ। মঞ্চের এক কোণে শণ ও লতাপাতায় ঘেরা কুঁড়েঘর। মনোরম পরিবেশে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় ধানমণ্ডির রবীন্দ্রসরোবর মঞ্চে আয়োজিত হয় মাটির গান ও নৃত্যের এক অপূর্ব লহরি। ঘড়ির কাঁটা তখন সন্ধ্যা ৬টার ঘরে। মঞ্চ থেকে ভেসে এলো ঢোলের শব্দ। সুর তুলল মোহনীয় বাঁশি। শিল্পীরা গাইলেন বাউল অঙ্গের পালাগান। গাইলেন লোকগান। মাঝে পরিবেশিত হলো ধামাইল নৃত্যগীত।

সংগীতগুণী ওয়াহিদুল হক স্মরণে গতকাল শুক্রবার আয়োজন করা হয় মনমাতানো দেশজ গান ও নৃত্যের জমজমাট এই উৎসব। ওয়াহিদুল হকের জন্মদিনে প্রতিবছর লোকজ গান ও নৃত্য নিয়ে এমন ভিন্নধর্মী উৎসব আয়োজন করে আসছে ছায়ানট।  

আমৃত্যু সংস্কৃতির শাণিত হাতিয়ারকে সঙ্গী করে পথ চলেছেন ওয়াহিদুল হক। সুর ও সংস্কৃতির শক্তিতে ভর করে লড়েছেন অসুরের বিরুদ্ধে। স্বপ্ন দেখেছেন অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ঋদ্ধ সম্প্রীতিময় বাংলাদেশের। জীবনভর কাজ করে গেছেন সৃজনশীল ও মননশীল সমাজ গড়ার আকাঙ্ক্ষায়। গতকাল শুক্রবার ছিল এই গুণীর ৮৫তম জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষে আয়োজিত হয় ওয়াহিদুল হক স্মারক দেশঘরের গান শীর্ষক সাংস্কৃতিক উৎসব।

ওয়াহিদুল হক তাঁর লেখা ও কর্মে বরাবরই দেশজ শিক্ষা ও সংগীতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশ্বাস করতেন, এই দুইয়ের যথাযথ পরিচয়, চর্চা ও সংরক্ষণে বাঙালি সংস্কৃতির কাঠামো মজবুত হয়ে উঠবে। তারই একটি উপায় হলো নিজের গানের শিকড়ের সঙ্গে পরিচয়। যাতে আছে নতুন করে জেগে ওঠার সম্ভাবনা। সেই উজ্জীবনেরই একটি আয়োজন দেশঘরের গান।

উৎসবের উদ্বোধন করেন কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর পূর্বসুখাতী গ্রামের প্রবীণ বাউল শিল্পী মোজাফফর হোসেন। স্বাগত বক্তব্য দেন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী লাইসা আহমেদ লিসা। আলোচনায় অংশ নেন লেখক ও গবেষক মফিদুল হক।

শিল্পী মোজাফফর আহমেদ সারাটা জীবন কাটিয়েছেন লোকজ সুর ও সংগীত নিয়ে। ছোটবেলা কেটেছে যাত্রাদলের সঙ্গে। গান শেখার শুরু তখনই। বাংলাদেশ ও ভারতের নানা জায়গায় বিভিন্ন ওস্তাদের কাছে তিনি গান শিখেছেন। তৈরি করেছেন সংগীতের একটি নিজস্ব ঘরানা। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মাটির গান ও সুরে তেমন যান্ত্রিকতা নেই। রয়েছে সহজিয়া আখ্যান। নগরজীবনে বেশির ভাগ মানুষ যন্ত্রনির্ভর। অতিরিক্ত যন্ত্রনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। তারই একটি উপায় হলো আমাদের নিজেদের গানের শিকড়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়া।’

মফিদুল হক বলেন, ‘সংগীতের সমৃদ্ধ ও অপূর্ব ধারা লোকসংগীত ও নৃত্য। প্রকৃতপক্ষে এই ধারার গান ও নৃত্যই আমাদের নিজস্ব সম্পদ। নগরবাসীর কাছে এ ধারার গান তুলে ধরতে এমন আয়োজন সত্যিই প্রশংসনীয়।’

সংক্ষিপ্ত আলোচনা শেষে শুরু হয় গান ও নৃত্যের জমজমাট আসর। শুরুতেই ছিল পালাগান। ঢাকার কেরানীগঞ্জের দেওয়ানবাড়ির আরিফ দেওয়ান ও কানন দেওয়ানের দল পরিবেশন করে গুরু-শিষ্যের পালাগান। বাউল অঙ্গের পালাগানে মেতে ওঠে পুরো উন্মুক্ত মঞ্চ। লেকের পাড়ে স্থাপিত প্রতিটি আসনই তখন পূর্ণ। নগরবাসী বিমোহিত হয় তাঁদের পরিবেশনায়।

পালাগানের পর ছিল একক সংগীত। গেয়ে শোনান লোকগানের খ্যাতিমান শিল্পী মোজাফফর হোসেন ও আফছার আলী। প্রবীণ শিল্পী মোজাফফর হোসেন শুরুতে কীর্তন গেয়ে শোনান। দরাজ কণ্ঠে তিনি পরিবেশন করেন ‘গোপীজন মনচোরা’ গানটি। দ্বিতীয় পরিবেশনায় তিনি শোনান লোকগান ‘ও বাজান চল যাই’। শিল্পী আফছার আলী গেয়ে শোনান দুটি জনপ্রিয় ধারার লোকগান। শুরুতেই তিনি ভরাট কণ্ঠে পরিবেশন করেন ‘ও কন্যারে তুমি যদি উঠো আমার গাড়িতে’। গান শেষে তুমুল উচ্ছ্বাসে হাততালি দেয় উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা। দ্বিতীয় পরিবেশনায় তিনি গেয়ে শোনান, ‘ও মোর বুলবুলির মাও’ গানটি।

উৎসবের প্রতিটি গানই দারুণভাবে মুগ্ধ করে শ্রোতাদের। বিশেষভাবে লক্ষণীয় বিষয় হল—কোনো পরিবেশনায়ই যন্ত্রের আধিক্য ছিল না। দেশজ সংগীতে গানটাই মূল, বাজনাটা শুধু কাজ করেছে অনুঘটক হিসেবে। কণ্ঠের কারুকাজ আর সারল্য মুগ্ধ করেছে নগরের শ্রোতাদের।

উৎসবে পরবর্তী আকর্ষণ ছিল ধামাইল নৃত্য। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের নবনাগরী ধামাইল সংঘ পরিবেশন করে অপূর্ব নৃত্যগীত। তাতে অংশ নেন রামকৃষ্ণ সরকার ও তাঁর দল। সব শেষে সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় ভিন্নধর্মী এই আসর।



মন্তব্য