kalerkantho


চার শান্তিরক্ষীর মরদেহ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন

স্বজনদের আহাজারি শোকাবহ পরিবেশ

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



চার শান্তিরক্ষীর মরদেহ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন

মালিতে মাইন বিস্ফোরণে নিহত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্য জামাল উদ্দিনের মরদেহ গতকাল তাঁর গ্রামের বাড়িতে আনার পর বাবার কফিন ছুঁয়ে শিশু রিহাদের কান্না। ছবি : কালের কণ্ঠ

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালিতে মাইন বিস্ফোরণে নিহত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর চার সদস্যের মরদেহ গতকাল শুক্রবার নিজ নিজ গ্রামে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মরদেহ বাড়িতে পৌঁছালে স্বজনদের আহাজারিতে শোকাবহ হয়ে ওঠে পরিবেশ।

এর আগে গতকাল ঢাকা সেনানিবাসের ১৩ এমপি ইউনিটের ‘চপার্স ডেনে’ চার বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হকসহ ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। জানাজা শেষে চার শহীদের সম্মানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন সেনাবাহিনীর প্রধান।

‘আব্বু বলেছিল বিদেশ থেকে বাড়ি ফিরে বেড়াতে নিয়ে যাবে। আব্বু তো কথা রাখল না। আমার আব্বু কোথায় গেল। কেন এমন হলো। আমাকে আব্বুর কাছে নিয়ে যাও। আমি শুধু আমার আব্বুকে চাই। আব্বু ছাড়া আমরা কেমন করে থাকব।’ সেনা সদস্য আকতার হোসেনের মরদেহ মাগুরার শ্রীপুরের বরালিদহের বাড়িতে পৌঁছালে তাঁর এসএসসি পরীক্ষার্থী মেয়ে রিমি কফিন ধরে এভাবে আহাজারি করছিল।

একইভাবে সেনা সদস্য মো. জামাল উদ্দিনের মরদেহ তাঁর বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঘোড়াপাখিয়া ইউনিয়নের ঘাইসাপাড়ায় পৌঁছালে কান্নায় ভেঙে পড়ে স্বজনরা। ওয়ারেন্ট অফিসার আবুল কালাম আজাদের মরদেহ তাঁর বাড়ি পিরোজপুরের নাজিরপুরের কলারদোয়ানিয়ায় নেওয়া হলে সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের অবতারণা হয়। সৈনিক রায়হানের মরদেহ পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার সমাজনারী গ্রামে তাঁর বাড়ি পৌঁছালে স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। বিস্তারিত আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে—গতকাল বিকেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ধুমিহায়াতপুর ঘাইসাপাড়া কবরস্থানে বিকেল ৩টায় জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয় শান্তিরক্ষী মো. জামাল উদ্দিনের মরদেহ। এর আগে দুপুরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারযোগে ঢাকা থেকে লাশ চাঁপাইনবাবগঞ্জে নতুন স্টেডিয়ামে আনা হয়। এরপর গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। জামালের লাশ দেখার জন্য সকাল থেকেই এলাকার শত শত নারী-পুরুষ ভিড় করতে থাকে।

লাশের কফিন জড়িয়ে জামালের বাবা মেসের আলী, মা ফেরদৌসী বেগম, স্ত্রী ফাহিমা আখতার শিল্পী ও সাড়ে পাঁচ বছরের সন্তান ইমরান আল রিহাদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। এ সময় লাশের সঙ্গে আসা সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু এমপি জামালের বাবা ও মাকে সান্ত্বনা দেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার আবুল কালাম আজাদের লাশ পিরোজপুরের নাজিরপুরের কলারদোয়ানিয়ায় নিজ বাড়িতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। এর আগে সকাল ১১টায় হেলিকপ্টারযোগে ঢাকা থেকে তাঁর লাশ নাজিরপুর স্টেডিয়ামে আনা হয়। সেখানে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আবুল কালাম আজাদের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। দুপুর ২টায় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সামরিক মর্যাদায় তাঁর মরদেহ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। এ সময় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিমসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা  উপস্থিত ছিলেন।

সৈনিক রায়হানের মরদেহ পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার সমাজনারী গ্রামে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। দুপুর পৌনে ২টার দিকে ঢাকা থেকে রায়হানের মরদেহ তাঁর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। বগুড়া সেনানিবাসের ক্যাপ্টেন মাহমুদ পরিবারের সদস্যদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করেন। জুমার নামাজের পরেই সমাজনারী মাদরাসা মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে শত শত মানুষ অংশ নেয়।

সেনাবাহিনীর সদস্য আকতার হোসেনের মরদেহ মাগুরার শ্রীপুরের বরালিদহে তাঁর নিজ গ্রামের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হযেছে। এর আগে দুপুর ১২টায় আকতার হোসেনের মরদেহ সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে মাগুরা স্টেডিয়ামে পৌঁছে। সেখানে যশোর সেনানিবাসের ২৩ রেজিমেন্টের একটি সেনাদল আকতার হোসেনের মরদেহ গ্রহণ করে গ্রামের বাড়ি শ্রীপুর উপজেলার বরালিদাহ নিয়ে যায়। বাদ  জুমা  বাড়ির পাশের মসজিদ মাঠে জানাজা শেষে বরালিদাহ কবরস্থানে তাঁর লাশ দাফন করা হয়।

সকাল থেকেই এলাকার মানুষ ভিড় করে আকতার হোসেনের বাড়িতে। মরদেহ বাড়িতে এলে কান্নায় ভেঙে পড়ে স্বজনরা। স্ত্রী রেনু বেগম বারবার আছড়ে পড়ছিলেন আকতারের কফিনের ওপর। অঝোরে কাঁদছে দুই মেয়ে রিমি ও জান্নাত।


মন্তব্য