kalerkantho


চেকে স্বাক্ষর নেই অথচ চেক প্রতারণা মামলার আসামি

আশরাফ-উল-আলম    

১৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



চেকে স্বাক্ষর নেই অথচ চেক প্রতারণা মামলার আসামি

ব্যাংক চেকে স্বাক্ষর নেই। ব্যাংক অ্যাকাউন্টও তাঁর নামে নয়। যে প্রতিষ্ঠানের নামে চেক, সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকও তিনি নন। তার পরও তিনি চেক প্রতারণা মামলার আসামি। গত আট বছর ধরে এমন একটি মামলায় জড়িয়ে আদালতে ঘুরছেন মুহম্মদ আলী নামের এক ব্যক্তি।

মুহম্মদ আলী চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার নাঙ্গলমোড়া গ্রামের বাসিন্দা। ২০০৯ সালের ৯ জুলাই ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেন রাজধানীর লালবাগের গুলবদন সুপার মার্কেটের ব্যবসায়ী মো. মফিজুল হক। চেক প্রতারণার অভিযোগে ‘নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্টের’ ১৩৮ ধারায় এই মামলা করা হয়।

মামলার এজাহারে বলা হয়, বাদী মফিজুল হক বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা করে সুনাম অর্জন করেছেন। আসামি মুহম্মদ আলী চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের মেসার্স এস এ এন্টারপ্রাইজের মালিক। উভয়ে পূর্বপরিচিত। মুহম্মদ আলী বাদীর কাছ থেকে ৩৮ লাখ ৫১ হাজার ৭৯২ টাকার চিনি কেনেন ২০০৮ সালের ৩১ অক্টোবর। নগদ মূল্য না দিয়ে বাদীকে ওই টাকার উত্তরা ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার একটি চেক দেন মুহম্মদ আলী । বাদী ওই চেক নগদায়নের জন্য ব্যাংকে জমা দিলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানায়, অ্যাকাউন্টের মালিক অ্যাকউন্টটি বন্ধ করে দেওয়ায় চেকটি ডিস-অনার করা হলো। এরপর মুহম্মদ আলীকে টাকা পরিশোধের জন্য উকিল নোটিশ দেন বাদী। টাকা পরিশোধ না করায় ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন বাদী।

মুহম্মদ আলী সমন পেয়ে আদালতে হাজির হন। তিনি জামিন পান। সেই ২০০৮ সাল থেকে এই মামলা চলছে। আসামি নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন। ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।

মামলার নথি থেকে দেখা যায়, যে চেক আদালতে দাখিল করে মামলা করা হয়েছে ওই চেকে আসামি মুহম্মদ আলীর স্বাক্ষর নেই। ২০১৪ সালের ৭ এপ্রিল ও ১৮ জুলাই দুই দিন মামলার বাদী মফিজুল হক আদালতে সাক্ষ্য দেন। ওই সাক্ষ্যে তিনি বলেন, মুহম্মদ আলী তাঁর কাছ থেকে মাল খরিদ করে একটি চেক দেন। আসামিপক্ষের জেরার জবাবে তিনি বলেন, চট্টগ্রামের মেসার্স এস এ এন্টারপ্রাইজের নামের ব্যাংক হিসাবে মালিক হিসেবে মুহম্মদ আলী চেকে স্বাক্ষর করেন।

মামলার নথি থেকে আরও দেখা যায়, আসামি মুহম্মদ আলী সাফাই সাক্ষী হিসেবে গত ৩০ অক্টোবর আদালতে সাক্ষ্য দেন। ওই সাক্ষ্যে তিনি জানান, বাদীর কাছ থেকে চিনি ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান এস এ এন্টারপ্রাইজের মালিক ছালেহ আহমেদ চৌধুরী। তিনি ব্যাংক থেকে কাগজপত্র সংগ্রহ করে জানতে পেরেছেন এটা। বাদীর আদালতে দাখিল করা ব্যাংক চেকেও ছালেহ আহমেদ চৌধুরীর স্বাক্ষর রয়েছে।

আসামির দাখিল করা কাগজপত্র থেকে দেখা যায়, মেসার্স এস এ এন্টারপ্রাইজের মালিক ছালেহ আহমেদ চৌধুরী। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ একটি প্রত্যয়নপত্র দিয়েছে। ওই প্রত্যয়নপত্রেও বলা হয়েছে, ব্যাংক অ্যাকাউন্টটি এস এ এন্টারপ্রাইজের নামে। আর নালিশি চেকে ছালেহ আহমেদ চৌধুরীর স্বাক্ষর রয়েছে। তাঁকে আসামি করা হয়নি।

নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্টের ১৩৮ ধারা অনুযায়ী মামলা করতে হলে, যিনি চেকে স্বাক্ষর করেছেন তিনি আসামি হবেন। অথচ এই মামলায় বাদী আরেকজনকে আসামি করে দিনের পর দিন তাঁকে হয়রানি করছেন। ঢাকার আদালতে ফৌজদারি মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী সঞ্জীব চন্দ্র দাস কালের কণ্ঠকে বলেন, চেকে স্বাক্ষরকারীকে আসামি না করে অন্য কাউকে আসামি করার কোনো বিধান নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্টে নেই। আদালতেরও এই মামলাটি চালিয়ে যাওয়ার কোনো যুক্তি নেই।

মামলার আসামি মুহম্মদ আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আট বছর ধরে কোর্টে হাজিরা দিচ্ছি। আদালতকেও বলা হয়েছে, যে চেক দিয়ে আমার নামে মামলা করা হয়েছে সেই চেকে আমার স্বাক্ষর নেই। যে প্রতিষ্ঠান বাদীর কাছ থেকে মাল খরিদ করেছে, সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকও আমি নই। কিন্তু আদালত কখনোই আমার কথাকে পাত্তা দেননি। আমি হয়রানির শিকার। মিথ্যা মামলার আসামি হয়ে আমি পরিবারের কাছে, সমাজের কাছে প্রতিনিয়ত হেয় হচ্ছি।’

আসামির আইনজীবী মাখন রায় বলেন, বাদী চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। এরপর মামলা বিচারের জন্য দায়রা আদালতে স্থানান্তর হয়। সেখানে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের সময় বলা হয়েছে যে নালিশি ব্যাংক চেকে আসামির স্বাক্ষর নেই। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা চলতে পারে না। কিন্তু আদালত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন। এই আট বছর ধরে আসামিকে হয়রানি করার প্রতিদান কে দেবে?



মন্তব্য