kalerkantho


নারী জাগরণ

কাজল-লাইলীদের পথচলা

জসীম পারভেজ, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)    

১৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



কাজল-লাইলীদের পথচলা

নারী জাগরণে সম্মাননা অর্জনকারী পটুয়াখালীর সবিতা রানীকে দেখতে সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে ছুটে আসেন এই নারী নেত্রী। ছবি : কালের কণ্ঠ

ধর্মীয় গোঁড়ামি, বাল্যবিয়ের শৃঙ্খল, যৌন হয়রানিসহ নানামুখী বঞ্চনার চিত্র দেশের নারীসমাজে বরাবরের চিত্র। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শহর জীবনেও নারীরা সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতায় আবদ্ধ হয়ে আছে। সামাজিক-রাজনৈতিক মর্যাদা এবং পারিবারিক অধিকার আদায়মূলক কর্মকাণ্ডও অতি নগণ্য। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদের নারীরাও এর বাইরে ছিল না। তাদেরই কয়েকজন হাওলা বেগম, মর্জিনা বেগম, সবিতা রানী ও লাইলী বেগম। তবে সব বাধা জয়ের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে আন্তর্জাতিক সম্মান অর্জন করেছেন এই চার নারী।

সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া নারীদের প্রশিক্ষণজ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ করে দিয়ে গ্রামীণ নারী জাগরণ সৃষ্টিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন বরিশালের বেসরকারি সহায়তা সংস্থা (এনজিও) ‘আভাস’-এর নির্বাহী পরিচালক রহিমা সুলতানা কাজল। তাঁর হাত ধরেই উপকূলীয় জেলা বরিশাল ও পটুয়াখালীর গ্রামে গ্রামে তৈরি হয়েছে নারী জাগরণ ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সচেতন নারী দল।

সরেজমিনে কলাপাড়া উপজেলার লালুয়া ইউনিয়নের পশরবুনিয়া গ্রামের হাওয়া বেগমের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, ঘরের বারান্দায় একদল নারীকে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। সেখানে উপস্থিত রাজিয়া বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের প্রতিবেশী এক নারী নির্যাতনের শিকার হওয়ায় সমাধানের জন্য হাওয়া আপার কাছে এসেছি।’

হাওয়া বেগম : নারী নেত্রী হাওয়া বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১৯৯৬ সালে এসএসসি পাস করার পরই আমাকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকে সমুদ্র নিকটবর্তী উত্তাল রামনাবাদ নদের তীরে বসবাস করে বাল্যবিয়ে, নারী নির্যাতন, যৌতুক এবং দুর্যোগ মোকাবেলা করে এসেছি। এরপর ২০০৮ সালে এনজিওর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হই। সে সুবাদে সুযোগ হয়েছে এলাকায় বাল্যবিয়ে, যৌতুক ও যৌন হয়রানি রোধে কার্যকর ভূমিকা পালনের। দুর্যোগে গ্রামীণ নারীদের সহযোগিতা করায় ২০১১ সালে ‘নাসরীন হক স্মৃতি পদক’ ও ২০১২ সালে ব্যাংককে জাতিসংঘের ‘লাইট হাউস’ পুরস্কার পাই। একই বছর পোল্যান্ডে গিয়ে সেই পুরস্কার গ্রহণ করি। ২০১৭ সালে কলাপাড়া উপজেলা পরিষদের উদ্যোগে আমাকে সম্মাননা দেওয়া হয়। নারীদের সচেতন ও অধিকার আদায় এবং বাল্যবিয়ে রোধে আমৃত্যু কাজ করে যাব।’

মর্জিনা বেগম : আরেক সংগ্রামী নারী মর্জিনা বেগম। বাড়ি একই উপজেলার বালিয়াতলী ইউনিয়নের দক্ষিণ বড় বালিয়াতলী গ্রামে। বাল্যবিয়ে, যৌতুক প্রথা ও নারী নির্যাতন রোধ এবং নারী অধিকার আদায়ে উচ্চকণ্ঠ এই নারী বলেন, ‘১৯৯৭ সালে এসএসসি পাস করার পরই অভিভাবকরা বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দেন। বাল্যবিয়ের শিকার হয়ে ২০০৭ সালে একটি এনজিওতে সম্পৃক্ত হই। নানা বাধা অতিক্রম করে এনজিও থেকে পাওয়া প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাড়ির আঙ্গিনায় সবজি চাষ করে পরিবারে সচ্ছলতা আনতে সক্ষম হই। কৃষিতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৩ সালে ফিলিপাইনে আমাকে সম্মাননা দেওয়া হয়। ‘বীজ ব্যাংক’ কাজের জন্য ২০১৪ সালে নেপালে সার্ক সম্মেলনে সম্মানিত হয়েছি। ২০১৫ সালে মিয়ানমারেও আমাকে সম্মাননা দেওয়া হয়। ২০১৭ সালে ঢাকায় জাতীয় কনভেনশনেও আমাকে সম্মাননা দেওয়া হয়।’ তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী বালিয়াতলী দাখিল মাদরাসার শিক্ষক এস এম কামাল উদ্দিন প্রথমে এসব কর্মকাণ্ডের পক্ষে ছিলেন না। পরে তিনিও নানা কাজে আমাকে সহযোগিতা করেন।’

সবিতা রানী হাওলাদার : উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের নবীপুর গ্রামের সবিতা রানী হাওলাদার নারী জাগরণে নেতৃত্বদানের স্বীকৃতি হিসেবে ইতিমধ্যে দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সম্মানিত হয়েছেন। কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি বলেন, “দুর্যোগে সর্বস্ব হারিয়ে নিদারুণ প্রতিকূলতা পাড়ি দিতে হয়েছে আমার পরিবারের সদস্যদের। সেই প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে কৃষিসংশ্লিষ্ট আয় বৃদ্ধিমূলক কাজে নিযুক্ত হয়ে পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। তবে শুধু নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকিনি। নারীর অধিকার আদায়ে সব সময় সোচ্চার থেকেছি। এরই মধ্যে ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে জাপানে ‘দুর্যোগ ও জলবায়ু’ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিই। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে জাপান সরকার আমাকে বিশেষ সম্মাননা দিয়েছে। এরপর অস্ট্রেলিয়ান এক নারী নেত্রী ও এক মানবাধিকারকর্মী আমার সঙ্গে দেখা করতে বাংলাদেশে আসেন।” নারী নেতৃত্ব ও দুর্যোগে মানবসেবায় কাজ করায় ২০১৪ সালে ‘নাসরীন হক স্মৃতি পদক’ অর্জন করেন এই সংগ্রামী নারী।

লাইলী বেগম : সংগ্রামী আরেক নারী নেতৃত্ব লাইলী বেগম। বাড়ি নীলগঞ্জ ইউনিয়নের মস্তফাপুর গ্রামে। দীর্ঘ আলাপচারিতায় কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘প্রতিবন্ধী দরিদ্র বাবার একমাত্র মেয়ে হওয়ায় ১৫ বছর বয়সেই আমার বিয়ে হয়ে যায়। স্বামীর সংসারে এসেও দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে হয়। এমন অসহায় অবস্থায় ১৯৯৫ সালে বাড়ির পাশেই ব্র্যাক প্রতিষ্ঠিত একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করি। এরপর ধর্মীয়, সামাজিক ও প্রভাবশালীদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে যুক্ত হই বিভিন্ন এনজিওর সঙ্গে। কর্মদক্ষতার গুণে স্থানীয় কৃষক মৈত্রী ক্লাবের সদস্য নির্বাচিত হই। এরপর গ্রামের নারীদের অধিকার আদায়সহ সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ি। সে সুবাদে ২০১২ সালে নীলগঞ্জ ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী সদস্য নির্বাচিত হই। স্থানীয় এনজিও আভাসের মাধ্যমে আমি এখন অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত।’ তিনি আরো বলেন, ‘নারী নেতৃত্ব এবং দুর্যোগে গ্রামীণ পর্যায়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করায় ২০১৭ সালে মেক্সিকোর কানকুনে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকিবিষয়ক বৈশ্বিক সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের পাঁচ হাজারের বেশি প্রতিনিধি আমার দুর্যোগ-জয় ও নারী নেতৃত্বের গল্প শুনেছেন।’

আভাস এনজিওর নির্বাহী পরিচালক রহিমা সুলতানা কাজল বলেন, ‘বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকার হাজারো নারীর অধিকার আদায় এবং নির্যাতন-নিপীড়নসহ নানা সমস্যা মোকাবেলা করা কারো একার পক্ষে সম্ভব নয়। সে কারণেই আমি বরিশালের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শহরে শত শত নারী নেত্রী তৈরি করছি। আভাস ও অ্যাকশনএইড বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার সহযোগিতায় গড়ে ওঠা নারী নেতৃত্ব আজ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্মানিত হচ্ছে। বাংলাদেশের নারী নেতৃত্বের জয়জয়কার বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ছে।’



মন্তব্য