kalerkantho


জয়িতা পদক

পাঁচ জয়িতার জীবনজয়

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



পাঁচ জয়িতার জীবনজয়

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে জয়িতা পদকপ্রাপ্ত পাঁচ নারী। ছবি : পিএমও

যেখানে ঠিকমতো সূর্যের আলো পৌঁছায় না, সেই পার্বত্য খাগড়াছড়ির মা হলা ক্রা প্রু মারমা নিজের ১১ সন্তানকে করেছেন উচ্চশিক্ষার আলোয় আলোকিত। সংসারে খাবার না জোটা বৃষ্টি সংগ্রাম শুরু করেন একটি ভাড়া করা সেলাই মেশিন নিয়ে। এখন দুই কোটি টাকার তিন-তিনটি কারখানার মালিক তিনি। পিতৃহারা আট ভাই-বোনের একজন নাছিমা সমাজের সমালোচনা উপেক্ষা করে আজ সরকারি কলেজের শিক্ষক। পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নির্যাতিতা, চোখের সামনে নিজের শিশুপুত্রকে টেনে ছিঁড়ে ফেলার দৃশ্য দেখা ফিরোজা জীবন গুছিয়ে নিয়েছেন শত যন্ত্রণা ভুলে। মুক্তিযোদ্ধা আমিনা বেগম এখনো ছুটছেন নারীর ভাগ্যোন্নয়নে। জীবনযুদ্ধে জয়ী এসব কীর্তিমান মহীয়সীকে ‘জয়িতা’ সংবর্ধনা দিয়েছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁদের পদক দিয়ে ভূষিত করেছেন।

সম্বল শুধু একটি ভাড়া করা সেলাই মেশিন। বেকার স্বামী। ঘরে বিবাহযোগ্য তিন ননদসহ ছয়জনের ভরণ-পোষণ জোটে না। সেই থেকে শুরু বৃষ্টির সংগ্রামী জীবন। ভাড়া করা মেশিনে অন্যের কাপড় সেলাই করে যাত্রা শুরু। তারপর ভাগ্য যেন ইঞ্চি ইঞ্চি করে ধরা দিতে থাকে নরসিংদীর দাসপাড়া গ্রামের বৃষ্টির কাছে। বর্তমানে তিনটি কারখানার মালিক তিনি। নগদ পুঁজি এক কোটি টাকা, কারখানার মূল্য আরো এক কোটি টাকা। শখানেক নারী শ্রমিক বর্তমানে কাজ করছে বৃষ্টির কারখানায়।

অথচ জন্মের পর পেট ভরে খাবার পাননি বৃষ্টি। তিনি যখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়তেন, বাবা কর্মক্ষমহীন হয়ে পড়েন। তিন ভাই-বোন ও অসুস্থ বাবার পুরো দায়িত্ব পড়ে অন্যের বাড়িতে কাজ করা মায়ের ওপর। প্রাইমারির গণ্ডি পেরিয়ে সবে মাধ্যমিকে গিয়েছেন। বই কেনার সামর্থ্য নেই। অন্যের বই ধার করে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করা বৃষ্টির বিয়ে হয় আরেক অভাবী আবু সালেহ সেন্টুর সঙ্গে। স্বামীর সংসারেও ছিল তিন ভাই, তিন বোন। সবার দায়িত্ব সেন্টুর ওপর; কিন্তু সেন্টুও হঠাৎ বেকার হয়ে যান। সংসার চালানোর পুরো দায়িত্ব পড়ে বৃষ্টির ওপর। তবে ভাগ্য তাঁর সুপ্রসন্ন হতে থাকে। সেন্টুসহ অপর দুই ভাইয়ের আবার চাকরি হয়। একে একে তিন ননদকে বিয়ে দেন বৃষ্টি; কিন্তু স্বামীর বেতন মোটে তিন হাজার টাকা। তাই ঘরেই জামা, পাঞ্জাবি ও শাড়িতে হাতের কাজ শুরু করেন বৃষ্টি। পরে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ১০ হাজার টাকা দিয়ে জিগার মেশিন বানিয়ে ছয় হাজার টাকা দিয়ে মিলের কাপড় কেনেন। প্রায় এক বছর ১০০ গজ করে কাপড় হাতে ঘুরিয়ে সাদা করে বিক্রি করেন। বাড়তে থাকে তাঁর পুঁজি। জমানো পুঁজি দিয়ে কিনে নেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল সুইং পাওয়ার মেশিন। বর্তমানে তাঁর সুইং মেশিনের সংখ্যা ৬০। বৃষ্টির ইচ্ছা, ভবিষ্যতে এক হাজার মেয়ে তাঁর কারখানায় সরাসরি কাজ করবে।

সাত বছর বয়সে বাবা হারানো মোসা. নাছিমা খাতুন খুলনার রূপসা উপজেলার শ্রীরামপুরে জন্মগ্রহণ করেন। আট ছেলে-মেয়ে নিয়ে অল্প বয়সে বিধবা হন মা জয়নব বেগম। আট ভাই-বোনের মধ্যে ছয় বোন, দুই ভাই। নাছিমা সবার মধ্যে পঞ্চম, বোনদের মধ্যে চতুর্থ। মৃত বাবার ব্যবসা ও কিছু জমির আয়েই কষ্টে চলত তাঁদের সংসার। তবুও পড়াশোনায় ক্ষান্ত দেননি মেধাবী নাছিমা। প্রয়োজনের সময় খাতা-কলম পাননি। তবুও দ্বিতীয় থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত রোল নম্বর ১-এর নিচে নামতে দেননি। এসএসসি পাসের পর আত্মীয়দের বিরোধিতা উপেক্ষা করে দূরের বয়রা কলেজে ভর্তি হন। রূপসা ঘাটে হাঁটু পানি দিয়ে হেঁটে যেতেন কলেজে। সরকারি বিএল কলেজ থেকে প্রাণিবিদ্যায় বিএসএস সম্মান পাসের পর এমএসএস পাস করার আগেই তাঁর ছোট বোনের বিয়ে হয়। তখন নাছিমাকেও বিয়ের কথা বলা হতো। তবে তিনি বলতেন, বিসিএস পরীক্ষায় পাস না করে তিনি বিয়ে করতে চান না। সমাজে তাঁর বয়স নিয়ে কত কটূক্তি হয়েছে! তবুও পরিবার মেনে নিয়েছে তাঁর ইচ্ছা। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আট বছর শিক্ষকতা করার ফাঁকে ফাঁকে প্রস্তুতি নিয়েছেন বিসিএস পরীক্ষার। অবশেষে ২৯তম বিসিএসে ১৫তম মেধাক্রম নিয়ে উত্তীর্ণ নাসিমা সরকারি সাতক্ষীরা কলেজে যোগদান করেন। তিনি ভবিষ্যতে লেখনীর মাধ্যমে নারীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি ও নারী উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে চান।

যেখানে সূর্যের আলোও ঠিকমতো পৌঁছে না, যানবাহন নিয়েও যাতায়াত দুর্গম। সেখানে জন্ম নেওয়া এক মা তাঁর ১১ সন্তানকে করেছেন উচ্চশিক্ষিত। ১১ সন্তানের মধ্যে তিন ছেলে, এক মেয়ে অস্ট্রেলিয়া সরকারের বৃত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষিত হয়েছেন। তিনি ১৯৫০ সালে খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার চৌংড়াছড়িতে জন্ম নেওয়া হলা ক্রা প্রু মারমা। সফল এই জননী নিজে পড়েছেন তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত। স্বামী ছিলেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। বাড়ি আর অল্প কিছু চাষযোগ্য জমি ছিল। সন্তানদের পড়াতে চাষযোগ্য জমিগুলো বিক্রি করেছেন। মা বাড়িতে না থাকলে সন্তানদের পড়াশোনায় ক্ষতি হতে পারে, তাই জীবনের দীর্ঘ সময় কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে যাননি তিনি। সন্তানদের ‘মানুষ’ করতে নিজের মা-বাবা ও আত্মীয়দের কাছ থেকে পাওয়া ৩০-৩৫ ভরি সোনা সস্তায় বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। বিক্রি করে দিয়েছেন স্বামীর পেনশনও।

নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করেছিলেন ঢাকার সাভার উপজেলার যাদুর চর গ্রামের ফিরোজা খাতুন। স্কুলে যাওয়ার বয়স হওয়ার আগেই জন্ম হয় আরো তিন ভাই-বোনের। সংসারে খরচ বাড়ে। আর ওই সময় প্যারালিসিসে আক্রান্ত হন বাবা। শয্যাশায়ী বাবার চিকিৎসা, ছোট ভাই-বোনদের বাঁচাতে মায়ের সঙ্গে হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পালন শুরু করেন ফিরোজা। ১৮-১৯ বছরে বিয়ে হওয়া ফিরোজা মা হন সত্তরের প্রথম প্রহরে। একাত্তরের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তানি হানাদার এসে সবার সঙ্গে তাঁর ঘরেও আগুন দেয়। গুটি গুটি পায়ে হাঁটা ফিরোজার ছেলেটিকে চার-পাঁচজন নরপশু চোখের সামনে টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলে। জননী ফিরোজা চিৎকার করতে থাকলে তাঁকেও হানাদাররা টেনে নিয়ে যায় ক্যাম্পে। একসময় মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্প দখল করে নিপীড়নে ক্ষতবিক্ষত ফিরোজাকে উদ্ধার করে। দীর্ঘ সেবায় সুস্থ হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের রান্নার কাজ করে দিতেন ফিরোজা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে গ্রামে ফেরেন। কিন্তু নষ্টা মেয়ে অভিযোগ তুলে গ্রামের মানুষ তাঁকে গ্রাম ছাড়ার রায় দেয়। গ্রামবাসীর চাপে স্বামী তাঁকে তালাক দেন। আকাশ ভেঙে পড়ে মাথার ওপর। মাটি সরে যায় পায়ের তলা থেকে। সব হারিয়েও হারতে নারাজ ফিরোজা। ঢাকায় এসে এ ফুটপাত থেকে সে ফুটপাত, এ বারান্দা থেকে সে বারান্দায় ঘুরে ঘুরে অবশেষে বীরাঙ্গনা হিসেবে আগারগাঁও বস্তিতে অন্য বীরাঙ্গনাদের সঙ্গে মাথা গোঁজার ঠাঁই পান। পরে বিয়ে করেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ইসহাক মিয়াকে। দুই সন্তানের মধ্যে একজন খিঁচুনি রোগে মারা যায়। একমাত্র সন্তানকে মানুষ করতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে স্পেশাল আয়ার কাজ নেন। এরই মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান স্বামী। সেই বিপর্যয় কাটিয়ে নিজের মেয়েকে বিয়ে দেন ফিরোজা।

স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে স্লোগানে মুখর থাকতেন আমিনা বেগম। ১৯৬৯-৭০ সালে সিরাজগঞ্জ মহাবিদ্যালয়ের নির্বাচিত যুগ্ম সম্পাদক ও ছাত্রলীগের মহিলা সম্পাদক ছিলেন তিনি। করেছেন মুক্তিযুদ্ধও। ভারতের পাঙ্গা আর্মি ক্যাম্প থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করে ৭ নম্বর সেক্টরে সিরাজগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধাদের দিতেন তিনি। অসুস্থ বীরাঙ্গনাদের তালিকা করে থাকার ব্যবস্থা করতেন, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতেন। বাংলা মায়ের ১৯ জন যুদ্ধশিশুকে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে বিদেশিদের হাতে হস্তান্তর করেছেন তিনি। ১৯৯৪-২০০৮ পর্যন্ত তৃণমূল পর্যায়ে শতাধিক মহিলাকে নারী সংগঠন করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ায় বিচারের ব্যবস্থা করার জন্য বীর মাতাদের পক্ষ থেকে টেক্সাসের একটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠানেও বক্তব্য দেন তিনি। বর্তমানে তিনি সমন্বিত স্বেচ্ছাসেবী মহিলা উন্নয়ন সংস্থার সভানেত্রী। সংস্থাটি নারীর ক্ষমতায়ন ও বাল্যবিবাহ রোধে কাজ করছে।



মন্তব্য