kalerkantho


বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন

নগদ লেনদেনে বছরে অপচয় ৯ হাজার কোটি টাকা

আবুল কাশেম   

৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



নগদ লেনদেনে বছরে অপচয় ৯ হাজার কোটি টাকা

নগদ টাকা ছাপতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বছরে খরচ হয় ৪৪৭ কোটি টাকা। আর ছাপানো টাকা পরিবহন ও ছাপানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে ব্যয় হয় আরো তিন কোটি টাকা। এই হিসাব তুলে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে নগদ টাকার পেছনেই শুধু তাদের খরচ হয়েছে ৪৫০ কোটি টাকা। তবে নগদ টাকার পেছনে মোট যে খরচ হয়, এই ৪৫০ কোটি টাকা তার মাত্র ৫ শতাংশ। বাকি ৯৫ শতাংশ খরচ হয় নগদ অর্থ লেনদেনে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, সরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, সব মিলিয়ে নগদ অর্থ লেনদেনে গত অর্থবছরে বাংলাদেশের খরচ হয়েছে ৯ হাজার কোটি টাকা, যাকে খরচ না বলে ‘অপচয়’ বলা যেতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নগদ অর্থ লেনদেন কমিয়ে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারে মনোযোগ দিয়েছে। তাতে ওই সব দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে। আমাদের পাশের দেশ ভারতও নগদ অর্থ লেনদেনের পরিবর্তে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে অর্থ লেনদেনে নাগরিকদের জন্য প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। এমন পরিস্থিতিতে নগদ অর্থের লেনদেন ও ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে লেনদেনের সার্বিক চিত্র সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে একটি প্রতিবেদন চেয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। ছয় কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি স্টাডি দল এসংক্রান্ত প্রতিবেদন তৈরি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্টের মহাব্যবস্থাপক লীলা রশিদের নেতৃত্বে গঠিত স্টাডি দলের অন্য সদস্যরা হলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক কামাল হোসেন, খন্দকার আলী কামরান আল জাহীদ, মো. মাসুদ রানা, সৈয়দ গোলাম শাহজারুল আলম, মো. লুলু মিয়া ও উপপরিচালক মো. নূর-ই-আলম সিদ্দিকী।

প্রতিবেদনে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে বাংলাদেশে অর্থ লেনদেনের হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দেশের মোট লেনদেনের মাত্র ৬ শতাংশ ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়। আর বিভিন্ন সেবা বিলের (গ্যাস, বিদ্যুৎ, টেলিফোন, পানির বিল) মাত্র ৮ শতাংশ এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া বিলের মাত্র ২.৬ শতাংশ ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট প্রতিষ্ঠান ম্যাক-কেনজি অ্যান্ড কম্পানির ২০১৩ সালে প্রকাশিত এক সমীক্ষার তথ্য উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, নগদ অর্থ ব্যবহারে একটি অর্থনীতিতে যে খরচ হয়, তার মাত্র ৫ শতাংশ খরচ হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। নগদ অর্থ লেনদেনে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় বাণিজ্যিক ব্যাংক ও দোকানপাটের, ৩৩ শতাংশ করে। এ ছাড়া, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় হয় ১৩ শতাংশ, সরকারের ১০ শতাংশ ও ব্যক্তি পর্যায়ে ৬ শতাংশ। ম্যাক-কেনজির হিসাবের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ‘২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে দেশে নগদ অর্থ ব্যবহারের সামগ্রিক ব্যয়ভার ৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪.৫০ শতাংশ।’

২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে নোট ও কয়েন ছাপানো, পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট জনবল ব্যয় বাবদ বাংলাদেশ ব্যাংক খরচ করেছে ৩৩৬ কোটি টাকা, আগের অর্থবছর এর পরিমাণ ছিল ৩৮৯ কোটি টাকা। ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে এ বাবদ খরচ ছিল ৪৪২ কোটি টাকা, ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে খরচ হয় ৩৭০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের ৭০টি দেশের ২০১১ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত পেমেন্ট কার্ড ব্যবহার এবং ব্যক্তির ভোগের তথ্য বিশ্লেষণ করে মুডি সম্প্রতি এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে, প্রতিটি দেশেই কার্ডের ব্যবহার তাদের মোট দেশজ আয়কে ধনাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রেখেছে। অর্থনীতির ধরন অনুযায়ী, এই প্রভাবের মাত্রা পরিবর্তনশীল, কার্ডের ব্যবহার ১ শতাংশ বাড়লে জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে উন্নয়নশীল দেশে ০.০২ শতাংশ এবং উন্নত দেশে ০.০৪ শতাংশ অবদান রাখে।

প্রতিবেদনে ইলেকট্রনিক লেনদেন বাড়াতে ভারত সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরে বলা হয়েছে, ইলেকট্রনিক লেনদেন প্রসারে ভারত নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা ব্যবহারে তারা ১১টি বিশেষ প্রণোদনা রেখেছে। এর মধ্যে ২০০০ রুপি পর্যন্ত খুচরা ক্রয়ে ইলেকট্রনিক পদ্ধতি ব্যবহার করলে সার্ভিস ট্যাক্স (১৫%) অব্যাহতি, জ্বালানি তেল ক্রয়ে ০.৭৫ শতাংশ ডিসকাউন্ট, রেলওয়ের টিকিট ক্রয়ে ০.৫০ শতাংশ, হাইওয়ে টোলে ১০ শতাংশ এবং সরকারি ইনস্যুরেন্স প্রিমিয়ামে ১০ শতাংশ ডিসকাউন্ট ছাড়াও ইলেকট্রনিক লেনদেন ব্যবহারকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর লটারির মাধ্যমে নির্বাচিতদের এক কোটি রুপি পর্যন্ত নগদ অর্থ পুরস্কার দিচ্ছে।

ভারতের মতো বাংলাদেশেও ইন্টারনেটে ইউটিলিটি বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের ডিসকাউন্ট দেওয়ার বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ছাড়া সব ধরনের সরকারি পরিশোধে ইএফটি বা এমএফএস পদ্ধতি ব্যবহার করতে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশে ২০১১ সালে আন্ত ব্যাংক লেনদেনের ক্ষেত্রে ইএফটি পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। ইএফটি লেনদেনে ব্যাংক কোনো রকম চার্জ নিতে পারে না। আয়ের সুযোগ না থাকায় অত্যন্ত সহজ ও নিরাপদ পদ্ধতি হওয়ার পরও এ পদ্ধতির লেনদেনে ব্যাংকগুলো সক্রিয় হচ্ছে না বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ব্যাংকগুলো যাতে ইএফটি সেবায় উৎসাহিত হয়, সে জন্য প্রতিটি ডেবিট ও ক্রেডিট লেনদেনপ্রতি ৫০ টাকা করে এবং একই সঙ্গে ১০০ বা তার অধিক লেনদেনের জন্য পাঁচ টাকা হারে চার্জ আদায়ের পরামর্শ বাংলাদেশ ব্যাংকের। একই সঙ্গে ব্যাংক কাউন্টারে বড় অঙ্কের নগদ লেনদেন নিরুৎসাহিত করতে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি অঙ্কের অর্থ জমা বা নগদ উত্তোলনের ক্ষেত্রে ০.০৫ শতাংশ হারে বিশেষ ধরনের আবগারি শুল্ক আরোপের পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বর্তমানে বড় অঙ্কের লেনদেন তাৎক্ষণিকভাবে নিষ্পত্তির ইলেকট্রনিক মাধ্যম হিসেবে বাংলাদেশ রিয়েল টাইম গ্রস সেটলমেন্ট (বিডি-আরটিজিএস) ব্যবস্থায় কমপক্ষে এক লাখ থেকে ২৫ হাজারে নামিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, ক্রেতারা কেনাকাটার পর ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডে বিল পরিশোধ করতে গেলে ব্যাংক বিক্রেতা বা দোকানদারের কাছ থেকে একটি কমিশন কেটে রাখে, যা মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা এমডিআর নামে পরিচিত। বর্তমানে কার্ড বা স্কিম ভেদে দেশে ২ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত এমডিআর কার্যকর রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, এ ক্ষেত্রে এমডিআর ১ শতাংশ নির্ধারণ করা যেতে পারে, যা ক্রেতার কাছ থেকে না নিয়ে ব্যাংকদ্বয় সমানভাবে বহন করবে।

প্রতিবেদনের তথ্য মতে, বর্তমানে দেশে ১০ কোটিরও বেশি নিয়মিত ব্যাংক হিসাব রয়েছে। এর সঙ্গে ১০ টাকার হিসাব রয়েছে দেড় কোটি। এর বাইরে মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবধারীর সংখ্যা পাঁচ কোটিরও বেশি। এনজিও ও মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রাহকসংখ্যা আড়াই কোটি। বাংলাদেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়লেও পেমেন্ট কার্ডের সরবরাহ ও লেনদেনের ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক পদ্ধতি ব্যবহারে আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি।


মন্তব্য