kalerkantho


সালমান-আশফাকে বিপাকে দুই মান্নান, নির্ভার সালমা

হায়দার আলী ও অমিতাভ অপু   

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



সালমান-আশফাকে বিপাকে দুই মান্নান, নির্ভার সালমা

ভিআইপি আসন হিসেবে পরিচিত ঢাকা-১ (দোহার ও নবাবগঞ্জ) আসনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিতে আছেন প্রভাবশালী মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। তাঁরা যাঁর যাঁর মতো প্রচারও চালিয়ে যাচ্ছেন। এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সালমা ইসলাম। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আব্দুল মান্নান খানকে পরাজিত করে বিজয়ী হন তিনি। এবারও জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থী সালমা ইসলাম। বিএনপি নির্বাচনে এলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েও মনোনয়ন পেতে আশাবাদী তিনি। আর এবারও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টায় আছেন মান্নান খান। তবে তাঁর শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি উন্নয়ন খাতবিষয়ক উপদেষ্ট ও বিশিষ্ট শিল্পপতি সালমান এফ রহমান। নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশ তাঁর পক্ষে কাজ করছে বলে ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ ও দোহার উপজেলা আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

এই এলাকার প্রভাবশালী রাজনীতিক, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হয়ে নতুন দল গড়েছেন। ঢাকা মহানগরে আওয়ামী লীগের ছাড় দেওয়া একটি আসনে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে আশাবাদী তিনি। সেই আশা থেকে তিনি ঢাকা-১ আসনে সালমান এফ রহমানের পক্ষে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন। একসময় চাচা সালমান এফ রহমানের সঙ্গে বিএনপির প্রার্থী হয়ে লড়ে বিজয়ী হয়েছিলেন নাজমুল হুদা। এবার সালমানের প্রতি তাঁর প্রকাশ্যে সমর্থন ঘোষণার বিষয়টি এলাকায় ব্যাপকভাবে আলোচিত।

অন্যদিকে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী আব্দুল মান্নান এবং ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও নবাবগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান খোন্দকার আবু আশফাক। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আব্দুল মান্নান খানের কাছে সামান্য ব্যবধানে হেরেছিলেন আব্দুল মান্নান। এবার তাঁর দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন আশফাক। তিনিও বিএনপির মনোনয়ন পেতে জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে এলাকার দলীয় নেতাকর্মীরা জানায়।

দলীয় সূত্র মতে, আব্দুল মান্নান খান গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী থাকার সময় তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের অনাচার-দুর্নীতির কারণে স্থানীয় আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ নেতাকর্মী ক্ষুব্ধ। তারা সালমান এফ রহমানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সালমান এফ রহমানও নৌকার টিকিটে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়ে দুই উপজেলায় সভা-সমাবেশ করাসহ প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে আরো প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি নির্মল রঞ্জন গুহ, ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুর রহমান, সংরক্ষিত আসনের এমপি পিনু খান এবং দলীয় নেতা পনিরুজ্জামান তরুণ ও নূরে আলম উজ্জ্বল।

২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে আসনটি ছিল শুধু দোহার উপজেলা নিয়ে। ২০০৮ সালে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে দুটি উপজেলার সমন্বয়ে করা হয় ঢাকা-১ আসন। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে দুটি আসনে বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা (দোহার) ও আব্দুল মান্নান (নবাবগঞ্জ) প্রায় দ্বিগুণ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে দোহারে সালমান এফ রহমান এবং নবাবগঞ্জে শিল্পপতি নুর আলী তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জিততে পারেননি। ২০০৮ সালে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হন মান্নান খান। পরে তিনি প্রতিমন্ত্রীও হন।

আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানায়, বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নবাবগঞ্জ ও দোহার এখন আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। কোন্দল না থাকলে এবারও আওয়ামী লীগ পাবে আসনটি। কিন্তু মান্নান খান ও সালমান এফ রহমানের অনুসারীরা আলাদাভাবে সভা-সমাবেশ করে যাচ্ছে। অবশ্য দিন যতই যাচ্ছে, ততই জমে উঠছে সালমান এফ রহমানের সভা-সমাবেশ। মান্নান খানের সমর্থকরা যদিও বলছে টাকা ছড়িয়ে কিছু নেতাকর্মী হাতে নিয়ে শোডাউন করছেন সালমান এফ রহমান। অন্যদিকে সালমান সমর্থকরা বলছে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর মান্নান খানের স্বজনদের দুর্নীতি আর বেপরোয়া আচরণের কারণেই দলের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ফলে জাতীয় পার্টির প্রার্থীর কাছেও হারেন তিনি।

একইভাবে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নানকে বিপাকে ফেলছেন ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার আবু আশফাক। দুই নেতার অনুসারীদের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষও হয়েছে। সাধারণ ভোটাররা বলছে, সালমান আর আশফাক আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই মান্নানকেই বিপাকে ফেলছেন। দুই দলে অন্তর্দ্বন্দ্বের সুযোগে নির্ভার আছেন জাপার সালমা ইসলাম।

গত মাসের শেষ সপ্তাহে এক বিকেলে দোহারের মেঘুলা বাজার ঘাটের চায়ের দোকানে আড্ডায় গিয়ে নির্বাচন প্রসঙ্গ তুলতেই স্থানীয় রহমান হোসেন বলেন, ‘রাখেন মিয়া ইলেকশন। নারিশায় গাঙ্গে বানের (বাঁধ) কাম শুরু করল এহন আর খবর নাই। ভোট দিয়া কী অইব।’ পাশ থেকে আরেকজন বলে উঠলেন, ‘কতা আর কামে মিল নাই নেতাগো। খালি ইলেকশনের সময় যত কতা। এইবার তো নৌকার মাঝি অইতে টানাটানি লাগছে। একদিকে মান্নান খান, আরেক দিকে সালমান, আবার মাহাবুবও হাঁটবার লাগছে। বিএনপিতেও ভেজাল আছে। সেইখানেও মান্নান আর আশফাকের মার্কা নিয়া টানাটানি। আর হেগো নেত্রী জেলে। যে বিএনপির আছিলো হেই নাজমুল হুদাই তো নাই।’

নবাবগঞ্জের যন্ত্রাইল গ্রামের মুদি দোকানি আইয়ুব আলী বলেন, ‘এই আসনডা নিয়া দ্বন্দ্ব আছে। নৌকা আর ধানের শীষের শক্তিশালী দুই প্রার্থীর কথা শুনতাছি। বিএনপি নির্বাচনে আইলে খেলা জমবে।’ এক ভ্যানচালক বলেন, ‘বিএনপি নির্বাচন করলে মান্নান খানের জিতা কষ্ট অইবো। সালমান রহমান অইলে টেক্কা দিতে পারব।’

দোহার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলী আহসান খোকন বলেন, ‘প্রার্থিতার বিষয়ে দলীয় মনোনয়ন বোর্ড ও নেত্রী যাঁকে মনোনয়ন দেবেন তাঁর পক্ষেই আমরা কাজ করব।’ নবাবগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জালাল উদ্দিন বলেন, ‘সাংগঠনিক কোনো কাজকের্ম বড় কোনো নেতাকে সেভাবে পাই না। তবে দল যাঁকে মনোনয়ন দেবে তাঁর পক্ষে কাজ করব।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী আব্দুল মান্নান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচনের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে মাঠে কাজ করতে বলেছেন। আমার আত্মবিশ্বাস দল আমাকে মনোনয়ন দেবে। আমার এলাকার প্রতিটি নেতাকর্মীর সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি উন্নয়ন খাতবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। তাঁর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত দোহার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন বলেন, ‘তিনি (সালমান এফ রহমান) এ মুহূর্তে নির্বাচনের প্রার্থিতা বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না। জরুরি কাজে বিদেশ যাবেন তিনি, ফিরে এসে কথা বলবেন।’

স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি নির্মল রঞ্জন গুহ বলেন, ‘ছাত্রজীবন থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতে করতে এ পর্যায়ে এসেছি। দলের চরম দুর্দিনেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছি, কোনো দিন বেইমানি করিনি। নৌকার টিকিট পেতে নেত্রীর দিকে চেয়ে আছি।’

ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পনিরুজ্জামান তরুণ বলেন, ‘দলের আন্দোলন-সংগ্রামে সব সময় ছিলাম, আছি। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তরুণ নেতৃত্বকে গুরুত্বকে দিচ্ছেন। সে লক্ষ্যে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে এলাকায় তৃণমূল পর্যন্ত কাজ করে যাচ্ছি।’

ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক খোন্দকার আবু আশফাক বলেন, ‘আমি শুধু মনোনয়নপ্রত্যাশী নই, বিএনপি থেকে মনোনয়ন অনেকটা কনফার্ম। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আমাকে বলেছেন মাঠে কাজ করতে। মান্নান সাহেবকে প্রার্থী হিসেবে মুভমেন্ট করতে না-ও করেছেন তিনি। কাজেই বিএনপি যদি নির্বাচনে আসে তাহলে ঢাকা-১ থেকে আমিই নির্বাচন করছি।’

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে ফোনে পাওয়া যায়নি। গত ৫ ফেব্রুয়ারি ধানমণ্ডিতে তাঁর বাড়িতে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী পারভেজ বাবুল বলেন, ‘স্যার অবশ্যই নির্বাচন করবেন। সে লক্ষ্যে মাঠে কাজও করছেন তিনি। দলের গ্রিন সিগন্যাল রয়েছে।’

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সালমা ইসলাম এমপি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি অবশ্যই নির্বাচন করব। ৯ বছর ধরে সংসদ সদস্য হিসেবে আছি। এই ৯ বছরে ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। দোহারে নদীভাঙন রোধে ২১৭ কোটি টাকার প্রকল্প এনেছি। ৬৮টি রাস্তার কার্পেটিংসহ অসংখ্য ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ ও সংস্কার করেছি।’


মন্তব্য