kalerkantho


‘পতাকা-৭১’

দেশের প্রথম পতাকা ভাস্কর্য উদ্বোধন

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি   

৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



দেশের প্রথম পতাকা ভাস্কর্য উদ্বোধন

মুন্সীগঞ্জ শহরে গতকাল ৭১টি পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে উদ্বোধন করা হয় দেশের প্রথম পতাকা ভাস্কর্য ‘পতাকা-৭১’। ছবি : কালের কণ্ঠ

পতাকা দিবসে উদ্বোধন হলো দেশের প্রথম পতাকা ভাস্কর্য ‘পতাকা-৭১’। মুন্সীগঞ্জ শহরের উপজেলা ভূমি অফিসের বিপরীতে গতকাল শুক্রবার বর্ণাঢ্য আয়োজনে অবমুক্ত হলো অনন্য এই ভাস্কর্য। আর এই আয়োজনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছেন একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধারা।

গতকাল বিকেলে ৭১টি পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে লাল-সবুজের আবরণ সরিয়ে উদ্বোধন করা হয় ‘পতাকা-৭১’। উদ্বোধনে অংশ নেন মুন্সীগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক হুইপ অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি, মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এম ইদ্রিস আলী, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর সাবেক প্রেসসচিব আবুল কালাম আজাদ, কালের কণ্ঠ সম্পাদক ও জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা, পুলিশ সুপার মো. জায়েদুল আলম পিপিএম, জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের সাবেক কমান্ডার আনিচ উজ জামান আনিচ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ আবুল বারক আলভী ও অধ্যাপক নেছার হোসেন, মুন্সীগঞ্জের পৌর মেয়র ফয়সাল বিপ্লব, জিয়াউল হক শিমুল, স্কটল্যান্ডের নাগরিক আর্টস ডেভেলপার এলেন টুইডি, পতাকা ভাস্কর্যের গবেষক ও নামকরণকারী আলমগীর টুলু, ভাস্কর ইমরান হোসেনসহ মুক্তিযোদ্ধা, স্কাউট, সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা।

উদ্বোধন শেষে পতাকা ভাস্কর্যের পাদদেশে মুক্ত মঞ্চে বক্তব্য দেন আমন্ত্রিত অতিথিরা। এর আগে একটি বর্ণাঢ্য বিশাল শোভাযাত্রা ভাস্কর্য এলাকা থেকে বের হয়ে স্থানীয় শিল্পকলা একাডেমি, প্রেস ক্লাব হয়ে আবার লিচুতলার ভাস্কর্য এলাকায় এসে শেষ হয়।

মুন্সীগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্র লিচুতলায় স্থাপিত দেশের প্রথম পতাকা ভাস্কর্য পতাকা-৭১ এর মোল্ড তৈরি হয়েছে পুরান ঢাকায়। লিচুতলার স্থানে লে-আউট করা হয়েছে। সে অনুযায়ী বেইসমেন্ট তৈরি করা হয়। তার ওপর বসিয়ে দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত প্রথম পতাকার প্রতিকৃতি, যা ছয়টি হাত দিয়ে ধরে রাখা হয়েছে।

পতাকা-৭১-এর এই উদ্বোধনে মুক্তিযোদ্ধা, নাট্যকর্মী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিসহ সর্বস্তরের মানুষ আবেগাপ্লুত। তারা বলেন, এই ভাস্কর্য দেখে আগামী প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হবে। পতাকার প্রতি সম্মান ও দেশকে ভালোবাসতে শিখবে। সরকারের আর্থিক সহায়তা ছাড়াই জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা নিজ উদ্যোগে পতাকা ভাস্কর্য পতাকা-৭১ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। তবে এটি নির্মাণে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করে এবা গ্রুপ, ব্যাংক এশিয়া, ন্যাশনাল ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, যমুনা ব্যাংকসহ বেশ কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান।

এমপি সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি বলেন, ‘পতাকা-৭১ ভাস্কর্য মনে করিয়ে দেয় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধ। যে যুদ্ধ না হলে আমরা বাংলাদেশ পেতাম না। পেতাম না আমাদের স্বাধীন পতাকা। জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানার কথা মুন্সীগঞ্জবাসী চিরদিন মনে রাখবে এই ভাস্কর্যের মাধ্যমে।’

ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ‘মুন্সীগঞ্জে পতাকা ভাস্কর্যের উদ্বোধন ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস আজ আবার নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হচ্ছে, পাকিস্তানিরা বাঙালির বুকে রাইফেলের নল ধরার পরও বলে জয়বাংলা। একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধা তথা বাঙালির এমন সাহস ছিল। আর সাহস ছিল বলেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা যুদ্ধ করে একটি পতাকা পেয়েছি। আর আজ মুন্সীগঞ্জে জেলা প্রশাসক যে কাজটি করলেন, তাতে তাঁকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারা যায় না।’

আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘পতাকা-৭১ তৈরি করে জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা শুধু মুন্সীগঞ্জে নয়, সারা বাংলাদেশে ইতিহাস হয়ে থাকলেন। এটিকে অনুকরণ করে এখন দেশের অনেক জায়গায় এই পতাকা ভাস্কর্য তৈরি হবে।’

ভাস্কর্য গবেষক আলমগীর টুলু বলেন, ‘পতাকার ধারণাটি আমরা জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানার কাছ থেকে পেয়েছি। এটি নির্মাণে ২৩ জন্য সদস্য নিয়ে একটি টিম গঠন করা হয়। তাঁরা দেশ, জাতি, ইতিহাস, স্বাধীনতার বিষয়ের সঙ্গে জড়িত। পতাকা নিয়ে গবেষণার শুরুতেই বাংলাদেশের ইতিহাস ঘাঁটতে হয়েছে। এই ভাস্কর্যের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ধরে রাখতে মুন্সীগঞ্জ ভূমিকা রাখবে।’

ভাস্কর্যশিল্পী রূপম রায় বলেন, ‘পতাকা নিয়ে সারা দেশে এটিই প্রথম ভাস্কর্য। পতাকার একটি মডেল তৈরি করে আমরা কাজ এগিয়ে নিতে থাকি। এমন কিছু আমরা সৃষ্টি করলাম, যার মধ্য দিয়ে আমরা সারা জীবন জড়িত হয়ে গেলাম। বাংলাদেশের অন্যতম একটি ভাস্কর্য হবে এটি।’

জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমরা মুন্সীগঞ্জে পতাকা ভাস্কর্য স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করি। জাতীয় পতাকার মাধ্যমে আমাদের দেশাত্মবোধ জাগ্রত হয়। এ বিষয়টিকে সামনে রেখে পরিকল্পনা শুরু করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্মারক ধারণ করবে এটি। এই পতাকার মাধ্যমে জেলাটি সারা দেশে পরিচিতি পাবে। এই ভাস্কর্যের ছয়টি হাত বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা দাবির প্রতীক।’


মন্তব্য