kalerkantho


বড় দুই দলেই কোন্দল সম্ভাব্য প্রার্থী অনেক

নাসরুল আনোয়ার, হাওরাঞ্চল   

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বড় দুই দলেই কোন্দল সম্ভাব্য প্রার্থী অনেক

হাওরের ‘সিংহদ্বার’ খ্যাত প্রাচীন জনপদ বাজিতপুর ও নিকলী উপজেলা নিয়ে কিশোরগঞ্জ-৫ সংসদীয় আসন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সংসদের বাইরে থাকা বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠে নেমে পড়েছেন। দুই দলের মনোনয়ন কে বা কারা পাচ্ছেন—এলাকাজুড়ে মূল আলোচনার বিষয়বস্তু এমনই।

এখন পর্যন্ত জাতীয় সংসদের ১৬৬ নম্বর নির্বাচনী এলাকা বাজিতপুর-নিকলীতে আলোচনায় থাকা বড় দুই দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা বেশ দীর্ঘ। আওয়ামী লীগে বর্তমান সংসদ সদস্য মো. আফজাল হোসেন ছাড়াও আছেন অন্তত আটজন নেতা। অন্যদিকে বিএনপিতেও আছেন অন্তত ১০ জন। এ ছাড়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক মুসলিম লীগের একজন সম্ভাব্য প্রার্থী আলোচনায় আছেন। এর পাশাপাশি দুই দলের ভেতরকার কোন্দলের বিষয়টিও আলোচনায় আছে।

উল্লেখ্য, বিগত ১০টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে পাঁচটিতে বিএনপি জয়লাভ করে। আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে তিনবার। মুসলিম লীগ ও সম্মিলিত বিরোধী দল একবার করে জিতেছে এ আসনে।

আওয়ামী লীগ : একাদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে এরই মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রার্থীরা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।

সংসদ সদস্য আফজাল হোসেনের ঘনিষ্ঠজনরা বলছেন, এবারও তিনিই দলের মনোনয়ন পাবেন। অন্যদিকে সাবেক অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও সাবেক বাজিতপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. আলাউল হক, সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক আহ্বায়ক শেখ নূরুন্নবী বাদলও মনোনয়ন আলোচনায় রয়েছেন। তাঁরা দুজনই জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। এ ছাড়া আছেন মুক্তিযোদ্ধা ও ব্যবসায়ী আবুল মনসুর বাদল, ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অজয় কর খোকন। গত নির্বাচনে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও তাঁর মনোনয়ন বাতিল হয়। মাঠে আছেন সাংবাদিক ও ব্যাংকার ফারুক আহাম্মদ, সাবেক ছাত্রনেতা বাজিতপুর উপজেলা যুবলীগের সভাপতি গোলাম রসুল দৌলত, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিল্টন ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতা শহীদুল্লাহ মুহাম্মদ শাহ নূর। তাঁদের মধ্যে শেষের জন বাদে বাকিরা একসঙ্গেই জনসংযোগ করছেন।

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ২০০৮ সালে মো. আফজাল হোসেনের হাত ধরেই আওয়ামী লীগের এ আসনটি পুনরুদ্ধার হয়। বিগত দশম সংসদ নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবারও নির্বাচিত হন।

তবে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই কালের কণ্ঠকে বলেছেন, গত ৯ বছরে বাজিতপুরে আওয়ামী লীগের দলীয় রাজনীতি গতি হারিয়েছে। সংগঠন হয়েছে বিভাজিত। প্রায় ২০ বছর ধরে বাজিতপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। সর্বশেষ আহ্বায়ক কমিটির প্রধানও সংসদ সদস্য আফজাল হোসেন।

মনোনয়নপ্রার্থী আলাউল হক বলেন, “বাজিতপুর ও নিকলীতে ‘দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি’ চলছে। দলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা রাজনীতিতে টিকতে পারেনি। সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে অনেকে অত্যাচার-নির্যাতন সয়েছে, মিথ্যা মামলার আসামি হয়েছে। এসবের বিরুদ্ধেই আমরা ‘জিহাদ’ ঘোষণা করেছি।” মনোনয়ন নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করে তিনি আরো বলেন, দল তাঁকে দুদফা মনোনয়ন দিলেও একবার হাতছাড়া হয়ে পড়ে। তবে তিনিই আওয়ামী লীগের ভোট বাড়াতে ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনই তার প্রমাণ। 

সাবেক ছাত্রনেতা অজয় কর খোকন বলেন, ‘দেশজুড়ে যে উন্নয়ন হয়েছে; বাজিতপুর-নিকলীতে এর ছিটেফোঁটাও হয়নি। হয়েছে মাদকের বিস্তার। আত্মীয়করণের রাজনীতি ও ব্যক্তিতন্ত্র কায়েম হয়েছে। সুস্থ রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে এবং আওয়ামী লীগের আসনটি ধরে রাখতে হলে মনোনয়ন পরিবর্তনের বিকল্প নেই। সে উদ্দেশ্যে ত্যাগী ও পরীক্ষিত কর্মীদের নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নেমেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের মধ্য থেকে যাঁকেই মনোনয়ন দেবেন; তাঁর পক্ষেই আমরা কাজ করব।’

শেখ নূরুন্নবী বাদল বলেন, ‘বাজিতপুর-নিকলীতে রাজনীতির বাণিজ্যিকীকরণ হয়েছে। দল ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যায় আধিপত্য বিস্তার করা হয়েছে। দেশ সমৃদ্ধ হলেও পিছিয়ে পড়েছে এ দুই উপজেলা। মাদক, সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত আলোকিত সমাজ গড়তে প্রয়োজন সঠিক নেতৃত্ব। সেই নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই আমরা মাঠপর্যায়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই তা বিবেচনা করবেন।’

আওয়ামী লীগের তরুণ নেতা শহীদুল্লাহ মুহাম্মদ শাহ নূর বলেন, ‘নিকলী ও বাজিতপুরে আওয়ামী লীগের প্রবীণ-নবীন সব নেতাই সুবিধা ও পদবঞ্চিত। আমি প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলোকে সংগঠিত করে মাঠের আওয়ামী লীগকে চাঙ্গা করতে চাই। এলাকার উন্নয়নে কাজ করতেই আমি এবার মনোনয়ন চাইব।’       

তবে সংসদ সদস্য আফজাল হোসেন বলেন, তিনি নিকলীতে ৬০০ কোটি ও বাজিতপুরে এক হাজার ২০০ কোটি টাকার উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। হাতে আরো কয়েক শ কোটি টাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা আছে। ৩৫ বছর পর তিনিই এ আসন পুনরুদ্ধার করেছেন। দল গোছানোর চেষ্টা করেছেন। অচিরেই কয়েকটি নদী ও খাল খননের কাজে হাত দেবেন—এ তথ্য দিয়ে তিনি জানান, এলাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় করারও পরিকল্পনা আছে তাঁর।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নের ব্যাপারে আফজাল হোসেন আরো বলেন, ‘মনোনয়ন আমার বাইরে যাবে—এ কল্পনাও করি না। মনোনয়ন আমিই পাব। কোনো কারণে নেত্রী মনোনয়ন পাল্টালে তিনি যাঁকে মনোনয়ন দেবেন, তাঁর নির্বাচন করব।’ 

তাঁর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নির্বাচনের মাঠে নামা আওয়ামী লীগ নেতাদের সম্পর্কে সংসদ সদস্য বলেন, ‘সভা-সমাবেশ করা তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে এমন কিছু করা ঠিক হবে না, যাতে বিএনপির পথ পরিষ্কার হয়ে যায়। আমি চাইলে ওরা (নেতারা) নিকলী-বাজিতপুরে পা ফেলতে পারবে না। আমি তা করব না।’ এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘ওঁরা মিথ্যাচার করছেন।’ বিএনপির সম্ভাব্য এক প্রার্থীর নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ওঁরা (ওই প্রার্থীর) টাকা খেয়ে তাঁর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন।’

বিএনপি : ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মতো বিএনপিতেও বিভক্তি রয়েছে। নেতাদের কেন্দ্র করে কর্মীরাও কিছুটা বিভাজিত। বাজিতপুর ও নিকলীতে বিএনপির একাধিক গ্রুপ সক্রিয়। আলাদাভাবে তারা জাতীয় দিবসগুলো পালন করছে। এতে সাংগঠনিক কাঠামোও দিনে দিনে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও ব্যবসায়ী শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল দলের মনোনয়ন দৌড়ে সামনের সারিতে আছেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি প্রথমে দলের মনোনয়ন পান। পরে অবশ্য তাঁকে পাল্টে সাবেক সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান মঞ্জুকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। আসনভুক্ত দুই উপজেলায় নিয়মিত যাচ্ছেন তিনি। নেতাকর্মীদের খোঁজখবর রাখছেন। সাধ্যমতো দাঁড়াচ্ছেন অসচ্ছল বা শীতার্ত মানুষের পাশেও।

বিএনপির মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে আছেন স্বচ্ছ ভাবমূর্তির সম্ভাব্য প্রার্থী জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও শিক্ষানুরাগী মো. ছালেহুজ্জামান খান রুনু। মাঠে সক্রিয় আছেন শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং বিএনপি শাসনামলে বিএনপির সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করে আলোচিত নেতা অধ্যাপক তফাজ্জল হোসেন বাদল।

দলটির মনোনয়ন আলোচনায় আরো আছেন বাজিতপুর পৌরসভার সাবেক জনপ্রিয় মেয়র ও পৌর বিএনপির সভাপতি এহেসান কুফিয়া। তিনি এ সরকারের আমলে বিভিন্ন ‘নিবর্তনমূলক’ মামলার আসামি হয়ে জেল খেটেছেন। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতা ইশতিয়াক আহমেদ নাসিরও আছে আলোচনায়। কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে এ দুজনেরই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। তাই দুজনই মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে বেশ আশাবাদী।

এ ছাড়া মনোনয়ন প্রত্যাশী অন্যদের মধ্যে মাঠে সক্রিয় আছেন সাবেক সংসদ সদস্য আমিরউদ্দিন আহমেদের ছেলে অ্যাডভোকেট বদরুল মোমেন মিঠু, ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক শফিকুল আলম রাজন, সাবেক ছাত্রদল নেতা বদরুল আলম শিপু, সাবেক সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান মঞ্জুর ছেলে ও ছাত্রদল নেতা মাহমুদুর রহমান উজ্জ্বল, ব্যবসায়ী মো. মাসুক মিয়া। সম্ভাব্য প্রার্থীদের সবাই যাঁর যাঁর মতো প্রচারণা চালাচ্ছেন। যোগাযোগ রাখছেন এলাকায় নেতাকর্মীদের সঙ্গে। করছেন সাধ্যমতো জনসংযোগ।

তবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটভুক্ত মুসলিম লীগের নেতা মো. কামরুজ্জামান খান খসরুর নামও আলোচিত হচ্ছে। একাদশ নির্বাচনে বিএনপি জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে গেলে এ আসনটি মুসলিম লীগের এই প্রার্থীকে ছেড়ে দিতে পারে। উচ্চপর্যায়ের বিশেষ কোনো ‘রফাদফা’য় এ আসনের দৃশ্যপট আমূল বদলে যাওয়ারও গুঞ্জন রয়েছে।

বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল বলেন, তিনি একনিষ্ঠ কাজের মাধ্যমেই দলের প্রাথমিক সদস্য থেকে হয়েছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি, জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও কেন্দ্রীয় বিএনপির কার্যনির্বাহী সদস্য। এর ধারাবাহিকতায় বিএনপি তাঁকেই মনোনয়ন দেবে—এ আশাবাদ প্রকাশ করে তিনি আরো বলেন, ‘আমি মনোনয়ন পেলে বিএনপির হারানো আসনটি ফিরিয়ে দিতে পারব।’  

ছালেহুজ্জামান খান বলেন, ‘মনোনয়নের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটলে ভালো হতো। দেখা যায়, যে প্রার্থী যত বেশি সন্ত্রাসী লালন ও বড় শোডাউন করতে পারেন, অবৈধ উপার্জনের অঢেল টাকা ঢালতে পারেন—তাঁরাই মনোনয়ন পেয়ে যান।’ তাঁর মতে, প্রকৃত জননেতার এসব লাগে না।

তিনি ভোগের নয়, ত্যাগের রাজনীতিতে আস্থাশীল—এ দাবি করে ছালেহুজ্জামান আরো বলেন, ‘মনোনয়ন সঠিক হলে বিএনপিতে আমার বিকল্প নেই। মনোনয়ন পেলে এবং ভোট হলে আমিই বিজয়ী হব।’

বিএনপির আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী বদরুল মোমেন মিঠু বলেন, তাঁর বাবা বিএনপি থেকে তিনবার নির্বাচিত হন। তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় থাকাকালীন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্মবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। তাঁর কোনো দুর্নাম ছিল না। বাবার উত্তরসূরি হিসেবেই তিনি এবার দলের মনোনয়ন বোর্ডে হাজির হবেন। তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হলে এলাকাবাসী বিমুখ করবে না।’


মন্তব্য