kalerkantho


একুশের আবহে জমজমাট চত্বর

নওশাদ জামিল   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



একুশের আবহে জমজমাট চত্বর

চারদিকে মানুষ আর মানুষ। পায়ে পায়ে ওড়া ধুলায় ধূসরিত চারপাশ। বসন্ত বাতাসের সঙ্গে সেই ধুলা গায়ে মেখে সার বেঁধে এগিয়ে চলেছে সবাই। গন্তব্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অমর একুশে গ্রন্থমেলা। মেলায় আগত বেশির ভাগ ক্রেতা-দর্শনার্থী ও পাঠকের পরনে ছিল কালো-সাদার মিশেলে পোশাক। স্টল ও প্যাভিলিয়নের বিক্রয়কর্মীদের পরনেও ছিল কালো টি-শার্ট। কারো মাথায় বাঁধা বাংলাদেশের পতাকা, গালে আঁকা শহীদ মিনার। একুশের চেতনাসঞ্চারিত গ্রন্থমেলায় গতকাল বুধবার সারা দিনই ছিল জনজোয়ার। ছুটির দিনে অসংখ্য মানুষের পদচারণে মেলা ছিল জমজমাট ও প্রাণবন্ত।

মহান একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার দিবাগত মধ্যরাত থেকেই শহীদ মিনারে নামে মানুষের ঢল। সকালে সেই ঢল আছড়ে পড়ে বইমেলায়। বইপ্রেমীদের জন্য সকাল ৮টার পর থেকেই উন্মুক্ত ছিল বইমেলার দুয়ার। গতকাল রাত সাড়ে ৯টায় মেলা বন্ধ হওয়ার আগমুহূর্তেও ছিল উপচে পড়া ভিড়। স্টলে স্টলে ঘুরে ঘুরে পছন্দের লেখকের বই কিনেছে পাঠকরা।

সারা দিন মেলা খোলা থাকলেও দুপুরের পর থেকেই বদলে যেতে থাকে দৃশ্যপট। বিকেলে উত্তরে টিএসসি, দক্ষিণে দোয়েল চত্বর—গোটা এলাকায় ছিল জনজোয়ার। সন্ধ্যার দিকে বইমেলা প্রাঙ্গণ পরিণত হয় জনসমুদ্রে। বিক্রিও ছিল জমজমাট।

বর্ণমালা আঁকা কালো ও সাদা রঙের শাড়ি পরে মেলায় এসেছিলেন ধানমণ্ডির বাসিন্দা হাজেরা আশরাফ। তাঁর সঙ্গে কিশোর বয়সী দুই ছেলে। তাদের পরনে কালো পাঞ্জাবি ও সাদা পায়জামা। দুই ছেলেকেই একগাদা বই কিনে দেন হাজেরা আশরাফ। কথা প্রসঙ্গে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার দুই ছেলেই ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করে। কিন্তু বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি তাদের অনুরাগের কমতি নেই। বাংলা ভাষা সম্পর্কে ওরা জানতে চায়, বুঝতে চায় নিজের সংস্কৃতি। ওদের আগ্রহ ও কৌতূহল মেটানোর জন্যই বইমেলায় আসা।’

অনন্যার স্বত্বাধিকারী মনিরুল হক বলেন, ‘সকাল ও দুপুরে বেশ ভিড় ছিল; কিন্তু বিক্রি ছিল কম। বিকেলের পর থেকেই মূলত মেলা স্বরূপে ফিরেছে। ভিড়ের সঙ্গে সঙ্গে বিক্রিও বেড়েছে।’

গতকাল একুশের দিনে প্রথম কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে তরুণ আলোকচিত্রী রাফিয়া আহমেদের। পার্ল পাবলিকেশনস থেকে প্রকাশিত বইটির শিরোনাম ‘চাতক প্রেম’।

অমর একুশে বক্তৃতা :  গ্রন্থমেলায় গতকাল বিকেল ৪টায় অনুষ্ঠিত হয় অমর একুশে বক্তৃতা। ‘একুশে ফেব্রুয়ারির লক্ষ্য কী, অর্জনের পথ কোন দিকে’ শীর্ষক বক্তৃতা দেন ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য দেন অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।

ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘একুশের পথ বেয়ে একাত্তরে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীর বুকে আত্মপ্রকাশ করলেও বাংলাকে আমরা জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। তাই উচ্চ আদালতে রায় প্রদানের ক্ষেত্রে আজও বাংলাকে প্রধান মাধ্যম ভাবা হয় না। তিন ধারার শিক্ষাব্যবস্থায় একটি শ্রেণির কাছে ভাষা হিসেবে বাংলা থাকে উপেক্ষিত। এ অবস্থার মূলে রয়েছে আমাদের রাজনৈতিক সংকট।’

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত পথপরিক্রমায় আমাদের রাজনীতি বিভাজিত ছিল নানা ধারা-উপধারায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় সেটি আরো স্পষ্ট হয়। অবশ্য মুক্তিযুদ্ধকালে বামপন্থীদের একটি অংশ স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। একুশ থেকে একাত্তর—এই উত্তাল কালপর্বে বিভাজনের ঊর্ধ্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতাই প্রধান সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে।’

গ্রন্থমেলায় গতকাল প্রকাশিত হয় ৩৯০টি গ্রন্থ। এর মধ্য থেকে চারটি বইয়ের তথ্য-পরিচিতি তুলে ধরা হলো।

রমাকান্ত ও সতেরোটি বাচ্চাকাচ্চা : শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা মজাদার উপন্যাস। লেখক কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। লেখকের একটি জনপ্রিয় চরিত্র রমাকান্ত কামার। মজাদার চরিত্রটি নিয়ে লিখেছেন একাধিক গ্রন্থ। এটি রমাকান্ত সিরিজের তৃতীয় বই। রোমাঞ্চ ও শিহরণজাগানিয়া উপন্যাসটি শিশু-কিশোরদের আনন্দের উপকরণ হতে পারে। বইটির প্রকাশক অনন্যা। প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। দাম ১৫০ টাকা।

উন্নয়নের বৈপরীত্য : আনু মুহাম্মদের বিশ্লেষণধর্মী গ্রন্থ। উন্নয়ন সবার কাম্য। কিন্তু সেই উন্নয়ন যেন বন ও পরিবেশ কিংবা মানুষের ক্ষতি করে না হয়। লেখক তাঁর গবেষণার মাধ্যমে বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন। তুলে ধরেছেন সুষম উন্নয়ন ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের কথাও। বইটি প্রকাশ করেছে মাওলা ব্রাদার্স। প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। দাম ২৫০ টাকা।

আগুনের একটি স্ফুলিঙ্গ চুপ করে বসে আছে : কবি ও প্রাবন্ধিক খালেদ হোসাইনের কাব্যগ্রন্থ। তাঁর কবিতা নিজস্ব ও স্বতন্ত্র। পড়ামাত্রই চেনা যায় তাঁর কবিতার সরলতা ও সবলতা। যাপিত জীবনের নানা উত্থান-পতন, আনন্দ-বেদনা তাঁর কবিতার নিত্যসঙ্গী। বইটি প্রকাশ করেছে আলোঘর। প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। দাম ১৫০ টাকা।

ব্রাজিল : সাইদ জামানের ভ্রমণ গ্রন্থ। পেশাগত কারণে ২০১৬ সালে অলিম্পিক উপলক্ষে সাম্বার দেশ ব্রাজিল ভ্রমণ করেন লেখক। খুব কাছ থেকে দেখেছেন ব্রাজিলের সমাজ, মানুষ ও তাদের ব্রত-আচারসহ নানা বিষয়। দেখেছেন ব্রাজিলের নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক স্থাপনাও। অত্যন্ত ঝরঝরে ও আকর্ষণীয় ভাষায় লেখক তা পাঠকের সামনে মেলে ধরেছেন গল্পের ভঙ্গিমায়। বইটির প্রকাশক বাংলা প্রকাশ।  

অন্যান্য নতুন বই : মুহাম্মদ সামাদের ‘পোড়াবে চন্দন কাঠ’ (চারুলিপি), জাহিদ হায়দারের ‘প্রেক্ষাপটের দাসদাসী’ (পাঠক সমাবেশ), হাবীবুল্লাহ সিরাজীর ‘পায়ের উর্বর পলি’ (বটেশ্বর বর্ণন), কাজল শাহনেওয়াজের ‘গল্পসমগ্র’ (আগামী প্রকাশনী), মতিন রায়হানের ‘আমাদের ছায়াতরুণগণ’ (সময়), ওমর ফারুকের ‘বাবার চোখ’ (অ্যাডর্ন পাবলিকেশনস), স্নিগ্ধা বাউলের ‘শীতের পুরান চাদর’ (চৈতন্য), গৌরাঙ্গ নন্দীর ‘ঊনসত্তরের রক্তবীজ’ (বেহুলা বাংলা), ফকির ইলিয়াসের ‘প্যারিস সিরিজ ও অন্যান্য কবিতা’ (জেব্রাক্রসিং প্রকাশন), সুহিতা সুলতানার ‘হারিকেনজাল’ (কবি প্রকাশনী), ফরিদুর রেজা সাগরের ‘মুক্তিযুদ্ধের সাতটি কিশোর গল্প’ (চন্দ্রাবতী), আমিনুর রহমান সুলতানের ‘লোকগল্পের কবিতা’ (চারুলিপি) ইত্যাদি। 

মূলমঞ্চের আয়োজন : গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে গতকাল সকাল সাড়ে ৭টায় শুরু হয় স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর। এতে শতাধিক নবীন-প্রবীণ কবি কবিতা আবৃত্তি করেন। সভাপতিত্ব করেন কবি কামাল চৌধুরী। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ফকির সিরাজের পরিচালনায় ছিল সাংস্কৃতিক সংগঠন ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর পরিবেশনা। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী ফকির আলমগীর, কল্যাণী ঘোষ, ফিরোজ আহমেদ ও আবদুল হালিম খান। যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ পাল (তবলা), বিলাস চন্দ্র বণিক (প্যাড), সুমন রেজা খান (কি-বোর্ড) ও শাহরাজ চৌধুরী।

 



মন্তব্য