kalerkantho


খালেদার রায় ঘিরে উৎকণ্ঠা

ঢাকা ছাড়ার যানবাহন নেই

রাজধানীতে দিনভর ভোগান্তি

পার্থ সারথি দাস   

৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ঢাকা ছাড়ার যানবাহন নেই

নারী-পুরুষের ভিড়ে চার বছরের শিশু তমালকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছিল ফারিয়া আহমেদের। বারবার দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলেন তিনি। অনেক সময় দাঁড়িয়ে থেকেও উত্তরা যাওয়ার কোনো বাহনই পাচ্ছিলেন না। ছেলেকে সামলাতে সামলাতে ঘেমে অস্থির ফারিয়া বাসে উঠতে চাইছিলেন। মাঝেমধ্যে দু-একটি বাস আসছিল; কিন্তু চোখের সামনে দিয়ে চলেও যাচ্ছিল দ্রুত। দেড় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে শেষ পর্যন্ত একটি অটোরিকশা পেলেন তিনি; কিন্তু ভাড়া দিতে হবে দ্বিগুণ।

গতকাল বুধবার বিকেলে রাজধানীর কাকলী মোড়ে ফারিয়ার মতো আরো অনেককে এমন ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

অসুস্থ আত্মীয়কে দেখতে মিরপুর ১০ নম্বর থেকে শাহবাগে বারডেম হাসপাতালে যাওয়ার জন্য রাস্তায় বের হয়েছিলেন অজন্তা সরকার; কিন্তু বাস না পেয়ে মন খারাপ করে বাসায় ফিরতে হয়েছে তাঁকে।

আজ বৃহস্পতিবার দুর্নীতির অভিযোগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিচারের রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মাঠে থাকার প্রস্তুতি, পরিবহন শ্রমিকদের টার্মিনালে লাঠি নিয়ে পাহারা দেওয়ার ঘোষণা, যানবাহনে পুলিশের তল্লাশি আর কড়া পাহারায় জনমনে যেমন আতঙ্ক ছড়িয়েছে। একইভাবে রাজধানীর রাস্তায় যানবাহন কম থাকায় মানুষকে সীমাহীন ভোগান্তির শিকারও হতে হয়েছে।

এমনকি গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাস কাউন্টার থেকে আজকের যাত্রার অগ্রিম টিকিট বিক্রিও বন্ধ রাখা হয়।

গ্রিনলাইন পরিবহনের ব্যবস্থাপক আবদুস সাত্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করায় কেউ আগাম টিকিট কাটছে না। তাই আজ (বৃহস্পতিবার) দিনের বেলা ঢাকা থেকে বাস ছাড়বে না।

জানা গেছে, অভিজাত বাস পরিবহন কম্পানিগুলো আজ রাস্তায় বাস চালাবে না। গতকাল রাত থেকেই দূরপাল্লার বেশির ভাগ পথে বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

আতঙ্কে রয়েছে শিক্ষার্থী-অভিভাবকরাও। স্কুলগুলো যথারীতি খোলা রাখায় অনেকেই নিজ থেকেই স্কুলে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশেষ করে যাদের বাসা স্কুল থেকে দূরে এবং বাস, অটোরিকশা বা ব্যক্তিগত গাড়িতে চলাচল করে তাদের বড় অংশই স্কুলে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

মোহাম্মদপুরের নুরজাহান রোডের বাসিন্দা শুকরিয়া আহমেদ জানান, তাঁর পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলের স্কুল কর্তৃপক্ষ মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠিয়েছে বৃহস্পতিবার স্কুল বন্ধ থাকবে।

তবে বৃহস্পতিবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা হওয়ার কথা রয়েছে। এসএসসির ইসলাম ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা, হিন্দু ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের পরীক্ষা হওয়ার কথা। এসএসসি পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা বেশ উৎকণ্ঠায় আছে। পর্যাপ্ত যানবাহন পাবে কি না বা পরীক্ষা শেষে কিভাবে বাসায় ফিরবে তা নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তা রয়েছে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহেদুল খবির চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যথারীতি ও যথাসময়ে এসএসসি পরীক্ষা চলবে। আমি শিক্ষার্থীদের বলব, তারা যেন স্বাভাবিকভাবেই পরীক্ষা দিতে যায়।’

গতকাল দুপুর থেকেই রাজধানীতে গণপরিবহনের অভাবে হেঁটে কিংবা বাহন পাল্টে চলাচল করতে হয়েছে সাধারণ যাত্রীদের। ঝামেলা এড়াতে অনেকে ছুটি নিয়ে গতকাল রাজধানী থেকে গ্রামের বাড়ি গেছে। পুলিশের কড়াকড়ির কারণে আবাসিক হোটেলে অবস্থানরতরাও চলে গেছে। এ কারণে বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও সদরঘাটে ঘরমুখো যাত্রীদের ভিড় ছিল।

বৃহস্পতিবার রাস্তায় বের হওয়া যাবে না—এমন ভাবনা থেকেও গতকালই রাজধানীতে কেনাকাটাসহ দরকারি কাজ সেরে নিয়েছে অনেকে। ফলে বিভিন্ন স্থানে গাড়ির জট ছিল।

দুপুরে মিরপুর-৬-এ মূল সড়কে মিরপুর-সদরঘাট রুটের বিহঙ্গ পরিবহনের বাসে রং করানোর কাজ দেখভাল করছিলেন বাস মালিক আবুল কালাম। তিনি বলেন, ‘আতঙ্কে আছি। রাস্তায়ও বাস রাখা যাবে না। পল্লবী থানা থেকে পুলিশ চারবার তাগিদ দিয়েছে বাস রাস্তা থেকে সরানোর জন্য।’

আওয়ামীপন্থী পরিবহন নেতারা রাস্তায় আজ গাড়ি চালাবেন বলে প্রস্তুতি নিলেও সাধারণ পরিবহন শ্রমিকরা চরম আতঙ্কে আছে। বিকল হয়ে যাওয়ার কারণ দেখিয়ে গতকাল তারা বাস ও মিনিবাস কারখানায় বসিয়ে রাখে। পুলিশ রাস্তায় রাখতে বাধা দিলে বিভিন্ন মাঠে নিয়ে বাস রাখে তারা। রবরব, মিরপুর লিংক, ইটিসি ট্রান্সপোর্টসহ শতাধিক বাস কম্পানি গতকাল থেকেই রাস্তায় বাস কমিয়েছে।

জানা গেছে, আজ ১৫ থেকে ২০ হাজার পরিবহন নেতাকর্মী লাঠিসোঁটা নিয়ে গুলিস্তানসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। প্রতিটি সড়ক পরিবহনে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ও বালু মজুদ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি টার্মিনালে সভা করেছে মালিক-শ্রমিক কমিটি।

ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েতউল্ল্যাহ গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রায় খালেদা জিয়ার বিপক্ষে গেলে পরিস্থিতি কী হবে তা নিয়ে প্যানিক তৈরি হয়েছে। মহানগর পুলিশ নিষেধাজ্ঞা জারি করায় পরিবহন শ্রমিকরা লাঠিসোঁটা হাতে না নিয়ে সতর্ক থাকবে।’

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম কালের কণ্ঠকে বলেন, বুধবার ঢাকায় বিভিন্ন জেলা থেকে গাড়ি ৩-৪ শতাংশ কম ঢুকেছে।

ময়মনসিংহ থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, শহরের মাসকান্দাসহ বিভিন্ন স্থানে পুলিশের তল্লাশি ছিল। মাসকান্দা থেকে আধাঘণ্টার ব্যবধানে একটি বাস ছাড়ে।

এদিকে ঢাকা মহানগর দোকান মালিক সমিতির সহসভাপতি ও এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক হাফেজ হারুন কালের কণ্ঠকে বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের মামলার রায় নিয়ে দেশের ব্যবসায়ীরা আতঙ্কিত। তিনি বলেন, ‘যে মুহূর্তে সারা বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়ে উঠছে, অনুন্নত দেশগুলো বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল মনে করছে, সে সময় হরতাল, ধর্মঘট বা জ্বালাও-পোড়াওয়ের মতো কোনো ধরনের নৈরাজ্যকর ঘটনা আমাদের কাম্য নয়।’



মন্তব্য