kalerkantho


নাখালপাড়ায় অভিযান

দুই কিশোর জঙ্গির লাশ নিতে চায় না পরিবার

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম ও শেরপুর প্রতিনিধি   

২৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



দুই কিশোর জঙ্গির লাশ নিতে চায় না পরিবার

রাজধানীর নাখালপাড়ায় র‌্যাবের অভিযানে নিহত তিন জঙ্গির মধ্যে চট্টগ্রামের নাসিফ উল ইসলাম (১৬) ও শেরপুরের রবিনের (১৪) লাশ গ্রহণ করতে চায় না তাদের পরিবার। এ দুই কিশোরের লাশ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোর পাশাপাশি তাদের পরিবার দুজনকে বিপথগামী করার জন্য দায়ীদের বিচার দাবি করেছে।

উল্লেখ্য, গত ১২ জানুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম নাখালপাড়ার পুরনো এমপি হোস্টেলের পেছনে রুবি ভিলা নামের একটি ছয়তলা ভবনে র‌্যাব অভিযান চালায়। র‌্যাব জানায়, অভিযানে তিনজন নিহত হয়েছে, যারা জেএমবি সদস্য।

এই তিন জঙ্গির মধ্যে সর্বশেষ কিশোর রবিনের লাশ শনাক্ত করে তার পরিবার। এর আগে কিশোর নাফিসকে শনাক্ত করেন তার বাবা। প্রথম পরিচয় নিশ্চিত করা হয় কুমিল্লার মেজবা উদ্দিনের।

চট্টগ্রাম থেকে নাসিফের বাবা নজরুল ইসলামকে ঢাকায় নেওয়া হয়েছিল ছেলের মরদেহ শনাক্ত করতে। তিনি মরদেহ শনাক্ত করার পর লাশ না নিয়ে চট্টগ্রামে ফিরে এসেছেন। অন্যদিকে রবিনের বড় ভাই গোলাম মোস্তফাও রবিবার লাশ শনাক্ত করে ফিরে গেছেন।

নিহত নাসিফ উল ইসলামের বাবা নজরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি ছেলের লাশ শনাক্ত করেছি। কিন্তু তার লাশ আমি গ্রহণ করব না বলে জানিয়েছি র‌্যাবকে।’

রবিনের বড় ভাই গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘আমি রবিবার বিকেলে ঢাকায় গিয়া আমার ছোট ভাই রবিনের লাশ শনাক্ত করেছি। র‌্যাব কর্মকর্তারা আমাকে লাশ গ্রহণের জন্য বলেছিলেন। না হলে তারাই লাশ দাফনের ব্যবস্থা করবে বলেছে। কিন্তু আমাদের তো থাকনেরও জায়গা নাই। ভাড়া বাসায় থাহি। কোডায় লাশ মাডি দুিম। তাই আমরা রবিনের লাশ নিতে চাই না।’

চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার পশ্চিম কানাইমাদারি গ্রামের বাসিন্দা নজরুল ইসলামের ছেলে নাসিফ ও শেরপুরের নকলা উপজেলার কুর্শাবাদাগৈড় গ্রামের বাসিন্দা রবিন কিভাবে বিপথে গেল, সেটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। জানা গেছে, প্রায় তিন মাস আগে রবিনের বাড়িতে গিয়েছিল নাসিফ। সে সময় তার সঙ্গে ছিল ৫০ হাজার টাকা। নাসিফ ঢাকার বাসিন্দা বলে পরিচয় দিয়েছিল।

সন্তানের বিপথে যাওয়ার বিষয়ে নাসিফের বাবা চট্টগ্রাম নগরের চট্টগ্রাম কলেজের পূর্ব গেট এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকা নজরুল ইসলাম বলছেন, ‘আমার অগোচরেই সে বিপথে গেছে।’ সন্তানকে মোবাইল ফোন দিয়েছিলেন কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি নিজে তাকে মোবাইল ফোন দিইনি। তবে বন্ধুদের কাছ থেকে মোবাইল সংগ্রহ করেছিল বলে জেনেছি।’ তিনি বলেন, ‘নাসিফ লেখাপড়ায় মনোযোগ দিচ্ছিল না।’ নিয়মিত নামাজ পড়ত কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না। নিয়মিত নামাজ পড়ত না।’

ছেলেকে যারা বিপথে নিয়ে গেছে তাদের বিচার দাবি করেন নজরুল। তিনি বলেন, গত বছরের ৭ অক্টোবর কাজেম আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র নাসিফ জেএসসি পরীক্ষার আগে বাসা থেকে চলে যায়। পরদিন চকবাজার থানায় তিনি একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে পুলিশ নাসিফকে খুঁজতে গিয়ে নগরের সদরঘাট থানা এলাকায় একটি জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পায়। সেখান থেকে ১০টি গ্রেনেডসহ গ্রেপ্তার করা হয় দুই জঙ্গিকে। তারা নিজেদের নব্য জেএমবির সদস্য বলে পরিচয় স্বীকার করে। সে সময় পুলিশ জানতে পারে, নাসিফও জেএমবিতে যোগ দিয়েছে, তার ছদ্মনাম আব্দুল্লাহ।

গতকাল শেরপুরের নকলায় রবিনের বাড়িতে গেলে তার মা মালেকা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘কেরাই নিলো, কিবাই গেলো, কিছুই তো বুঝবার পাইতাছি না। আমার কোলের বাচ্চা, মহব্বত আছে। কিন্তু লাশ দিয়া আমরা কী করমু। শিশু বাচ্চা, হেরাই যদি দাফন করে করুক। আমগরে কিছু কবার নাই, আমি আল্লার কাছে বিচার চাই।’

স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, মোবাইল ফোনে ফেসবুকের মাধ্যমে রবিন জঙ্গি তত্পরতায় জড়িয়ে পড়ে। তা ছাড়া ধর্মীয় অনুরাগ এবং পারিবারিক অসচ্ছলতার সুযোগ নিয়ে জঙ্গিরা তাকে দলে ভিড়িয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে রবিন সবার ছোট। প্রায় ১৩ বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় তার বাবা মারা যান। বড় ভাই মোস্তফার সঙ্গে আরেক ভাই রফিকুল ইসলাম ও রবিন নকলা বাজারে চালের দোকান নিয়ে ব্যবসা করত। কিন্তু ব্যবসায় লোকসান হওয়ার কারণে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ায় প্রায় এক বছর আগে নকলা শহরের কুর্শাবাদাগৈড় এলাকার নিজেদের ভিটামাটি তারা বিক্রি করে দেয়। এরপর মেজো ভাই রকিবুল ইসলাম আলাদা হয়ে পুরনো কাপড়ের ব্যবসায় জড়ান। আর মা ও ছোট ভাই রবিনকে নিয়ে গোলাম মোস্তফা ভাড়া বাড়িতে থাকতেন।

গোলাম মোস্তফা জানান, গত ৭ জানুয়ারি দোকানের ক্যাশ থেকে পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে বেরিয়ে পড়ার পর থেকে রবিন লাপাত্তা ছিল। খুঁজে না পেয়ে নকলা থানায় একটি জিডি করেন তিনি। তাঁর ধারণা, মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই সে জঙ্গিদের খপ্পরে পড়তে পারে।

নকলা পৌরসভার মেয়র মো. হাফিজুর রহমান লিটন বলেন, পরিবারটির আর্থিক অসচ্ছলতা ছিল। জঙ্গিরা হয়তো সেই সুযোগ নিয়েছে।

এ বিষয়ে শেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, মোবাইল, ইন্টারনেট, ফেসবুক ব্যবহারে সচেতন হতে হবে। জঙ্গিরা এসব মাধ্যম ব্যবহার করে তাদের কর্মকাণ্ড বিস্তৃত করছে।



মন্তব্য