kalerkantho


জালাল কাহিনি

নতুন ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা করছে ভুক্তভোগীরা

শফিক আদনান, কিশোরগঞ্জ   

২২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নতুন ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা করছে ভুক্তভোগীরা

জালাল কাহিনি এখন হোসেনপুর এলাকার মানুষের মুখে মুখে। জালাল নিখোঁজ হওয়া ও ফিরে আসার ঘটনা স্থানীয়রা কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে চাইছে না। তা ছাড়া একই সঙ্গে ঘটনা নিয়ে যে অপহরণ, খুন ও লাশ গুমের মামলা হয়েছিল, তার নেপথ্যে যারা তাদের চিহ্নিত করার দাবি উঠেছে। মামলার শিকার হয়ে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তারা ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে।

এদিকে সাংবাদিক দেখলেই জালাল উদ্দিন (৪০) অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। কোনো কথা বলছেন না। তাঁর স্ত্রী ললিতা বেগমও এখন আর মুখ খুলছেন না। শনিবার জালালকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন হোসেনপুর থানার ওসি। জানা গেছে, ওসির সঙ্গে কথাও বলেছেন জালাল ও তাঁর স্ত্রী। তাঁরা যখন থানা থেকে বের হচ্ছিলেন, তখন এ প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা হয় তাঁদের। কেমন আছেন জিজ্ঞেস করলে তার কোনো উত্তর দেননি জালাল। এমনকি ঠিকমতো চোখও খোলেননি তিনি। এ সময় ললিতা জানান, তাঁর স্বামী খুবই অসুস্থ, কথা বলার মতো অবস্থায় নেই তিনি। ওসি সাহেব ডেকেছিলেন, তাই থানায় এসেছেন। চিকিৎসা করাচ্ছেন না কেন? উত্তরে তাঁর স্ত্রী বলেন, গ্রাম্য চিকিৎসকের মাধ্যমে বাড়িতেই চিকিৎসা চলছে।

গতকাল রবিবার দুপুরে কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরের গোবিন্দপুর ইউনিয়নের উত্তর লাকুহাটি গ্রামে জালালের বাড়ির কাছে গিয়ে কথা হয় কয়েকজন প্রতিবেশীর সঙ্গে। তারা জানায়, বিষয়টি নিয়ে তারাও বিভ্রান্তিতে ভুগছে। প্রকৃত ঘটনা জানা যাচ্ছে না। তাদের বক্তব্য, জালালকে অপহরণ করা হলে তিনি এত দিন কোথায় ছিলেন, কিভাবে বাড়ি ফিরলেন? কিভাবে তাঁর জীবন চলেছে? এসব প্রশ্ন করা হলেও জালাল কেবল ‘কিছুই মনে নেই’ বলছেন।

পরে গাঙ্গাটিয়া গ্রামে গিয়ে মামলার আসামিদের সঙ্গে কথা হলে তাঁরা বলেন, জালাল ফিরে আসায় তাঁরা আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন। হয়তো এখন প্রকৃত সত্য বের হতে পারে। যদি ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত হয়, তাহলে এর পেছনে কারা ছিল তা-ও বের হয়ে আসবে। এ সময় ‘মিথ্যা’ মামলায় দীর্ঘ ৯ বছর নিদারুণ হয়রানির শিকার আসামিরা তাঁদের সেই দুঃসহ দিনগুলোর কথা মনে করে চোখের পানি ফেলেন। তাঁরা বলেন, মামলার প্রধান আসামি শঙ্কর সূত্রধর ভয়ে সহায়-সম্পত্তি ফেলে ভারতে চলে গেছেন। তাঁদের অভিযোগ, দিদারুল আলম ফারুকের নেতৃত্বে একটি চক্র শঙ্কর সূত্রধরের বাড়ি ও জমিজমা দখল করে নিয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, জালালকে দিয়ে আবারও হয়তো নতুন ষড়যন্ত্রের পাঁয়তারা করছে তারা। কাজেই এ ব্যাপারে প্রশাসনের নজর রাখা উচিত।

মামলার আসামি আজহারুল ইসলাম গাঙ্গাটিয়া বাজারে ওষুধের ব্যবসা করেন। তিনি বলেন, ‘মামলায় পড়ে আমার ব্যবসা ও পরিবার তছনছ হয়ে গেছে। ওই সময় আমার ছোট ছোট দুটি শিশুসন্তান ছিল। এদের নিয়ে আমার স্ত্রী আদালত ও থানায় অনাথের মতো ছোটাছুটি করেছেন। পরে হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নিয়ে বাড়ি ফিরলেও আমাকে আবার গ্রেপ্তার করে অন্য একটি মামলায় আসামি করে রিমান্ডে নেওয়া হয়। সেখানে পুলিশ আমার আঙুলগুলো পিটিয়ে ফাটিয়ে ফেলে।’ তিনি আরো বলেন, ‘চার মাস হাজত খেটে বের হওয়ার পর আমার আত্মীয়-স্বজন ঠিকমতো আমার সঙ্গে কথা বলত না। সবাই এড়িয়ে চলত। আমার মেয়েটা আমাকে প্রশ্ন করত, বাবা তুমি নাকি মানুষ খুন করছ? তার বান্ধবীরা এসব বলাবালি করত। এভাবে ৯টা বছর কাটিয়েছি। পুলিশ আমাকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলারও ভয় দেখিয়েছে। জালালের ঘটনা দিয়ে অনেকে অনেকভাবে তাদের আক্রোশ মিটিয়েছে। আমি এসবের বিচার চাই।’

পুরো ঘটনাকে সাজানো বলে দাবি করে মামলার আরেক আসামি রুহুল আমিন বলেন, ‘জালালকে একটি মহল লুকিয়ে রেখে আমাদের নামে মিথ্যা মামলা করেছিল। তিন বছর ফেরারি ছিলাম। আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। ৯ বছর মামলাটি চালিয়েছি। যে শঙ্কর সূত্রধর প্রায় অর্ধেক টাকায় জালালকে সৌদি আরব পাঠাতে চেয়েছিলেন, তাঁকেই একটি চক্রের ইন্ধনে ফাঁসিয়েছে জালাল।’ তিনি আরো বলেন, ‘শঙ্কর সূত্রধরকে দেশছাড়া করা আর আমাদের শায়েস্তা করতেই জালালকে দিয়ে এ অপহরণ নাটক সাজানো হয়েছিল।’

এলাকার সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হিরা মিয়া (৬০) তাঁর ঘরে চার মেয়ে রেখে বাড়ি থেকে পালিয়েছিলেন। পুরো সংসার এই কয় বছরে তছনছ হয়ে যায়। হিরা মিয়া বলেন, ‘এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলাম। দীর্ঘ তিনটি বছর পালিয়ে ছিলাম দেশের বিভিন্ন জায়গায়। পরে জামিন পেয়ে বাড়িতে আসি। আমার জীবনের যে ক্ষতি হয়েছে তার হিসাব আমি দিতে পারব না।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমার মতো আর কেউ যেন এ ধরনের মিথ্যা মামলার শিকার হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আমি সরকারের কাছে এই দাবি করি। একই সঙ্গে ক্ষতিপূরণ চাই।’ 

উত্তর লাকুহাটি গ্রামের মফিজ উদ্দিনের ছেলে মো. জালাল উদ্দিন গত ২০০৯ সালের ১০ জুলাই অপহরণের পর খুনসহ লাশ গুমের অভিযোগ আনেন তাঁর স্ত্রী ললিতা বেগম। ২০১০ সালের ৩১ মার্চ হোসেনপুর থানায় পাঁচজনকে আসামি করে একটি মামলাও দায়ের করেন। মামলার আসামিরা হলেন পাশের গাঙ্গাটিয়া গ্রামের শঙ্কর সূত্রধর, মো. আসাদ মল্লিক, রুহুল আমিন ওরফে রঙ্গু, হিরা মিয়া ও আজহারুল ইসলাম।

মামলার বিবরণে বাদী ললিতা বেগম আসামি শঙ্কর বাবু ও আসাদ মল্লিককে আদম বেপারী এবং বাকি তিনজনকে তাদের সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করেন। মামলায় বলা হয়, চাকরিসহ সৌদি আরব পাঠানোর কথা বলে আসামিরা তাঁর স্বামীর কাছ থেকে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত তারিখে জালাল উদ্দিনকে বিদেশে না পাঠিয়ে বিভিন্ন টালবাহানায় ঘুরাতে থাকে। একপর্যায়ে আসামিরা বিদেশ পাঠানোর কথা বলে তাঁর স্বামীকে ঢাকায় নিয়ে যায়। এরপর বহু চেষ্টা করেও জালালের খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরে ললিতা বেগম হোসেনপুর থানায় মামলা দায়ের করেন।

এরপর গত সোমবার ‘অপহরণ ও খুন’ হওয়ার ৯ বছর পর জালাল উদ্দিন কিশোরগঞ্জ দ্বিতীয় জেলা ও দায়রা জজ আদালতে হাজির হয়ে তাঁর আইনজীবীর মাধ্যমে বলেন, আসামিদের হাতে আটক থাকাবস্থায় নিয়মিত নেশাযুক্ত ওষুধ প্রয়োগের কারণে মানসিক ভারসাম্য ও স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন।  দীর্ঘদিন অপ্রকৃতস্থ অবস্থায় ঘুরে বেড়ানোর পর সম্প্রতি কিছুটা স্মৃতিশক্তি ফিরে পেয়ে তিনি বাড়িতে ফিরে এসেছেন। জালাল উদ্দিনের আইনজীবী সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর এ কে এম আমিনুল হক চুন্নু তাঁকে আদালতে উপস্থাপনের পর জবানবন্দি গ্রহণ করে নিজ জিম্মায় রাখা ও মামলার সাক্ষী হিসেবে গণ্য করার জন্য বিচারকের কাছে আবেদন করেন।

বুধবার দ্বিতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আব্দুর রহমান সার্বিক বিষয় বিবেচনায় জালাল উদ্দিনের জবানবন্দি নেওয়াসহ মামলাটি নিম্ন আদালতে পাঠানোর ব্যবস্থা নিতে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে হোসেনপুর থানার ওসিকে মামলাটি আবার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে গতকাল রবিবার বিকেলে হোসেনপুর থানার ওসি আবুল হোসেনের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘জালালকে আমিই ডেকে পাঠিয়েছিলাম। তাঁর স্ত্রীই তাঁকে থানায় নিয়ে এসেছিল। কিন্তু তিনি কোনো কথা বলতে পারেননি। আমি তাঁর স্ত্রীকে চিকিৎসা করানোর পরামর্শ দিয়ে বিদায় করেছি। তা ছাড়া এ ব্যাপারে আদালত থেকে কোনো নির্দেশনা এখন পর্যন্ত পাইনি। পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’

প্রসঙ্গত, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত ১৯ জানুয়ারি কালের কণ্ঠে ‘এক পরিবার দেশছাড়া বহু পরিবার সর্বস্বান্ত’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ও তার আগে  ১৭ জানুয়ারি ‘অপহরণ ও খুন হওয়ার ৯ বছর পর আদালতে’ শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন ছাপা হয়।



মন্তব্য