kalerkantho


শ্রীপুরে সড়কে গৃহবধূর ওপর বর্বরতা

দৃশ্য ফেসবুকে ভাইরাল

আঞ্চলিক প্রতিনিধি, গাজীপুর   

২১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



শ্রীপুরে সড়কে গৃহবধূর ওপর বর্বরতা

প্রকাশ্যে জনাকীর্ণ সড়কে মধ্যবয়সী এক গৃহবধূর ওপর তাঁর স্বামী নির্যাতন চালিয়েছেন। ‘মাগো-মাগো’ বলে চিৎকার করছেন ওই গৃহবধূ আর পাশে দাঁড়িয়ে তা দেখছিল অনেক মানুষ। কিন্তু গৃহবধূকে রক্ষায় কেউ এগিয়ে আসেনি। বরং কেউ কেউ ওই নির্যাতনের দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করেছে। আর তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়েছে। গতকাল শনিবার সকালে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার এমসি বাজার এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, নির্যাতনের একপর্যায়ে ওই গৃহবধূ চিৎকার করে লুটিয়ে পড়লে তাঁকে অন্তত ১৫ থেকে ২০ গজ দূরে টেনে-হিঁচড়ে নেওয়া হয়। পরে তাঁর স্বামী একটি রিকশায় ওই নারীকে উপুড় করে শুইয়ে জোরপূর্বক নিয়ে যান। ওই সময় চিৎকার করায় বারবারই তাঁর মুখে জুতা দিয়ে সজোরে আঘাত করেন তাঁর স্বামী।

ঘটনা জেনে নির্যাতিত ওই গৃহবধূর সঙ্গে যোগাযোগ করলে স্বামীর বিচার দাবি করেন তিনি। নির্যাতন করা ওই ব্যক্তির নাম মো. ইব্রাহীম (৩৮)। তিনি পাশের গোদারচালা গ্রামের ফজলুল হকের ছেলে। ওই গৃহবধূ তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী।

নির্যাতনের ঘটনায় গৃহবধূ বাদী হয়ে চার নারীসহ পাঁচজনকে আসামি করে গতকাল রাতে শ্রীপুর থানায় মামলা করেছেন। গতকাল রাত পৌনে ৯টা পর্যন্ত পুলিশ চার নারীকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁরা হলেন ইব্রাহীমের তৃতীয় স্ত্রী মৌরি আক্তার, তাঁর মা জমিলা বেগম, ছোট বোন নাসরিন সরকার ও ফারজানা আক্তার।

নির্যাতনের শিকার নারী জানান, প্রায় সাত বছর আগে তাঁর প্রথম স্বামী মারা গেছেন। তাঁর প্রথম স্বামীর তিন সন্তান রয়েছে। স্বামী মারা যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর ইব্রাহীমের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। প্রথম স্বামীর রেখে যাওয়া বাড়িসহ কোটি টাকার সম্পদের লোভে ফুসলে তাঁকে বিয়ে করেন ইব্রাহীম।

গৃহবধূ অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সময় নানা অজুহাতে তাঁর কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা নিয়েছেন ইব্রাহীম। টাকা না দিলে তাঁকে মারধর করা হতো। প্রায় বছরখানেক ধরে তাঁর প্রথম স্বামীর বাড়ি বিক্রি করে টাকা দেওয়ার জন্য চাপ দেন ইব্রাহীম। এতে রাজি না হওয়ায় নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়ে। এরই মধ্যে কয়েক মাস আগে ইব্রাহীম আরো একটি বিয়ে করেন। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে ওই স্ত্রী নিয়ে পাশের তেলিহাটী মাজম আলী মোড় এলাকায় থাকেন ইব্রাহীম।

গৃহবধূ আরো জানান, প্রায় এক মাস ধরে তাঁর কোনো খোঁজ নেননি তাঁর স্বামী। তাঁর ঘরে কোনো খাবার ছিল না। নিরুপায় হয়ে গতকাল সকালে তিনি স্বামীর কাছে যান। সেখানে গিয়ে চাল কেনার টাকা চাইলে ক্ষিপ্ত হন ইব্রাহীম। একপর্যায়ে তাঁকে বেদম মারধর করেন। নিজেকে রক্ষার জন্য তিনি ছুটে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর স্বামী পিছু ধাওয়া করে ধরে তাঁকে আরো নির্যাতন চালান।

প্রত্যক্ষদর্শী মুদি দোকানদার শফিকুল ইসলাম জানান, তেলিহাটী-এমসি বাজার সড়ক ধরে ওই গৃহবধূ ছুটছিল। পিছু ধাওয়া করে তাঁকে ধরে ফেলেন তাঁর স্বামী। পরে উপর্যুপরি কিল-ঘুষি ও লাথি মারেন। লুটিয়ে পড়লে গৃহবধূকে ১৫ থেকে ২০ গজ দূরে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে তাঁর স্বামী জোর করে রিকশায় তুলে নিয়ে যান। রিকশায় তুলে নেওয়ার সময়ও গৃহবধূর ওপর নির্যাতন চলছিল।

প্রত্যক্ষদর্শী তরুণ ব্যবসায়ী আল আমিন জানান, জনাকীর্ণ সড়কে গৃহবধূর ওপর প্রকাশ্য নির্যাতন চললেও তাঁকে রক্ষার জন্য এগিয়ে যায়নি কেউ। বরং অনেকেই মুঠোফোনে তা ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়েছে।

নির্যাতিত গৃহবধূর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁর স্বামীর বিচার দাবি করে বলেন, ‘সে (ইব্রাহীম) একটা অমানুষ। আমি তার বিচার চাই।’

তবে স্ত্রীর মানসিক সমস্যা রয়েছে দাবি করে মো. ইব্রাহীম বলেন, ‘সে (গৃহবধূ) আত্মহত্যার জন্য ছুটে যাচ্ছিল। তাই তাকে জোর করে তুলে এনেছি। ওই সময় কিছু মারধর করেছি।’

শ্রীপুর থানার ওসি আসাদুজ্জামান বলেন, ‘নির্যাতনের ঘটনা জেনে পুলিশ ওই গৃহবধূকে উদ্ধার করে।’

শ্রীপুর থানার উপপরিদর্শক সৈয়দ আজিজুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঘটনার পর থেকে মো. ইব্রাহীম পলাতক। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।’



মন্তব্য