kalerkantho


রাজধানী থেকে আগস্টে নিখোঁজদের মধ্যে খোঁজ নেই শুধু ইশরাকের

ওমর ফারুক   

২১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



রাজধানী থেকে আগস্টে নিখোঁজদের মধ্যে খোঁজ নেই শুধু ইশরাকের

‘অপরিচিত কোনো নম্বর থেকে ফোন এলে ভাবি, এই ফোনেই হয়তো শুনব সন্তানের কণ্ঠ। রাত হলে ঘুম হয় না। ভাবি, এই বুঝি ছেলে বাসায় ফিরে কলিং বেল চাপবে।’ এ কথাগুলো বলছিলেন গত বছরের আগস্টে নিখোঁজ হওয়া কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইশরাক আহমেদ ফাহিমের বাবা জামাল উদ্দিন। তিনি জানান, গত আগস্টে রাজধানী থেকে যাঁরা নিখোঁজ হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে তাঁর ছেলে ছাড়া আর সবারই খোঁজ মিলেছে। তাঁরা অপেক্ষায় আছেন সন্তানের।

গত বছরের ২৬ আগস্ট রাজধানীর ধানমণ্ডি এলাকা থেকে নিখোঁজ হন ইশরাক। গতকাল পর্যন্ত তাঁর সন্ধান পায়নি পরিবার। ছেলের চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তাঁর মা নাসরিন আক্তার। ইশরাকের বাবা বলেন, ‘সন্তানের চিন্তায় তার মা এখন শয্যাশায়ী। খেতে গেলে মনে পড়ে সন্তানের কথা। ও কেমন আছে, কোথায় আছে, কী খাচ্ছে কে জানে। চোখের পানি ফেলা ছাড়া আমাদের আর কী-ই বা করার আছে।’ ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তাঁকে ফিরে পেতে প্রায় দিনই পুলিশ ও র‌্যাবের কাছে যাচ্ছেন জামাল উদ্দিন, কিন্তু কোনো সুখবর পাচ্ছেন না।

এদিকে এখনো ছেলের সন্ধান না পাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর একটি আবেদন জানিয়েছেন ইশরাকের মা নাসরিন আক্তার। গত ১৮ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেওয়া ওই আবেদনে নাসরিন আক্তার উল্লেখ করেন, ‘আমি আপনাকে অনেক মায়ের কান্না, দুঃখ-কষ্ট শুনতে দেখেছি, তাদের সাথে কাঁদতে দেখেছি।...হয়তো আপনি আমার কান্না দেখেননি, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি আপনি সেটা অনুভব করবেন।’

ওই আবেদনে আরো বলা হয়, ‘একে একে অনিরুদ্ধ রায়, উত্পল দাস এবং মোবাশ্বার হাসান ফিরে আসছেন, আমরাও এখন স্বপ্ন দেখি যে, আমার ছেলে ফাহিমও ফিরে আসবে। আশা করি আমাদের এই বেদনার মাঝে একটি আশার আলো জ্বালাবেন।’    

গত আগস্টে রাজধানী থেকে নিখোঁজ পাঁচজনের মধ্যে বিএনপি নেতা ও এবিএন গ্রুপের এমডি সৈয়দ সাদাত আহমেদ ২২ আগস্ট বিকেলে বিমানবন্দর সড়কের বনানী ফ্লাইওভারের নিচ থেকে অপহরণের শিকার হন। তাঁকে ৩০ ডিসেম্বর গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। ২৩ আগস্ট রাজধানীর ফকিরাপুল এলাকা থেকে প্রকাশ্যে তুলে নেওয়া হয়েছিল আইএফআইসি ব্যাংকের কর্মকর্তা শামীম আহমেদকে। সাত দিন পর তিনি বাসায় ফেরেন। ২৭ আগস্ট বিকেলে গুলশান এলাকা থেকে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছিল ব্যবসায়ী অনিরুদ্ধ কুমার রায়কে। তিনি ১৭ নভেম্বর বাড়ি ফিরেছেন। ২৭ আগস্টেই রাজধানীর নয়াপল্টন থেকে সাভারের আমিনবাজারে যাওয়া পথে নিখোঁজ হন ২০ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমান। গত ২৩ ডিসেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। ২০১৫ সালে গুলশান থানার একটি নাশকতার মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

এই চারজনের খোঁজ মেলার পর জামাল উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগস্ট মাসে যাঁরা নিখোঁজ হয়েছিলেন তাঁদের সবারই খোঁজ মিলেছে, কিন্তু আমাদের ইশরাকের খোঁজ পাচ্ছি না। তার কী অবস্থা, আমরা জানতে পারছি না। প্রায় প্রতিদিনই র‌্যাব পুলিশের কাছে দৌড়াচ্ছি। কিন্তু কোথাও থেকে কোনো খবর পাচ্ছি না।’

মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য অনুযায়ী ২০১৭ সালে ৮৬ জনকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ৯ জনের লাশ পাওয়া গেছে এবং ৪৫ জনকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। ছেড়ে দেওয়া হয়েছে ১৬ জনকে। এখনো বাকি ১৬ জনের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। গত শুক্রবার অধিকার থেকে সংবাদপত্রে পাঠানো বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী গত বছর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ, গুম ও গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছেন ৬০ জন। তাঁদের মধ্যে পরবর্তী সময়ে দুজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে আটজনকে। পরিবারের কাছে ফেরত এসেছেন সাতজন। বাকিরা এখনো নিখোঁজ। এ ছাড়া রহস্যজনক নিখোঁজ হয়েছেন ৩১ জন, যাঁদের মধ্যে পরে ফেরত এসেছেন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন ২১ জন। বাকি ১০ জনের হদিস নেই।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক শিফা হাফিজা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গুম, নিখোঁজ ও অপহরণ—এটা অন্যায়, অবিচার। সবচেয়ে বড় মানবাধিকার। কেউ যদি গুম হয়, সেটি বের করার দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।’ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কেউ যদি অপরাধী হয় তাকে ধরার পর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তার পরিবারকে বিষয়টি জানাতে হবে। গোপন রাখার কোনো সুযোগ নেই।’

এখনো নিখোঁজ যারা : আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী ইশরাকসহ এখনো সারা দেশে নিখোঁজ রয়েছেন ১০ জন। গত বছরের ২৮ আগস্ট হবিগঞ্জের ছাত্রদলের সভাপতি হোসাইন মো. রফিক মাধবপুরের তেলিয়া বাজার থেকে দক্ষিণ সুরমা গ্রামে যাচ্ছিলেন মোটরসাইকেলে করে। পরের দিন তাঁর মোটরসাইকেলটি গ্রামের রাস্তার পাশ থেকে উদ্ধার করা হয়। রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে তাবলিগের কথা বলে গত ৭ অক্টোবর বাসা থেকে বের হন আরাফাত রহমান। এর পর থেকে তিনি নিখোঁজ রয়েছেন। গত ১২ অক্টোবর ঝিনাইদহের চাঁদপুরের ইরিনদিয়া কোট এলাকা থেকে মাকছুদুর রহমান ওরফে মাসুদকে অজ্ঞাতপরিচয় কিছু লোক তুলে নেয়। বেলজিয়াম থেকে দেশে ফেরা মেয়েকে আনতে গিয়ে গত ৪ ডিসেম্বর নিখোঁজ হন সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান। নাটোরের রাকিবুল হাসান নামের এক ব্যক্তি গত ১০ ডিসেম্বর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। সাভারের ইমান্দিপুর থেকে গত ১৫ ডিসেম্বর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন শাকিল মিয়া নামের এক গার্মেন্টকর্মী। গত ৯ ডিসেম্বর সাভার থেকে নিখোঁজ হয়েছেন মিজানুর রহমান নামের এক ছাত্র। সর্বশেষ গত ১৭ ডিসেম্বর রাজধানীর ধানমণ্ডি থেকে নিখোঁজ হয়েছেন লন্ড্রি ব্যবসায়ী সিরাজুল হক মিন্টু। 



মন্তব্য