kalerkantho


‘রাখাইনে গিয়ে রোহিঙ্গা হিসেবেই মরতে চাই’

সুবিধাভোগীরা চুক্তির খবরে নাখোশ!

তোফায়েল আহমদ, রোহিঙ্গা শিবির ঘুরে এসে   

১৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



‘রাখাইনে গিয়ে রোহিঙ্গা হিসেবেই মরতে চাই’

রোহিঙ্গারা ক্যাম্প ছেড়ে যত্রতত্র ঘুরছে, এমন অভিযোগ উঠছে নিয়মিত। গতকাল উখিয়া বাসস্ট্যান্ডের দক্ষিণ পাশে টেকনিক্যাল কলেজ গেট এলাকায় কয়েকজন রোহিঙ্গাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে মিয়ানমারের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার খবরে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা খুশি। বিশেষ করে ২৫ আগস্টের পর আসা রোহিঙ্গারা স্বদেশে ফিরে যেতে ইচ্ছুক বেশি। তবে তারা উদ্বেগ ব্যক্ত করে বলেছে, রোহিঙ্গাদের মধ্যে যারা সাহায্য সংস্থাগুলোতে কর্মরত তারা খবরটিতে খুশি নয়।

গতকাল বুধবার কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত এলাকা ও আশ্রয়শিবির সরেজমিনে ঘুরে দেখেন এই প্রতিবেদক। রাখাইনের মংডুর কাইন্দাপাড়া থেকে আসা বৃদ্ধ রোহিঙ্গা ওমর হামজার (৭০) সঙ্গে গতকাল দুপুরে কুতুপালং শিবিরের একটি দোকানে বসে কথা হয়। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিজের দেশে ফিরে যাবার ইচ্ছার কথা বলতে হবে কেন? কেউ কি না বলে? আমি যদি সেখানে নিরাপদে খেতে পারি, ঘুমাতে পারি তাহলে ফিরে যাবে না—এমন বেটা কি কেউ আছে?’ গত বছর ২৫ আগস্ট সহিংসতা শুরুর পর এ দেশে আসেন তিনি। ফিরে যাওয়ার জন্য এই বৃদ্ধ রোহিঙ্গার একটিই শর্ত—‘আমার নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিতে হবে। আমি রোহিঙ্গা হয়েই মরতে চাই রাখাইনে।’

কুতুপালং শিবিরের বাসিন্দা রশিদ আহমদ (৩৫) রাখাইনের মংডুর আংডাং থেকে এসেছেন ১০ বছর আগে। তিনিও ফিরে যাবেন, যদি তাঁর বাড়িঘরের ভিটাটুকু ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তা পেয়ে থাকেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই ফিরে যাব। তবে এ দেশে এসে আমরা যে স্বাধীনতা ভোগ করতে পারছি—সে রকম স্বাধীনতা সেখানেও আমাদের পেতে হবে। শুধু আন্তর্জাতিক

গোষ্ঠীগুলোর চাপের মুখে পড়ে আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে আবার নির্যাতন শুরু করা হলে আমরা সেখানে যাব কেন?’

বালুখালী শিবিরের লালু মাঝি বলেন, মিয়ানমার-বাংলাদেশের মধ্যে স্বদেশে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে চুক্তির বিষয় নিয়ে তাঁরা সবই অবহিত রয়েছেন। তাঁদের লোকজন ফিরেও যেতে চায়; কিন্তু রোহিঙ্গারা মুখ ফুটে কেউ বলতে সাহস করছে না নানা কারণে। কী কারণ জানতে চাইলে লালু মাঝি বলেন, রোহিঙ্গাদের অনেক নেতৃস্থানীয় লোকজন নানা আন্তর্জাতিক সংস্থা ও এনজিওর সঙ্গে সরাসরি জড়িত। আবার অনেক রোহিঙ্গা রয়েছে যারা রাখাইনে নানা অপকর্ম করে পালিয়ে এসেছে এপারে। এসব রোহিঙ্গা স্বদেশে ফিরে গেলে অনেকেই অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়বে। আবার অপকর্ম করে আসা রোহিঙ্গাদের সে দেশে আইনের মুখে পড়ার ভয়ে প্রত্যাবাসন বানচাল করে দীর্ঘদিন এখানে থাকার পথ প্রশস্ত করতে চাইছে।

গতকাল বুধবার সকাল থেকে উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী ১ ও ২, ময়নার ঘোনা ও শফিউল্লাহকাটা আশ্রয়শিবির পরিদর্শন করে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনবিরোধী তত্পরতা ব্যাপকভাবে লক্ষ করা গেছে। জাতিসংঘের আওতাভুক্ত দুটি সংস্থা, রোহিঙ্গাদের চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত দুটি বিদেশি এনজিও, রোহিঙ্গাদের খাদ্যের জোগানদাতা একটি বিশ্বসংস্থাসহ বেশ কিছু এনজিওতে যেসব রোহিঙ্গা কাজ করে তারা প্রত্যাবাসনবিরোধী তত্পরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। এসব সংস্থায় কর্মরত রয়েছে কয়েক শ রোহিঙ্গা। আশ্রয়শিবিরে কর্মরত স্থানীয় এনজিওর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মী কালের কণ্ঠকে বলেন, যেসব এনজিও দাতাসংস্থা থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ পেয়েছে তারাই এত অল্প সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বিরোধিতা করছে। আবার যেসব এনজিও কোনো অর্থ সাহায্য পাচ্ছে না তারা চায়—এক্ষুনি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হয়ে যাক। আবার তেমনি বড় বড় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো চায় রোহিঙ্গাদের এ দেশে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান। কেননা এসব সংস্থাগুলোর পাইপলাইনে রয়েছে বিপুল অঙ্কের অর্থ। প্রধানত অর্থনৈতিক কারণেই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের অবস্থানকে দীর্ঘমেয়াদি করতে চায়। অন্যদিকে জঙ্গি সম্পৃক্ত কিছু এনজিও প্রত্যাবাসনবিরোধী কর্মকাণ্ডেও জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন জোরদারে আন্দোলনরত ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটি’ও চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। সংগঠনটি ১৯৯৩ সাল থেকে আন্দোলন করে যাচ্ছে। প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সভাপতি এবং উখিয়া বঙ্গমাতা মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের চুক্তিতে এলাকাবাসী আনন্দিত। কেননা এত বেশি রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশে আমরা স্থানীয়রা সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছি। সেই সঙ্গে আমাদের জীবনযাত্রায় মারাত্মক প্রভাব পড়েছে।’ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নির্বিঘ্ন করার জন্য সরকারকে অবিলম্বে আশ্রয়শিবিরের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিতে হবে। প্রত্যাবাসনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করতে হবে। এমনকি জনপ্রতিনিধি ব্যতীত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা কষ্টসাধ্য হবে বলে আমি মনে করি।’ তিনি মনে করেন, আশ্রয়শিবিরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তত্পরতার পাশাপাশি এনজিওগুলোর কর্মকাণ্ড নজরদারি করাও জরুরি। তিনি বলেন, প্রত্যাবাসন কোনো রকমে একবার শুরু করা হলে তা রোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

এদিকে আশ্রয়শিবিরে অবস্থান নেওয়া রাখাইনের হিন্দুরাও যেকোনোভাবে স্বদেশে ফিরে যেতে চায়। মিলন কুমার মল্লিক নামের একজন জানান, ‘আমরা ফিরে যেতে চাই আমাদের বাড়িঘরে। তবে আমাদের চাওয়া শুধু ফেলে আসা বাড়ি-ভিটা।’

চলতি সপ্তাহে প্রতি সপ্তাহে দেড় হাজার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার সম্মত হয়। তবে এভাবে আগামী দুই বছরের মধ্যে সব রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসনের কাজ কিভাবে সম্ভব এই প্রশ্নটিও অনেকে তুলছেন।

এদিকে পাসপোর্ট অ্যান্ড ইমিগ্রেশন অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু নোমান মোহাম্মদ জাকের হোসেন জানান, গতকাল বুধবার পর্যন্ত ১০ লাখ ১০ হাজার ২৩২ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশুর বায়োমেট্রিক নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। ছয়টি সেন্টারের মাধ্যমে এ কাজ করছে বাংলাদেশ পাসপোর্ট অ্যান্ড ইমিগ্রেশন অধিদপ্তর।


মন্তব্য