kalerkantho


দৃষ্টান্ত

স্বাভাবিক প্রসবে নজির

নূপুর দেব, ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) থেকে   

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



স্বাভাবিক প্রসবে নজির

ফটিকছড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাভাবিক প্রসবের পর নবজাতক কোলে এক স্বজন। ছবি : কালের কণ্ঠ

বর্তমানে দেশে প্রায় ৩১ শতাংশ শিশুর জন্ম হয় অস্ত্রোপচারের (সিজারিয়ান) মাধ্যমে। এই হিসাবে প্রতি ১০টি শিশুর মধ্যে তিনটির জন্ম হয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত হারের চেয়ে অনেক বেশি। গত বছর প্রকাশিত সংস্থাটির এক জরিপে এই চিত্র উঠে আসে।  

সংস্থাটি আরো বলছে, ১০ থেকে ১৫ শতাংশ প্রসবের সময় প্রসূতির জটিলতা দেখা দিতে পারে। জীবন রক্ষার জন্য তখন অস্ত্রোপচার করা প্রয়োজন। কিন্তু  বাংলাদেশে অর্ধেকের চেয়ে বেশি অস্ত্রোপচার হয় বিনা প্রয়োজনে।

অন্যদিকে সরকার দেশে স্বাভাবিক প্রসব নিশ্চিত করতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। জনপ্রতিনিধিদের এ বিষয়ে সম্পৃক্ত করে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে জনগণকে। সরকারি হাসপাতালগুলোয় স্বাভাবিক প্রসবের ব্যবস্থা থাকার পরও সেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অনেক শিশুর জন্ম হচ্ছে। আর বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় তো অহরহ শিশুর জন্ম হচ্ছে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে।

উপজেলা পর্যায়ে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা জরুরি প্রসূতি সেবা (ইওসি) দিতে কার্যক্রম গ্রহণ করে সরকার। এই কার্যক্রমের আওতায় দেশের বিভিন্ন উপজেলায় সরকারি হাসপাতালে প্রসূতি মায়ের স্বাভাবিক ও অস্ত্রোপচারে শিশুর জন্মের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

এসব সরকারি হাসপাতালে লোকবল, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের অপ্রতুলতার পরও কিভাবে স্বাভাবিক প্রসব বাড়ানো যায় তার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ রকম একটি হাসপাতালের চমৎকার উদাহরণ চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ৫০ শয্যার সরকারি এই হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পরিবর্তে স্বাভাবিক প্রসবে অনন্য এক নজির স্থাপন করা হয়েছে। দেশের স্বাস্থ্য বিভাগে হাসপাতালটি বর্তমানে মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি স্বাভাবিক প্রসব হওয়ার নজির স্থাপন করায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ২০১৬ সালে প্রথম স্থান অর্জন করে। কয়েক বছর ধরে হাসপাতালটিতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশুর জন্ম উল্লেখযোগ্য হারে কমতে শুরু করেছে। 

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৬ সালে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জরুরি প্রসূতি সেবা নিতে ভর্তি হন তিন হাজার ৫৯ জন প্রসূতি। এর মধ্যে দুই হাজার ৯০৮ জন প্রসূতি স্বাভাবিকভাবে শিশুর জন্ম দেন। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্মগ্রহণ করে ৫১টি শিশু। একই বছর বহিবির্ভাগে প্রসবের আগে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছেন পাঁচ হাজার চারজন এবং প্রসব পরবর্তী চিকিৎসা নিয়েছেন তিন হাজার ১৪ জন প্রসূতি। গত বছর এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাভাবিক প্রসবের হার আরো বেড়ে কমেছে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশুর জন্ম। চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য বিভাগ সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, ২০১৭ সালেও স্বাভাবিক প্রসবের ক্ষেত্রে ফটিকছড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রথম হতে পারে।

লোকসংখ্যার দিক থেকে দেশের অন্যতম বৃহৎ ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বেশ কয়েক বছর ধরে প্রসূতির স্বাভাবিক প্রসবের জন্য খ্যাতি অর্জন করেছে। বিভাগীয় পর্যায়ে টানা তিনবার সেরা হওয়ার গৌরব রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

সম্প্রতি সরেজমিনে ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে জানা গেছে, প্রসবের জন্য প্রসূতিদের সেখানে নিয়ে আসার পর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও চিকিৎসকরা স্বাভাবিক প্রসব করাচ্ছেন। চিকিৎসকরাও জানান, তাঁরা স্বাভাবিক প্রসব করানোর চেষ্টা করেন। প্রসূতিদের স্বজনদেরও এ বিষয়ে সচেতন করা হয়েছে। ফলে এখন স্বজনরাও চায় স্বাভাবিক প্রসব হোক। খুব জটিল কিছু হলে সেই স্বজনরাই বলে অস্ত্রোপচার করার কথা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই হাসপাতালের ইওসিতে কর্মরত একাধিক জ্যেষ্ঠ সেবিকা জানান, বছর ছয়েক আগেও ওই হাসপাতালে কোনো কোনো মাসে ৪০টির বেশি শিশুর জন্ম হতো অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। কমতে কমতে ওই সংখ্যা বর্তমানে মাস ছাড়িয়ে বছরে ঠেকেছে। ২০১৫ সালে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মাত্র পাঁচটি শিশুর জন্ম হয়েছে।

চলতি মাসের প্রথম ১৪ দিনে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে ১২৩ জন প্রসূতি ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ১০৮টি স্বাভাবিক এবং দুটি শিশু অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্মগ্রহণ করেছে।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে পশ্চিম ভুজপুর। নূর আক্তার নামে এক প্রসূতির প্রসব বেদনা উঠলে গত ১৪ জানুয়ারি তাঁকে ফটিকছড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করানো হয়। তাঁর স্বামী আয়ুব আলী ওমানপ্রবাসী। হাসপাতালে ভর্তির পর তিনি স্বাভাবিক প্রসবে মেয়েসন্তান জন্ম দেন। এতে খুশি তাঁর পরিবার।

নূর আক্তারের ননদ ইয়াসমিন আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার ভাবির প্রথম সন্তানও এখানে হয়েছে। দুই সন্তানই স্বাভাবিক জন্মগ্রহণ করেছে। এতে আমরা খুশি। এখানে স্বাভাবিক জন্মগ্রহণ করানো হয় বলে সবাই আসে। বাইরে থেকে মাত্র হাজারখানেক টাকার ওষুধপথ্য কিনতে হয়।’

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশে যত উপজেলা রয়েছে তার মধ্যে ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সর্বাধিক স্বাভাবিক প্রসব হচ্ছে। এ কারণে ২০১৬ সালে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি জাতীয় পর্যায়ে প্রথম হয়েছে।’

তিনি আরো জানান, হাসপাতালটিতে স্বাভাবিক প্রসব বেশি হওয়ায় দিন দিন উৎসাহিত হচ্ছে মানুষ। চিকিৎসকরা রোগীর প্রতি আন্তরিক হলে রোগীরাও চিকিৎসকদের প্রতি আন্তরিক হয়। এতে রোগী ও চিকিৎসকের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বাড়ে। ফটিকছড়িতে চিকিৎসকদের প্রতি রোগী ও তাদের স্বজনদের আস্থা বেড়েছে। আর এখানে দায়িত্বরত চিকিৎসকরাও স্বাভাবিক প্রসব নিশ্চিত করতে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর সুফল ফটিকছড়ির মানুষ পাচ্ছে।

ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাখাওয়াত উল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্বাভাবিক প্রসবে আমাদের ওপর জনগণের আস্থা সৃষ্টি হয়েছে। চিকিৎসক ও সেবিকারা আপ্রাণ চেষ্টা করেন স্বাভাবিক প্রসব নিশ্চিত করতে। যেগুলো বেশি জটিল তার জন্য অস্ত্রোপচার করতে হয়। স্বাভাবিক প্রসবে ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বর্তমানে দেশে মডেল। এই পর্যন্ত প্রসবকালীন কোনো প্রসূতি মায়ের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি এই হাসপাতালে।

ইওসিতে কর্মরত জুনিয়র কনসালট্যান্ট (গাইনি) ডা. সৈয়দা ইয়াসমিন আক্তার বলেন, ‘আমাদের নানা সমস্যা আছে। কিন্তু আমরা চেষ্টা করি ভালোভাবে কাজ করার। প্রসূতি মায়েরা যাতে ভালো চিকিৎসাসেবা পান তা আমরা নিশ্চিত করার চেষ্টা করি। স্বাভাবিক প্রসবের জন্য আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করি।’

সেবিকা জোহরা বেগম, মায়া মজুমদার, কৃষ্ণা প্রভা দেবী, শাহনাজ পারভীন ও সুমিনা মমতাজ জানান, স্বাভাবিক প্রসবের জন্য তাঁরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন।

এই হাসপাতালে আগে গাইনি বিভাগে দুজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট থাকলেও সমপ্রতি আরেকজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ইওসিতে তিনজন কনসালট্যান্ট থাকলেও মেডিক্যাল অফিসার নেই। অ্যানেসথেসিয়ার জন্য একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট নিয়োগ দেওয়া হলেও তাঁকে পাশের একটি উপজেলায় সপ্তাহে দুদিন অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই কারণে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে সবার আন্তরিকতায় এসব সমস্যা অতিক্রম করেই এগিয়ে যাচ্ছে ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।


মন্তব্য