kalerkantho


‘অপহরণ ও খুন’ হওয়ার ৯ বছর পর আদালতে!

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি   

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



‘অপহরণ ও খুন’ হওয়ার ৯ বছর পর আদালতে!

জালাল উদ্দিন নামের এক ব্যক্তিকে অপহরণ করে খুন করা হয়েছে—এমন অভিযোগে ২০১০ সালে একটি মামলা হয়েছিল কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর থানায়। এ অভিযোগে আসামিরা জেলহাজত খাটাসহ হয়রানির শিকার হন। সেই ‘খুন’ হওয়া ব্যক্তি সোমবার কিশোরগঞ্জের দ্বিতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে হাজির হন। এ ঘটনায় আদালত প্রাঙ্গণে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

এ সময় তিনি আইনজীবীর মাধ্যমে বিচারক বরাবর এক লিখিত আবেদনে আসামিদের হাতে আটক থাকাবস্থায় নিয়মিত নেশাযুক্ত ওষুধ প্রয়োগের কারণে মানসিক ভারসাম্য ও স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলার কথা জানান। দীর্ঘদিন অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় ঘুরে বেড়ানোর পর সম্প্রতি কিছুটা স্মৃতিশক্তি ফিরে পেলে নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন বলে আদালতে করা আবেদনে দাবি করেন।

রাষ্ট্রপক্ষে নিযুক্ত আইনজীবী সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর এ কে এম আমিনুল হক চুন্নু আদালতে হাজির করেন জালাল উদ্দিনকে। আদালতে জালালের জবানবন্দি গ্রহণ করে নিজ জিম্মায় রাখা ও মামলার সাক্ষী হিসেবে গণ্য করার জন্য বিচারকের কাছে আবেদন করা হয়। তবে আদালতের বিচারক মো. আব্দুর রহমান এ ব্যাপারে কোনো আদেশ দেননি।

এদিকে ওই ব্যক্তিকে অপহরণ ও খুনের অভিযোগে কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর থানায় পাঁচজনকে আসামি করে তাঁর স্ত্রী একটি মামলা করেছিলেন। ওই মামলায় দীর্ঘ ৯ বছর ধরে পলাতক আছেন দুজন। বাকি আসামিরা পলাতক থাকার পর আদালতে আত্মসমর্পণ করে কিংবা পুলিশ কর্তৃক আটক হয়ে কারা ভোগ

করে জামিনে বেরিয়ে এসে আইনি প্রক্রিয়া মোকাবেলা করছেন। অ্যাডভোকেট এ কে এম আমিনুল হক চুন্নু বলেন, জালাল উদ্দিন আসামিদের অত্যাচারে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি এখনো পুরোপুরি সুস্থ হননি এবং বর্তমানে কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন।

অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের জন্য জালাল উদ্দিনকে আদালতের হেফাজতে নিয়ে জবানবন্দি গ্রহণের আবেদন জানালেও বিচারক তা আমলে নেননি। এ ব্যাপারে তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, এটা মিথ্যা ও সাজানো মামলা। শুধু আসামিদের হয়রানি করার জন্য মামলাটি করা হয়েছিল।

আদালত সূত্রে জানা যায়, কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের লাকুহাটি গ্রামের মফিজ উদ্দিনের ছেলে মো. জালাল উদ্দিনকে ২০০৯ সালের ১০ জুলাই অপহরণের পর খুনসহ লাশ গুমের অভিযোগে তাঁর স্ত্রী ললিতা বেগম ২০১০ সালের ৩১ মার্চ হোসেনপুর থানায় পাঁচজনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। মামলার আসামিরা হচ্ছেন শংকর বাবু, মো. আসাদ মল্লিক, রুহুল আমিন ওরফে রঙ্গু, হিরা মিয়া ও আজহারুল ইসলাম। বাদী ও আসামি সবার বাড়ি কাছাকাছি এলাকায়।

মামলার বিবরণে বাদী ললিতা বেগম আসামি শংকর বাবু ও আসাদ মল্লিককে আদম বেপারী এবং বাকি তিনজনকে তাঁদের সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করেন। চাকরিসহ সৌদি আরব পাঠানোর কথা বলে আসামিরা তাঁর স্বামীর কাছ থেকে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়েছেন বলে মামলাতে বলা হয়। কিন্তু নির্ধারিত তারিখে জালাল উদ্দিনকে বিদেশে না পাঠিয়ে বিভিন্ন তালবাহানায় তাঁকে ঘুরাতে থাকেন। একপর্যায়ে আসামিরা বিদেশ যাওয়ার কথা বলে তাঁর স্বামীকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পর বহু চেষ্টা করেও পরে আর তাঁর কোনো খোঁজ পাননি। একপর্যায়ে ললিতা বেগম হোসেনপুর থানায় মামলা করেন।

মামলা দায়েরের পর শংকর বাবু ও মো. আসাদ মল্লিক শুরু থেকে পলাতক রয়েছেন। এ ছাড়া রুহুল আমিন ওরফে রঙ্গু ও মো. হিরা মিয়া তিন বছর পলাতক থাকার পর বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করে তিন মাস জেল খাটেন। এর মধ্যে হিরা মিয়াকে একদিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অন্য আসামি আজহারুল ইসলাম আড়াই বছর পলাতক থাকার পর হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নিয়ে বাড়িতে ফেরার পর পুলিশ তাঁকে আটক করে এবং তিনি চার মাস জেল খাটেন।

মামলাটি দায়েরের পর বিভিন্ন পর্যায়ে চারজন তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়। মামলা দায়েরের পাঁচ বছর পর সর্বশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা শাখার এস আই মুর্শেদ জামান পাঁচজনকে আসামি করে আমলি আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন এবং মামলাটি দ্বিতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বদলি করা হয়। চার্জশিট দাখিলের পর পুনরায় জামিন নামঞ্জুর হওয়ায় তিন আসামি আরো এক মাস করে জেল খাটেন।

সোমবার আদালতে উপস্থিত হওয়া মামলার আসামি হিরা মিয়া, তাঁর ভাতিজা রুহুল আমিন ও ভাগ্নে আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা মামলার বিষয়বস্তু সম্পর্কে কিছুই জানি না এবং বাদীর সঙ্গেও আমাদের কোনো বিরোধ নেই। আমরা কৃষিকাজসহ ছোটখাটো ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করি। কিন্তু মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে আমাদের হয়রানি করা হয়েছে। দীর্ঘদিন পালিয়ে থাকায় ও মামলার খরচ জোগাতে আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছি। সেই সঙ্গে সামাজিকভাবে হেয় ও অপমানিত হয়েছি।’

তিন আসামির সবাই এত দিন পর জালাল উদ্দিনের ফিরে আসার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য সুষ্ঠু তদন্ত ও তাঁদের যে হয়রানি করা হয়েছে, তার বিচার দাবি জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে হোসেনপুর থানার ওসি আবুল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ থানায় নতুন বলে জানান। ৯-১০ বছর আগের ঘটনাটি তাঁর জানা নেই। তিনি এ সময় ৯ বছর ওই ব্যক্তিকে ওষুধ ও নেশাজাতীয় দ্রব্য প্রয়োগ করে অপ্রকৃতিস্থ করে রাখার বিষয়টিকে সন্দেহজনক বলে মন্তব্য করেন।


মন্তব্য