kalerkantho


প্রণব মুখোপাধ্যায়ের প্রশ্ন

রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর বারবার আক্রমণ কেন?

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম    

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর বারবার আক্রমণ কেন?

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছ থেকে সম্মানসূচক ডি.লিট ডিগ্রি গ্রহণ করেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। ছবি : কালের কণ্ঠ

এই উপমহাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ রাজনৈতিক নেতৃত্ব কেন বারবার আক্রমণের শিকার হচ্ছেন, সেই প্রশ্ন তুলে এসব হত্যাকাণ্ডের কারণ জানতে গবেষণার আহ্বান জানিয়েছেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আবদুর রব হলের মাঠে আয়োজিত বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। এই সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট ডিগ্রি প্রদান করা হয়। 

প্রণব মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘ভারত ও বাংলাদেশে স্বাধীনতার পরপরই জাতির পিতাদের হত্যা করা হলো। ব্রহ্মদেশে (মিয়ানমার) অং সান সু চির বাবা জেনারেল অং সান ব্রাশফায়ারে নিহত হলেন। ১৯৬০ সালে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী নিহত হলেন। ১৯৪৮ সালে মহাত্মা গান্ধী নিহত হলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হলেন। ৩ নভেম্বর যাঁরা মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন তাঁরা নিহত হলেন জেলখানার ভেতরে। পাকিস্তানে জিয়াউল হক নিহত হলেন। জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ফাঁসি দেওয়া হলো। এই যে বিপুলসংখ্যক রাজনৈতিক হত্যা—এর কারণ কী? এর পেছনে সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কাজ করেছে কি না আমি জানি না। সমাজতত্ত্ববিদ, ইতিহাসবিদ ও পণ্ডিতদের কাছে নিবেদন করব, এই বিষয়ে গবেষণা করে এ অঞ্চলের মানুষকে জানাতে হবে।’

মহান মুক্তিযুদ্ধে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন বাংলাদেশের এই অকৃত্রিম বন্ধু। গতকাল ৩৮ মিনিটের বক্তব্যে তিনি তুলে ধরেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা, বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন-মুক্তিযুদ্ধ, চট্টগ্রামের ঐতিহ্য ও বিশ্বে গণতন্ত্রের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের কথা।

বাংলাদেশ স্বাধীনের সাড়ে তিন বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধুকে হত্যা জাতির জন্য বড় আঘাত উল্লেখ করে প্রণব বলেন, ‘অকথ্য নির্যাতন, লাঞ্ছনা, মৃত্যু সহ্য করে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। এ স্বাধীনতায় নেতৃত্ব দিয়েছেন সর্বকালের সর্বযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমান। আমরা যেমন ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি আততায়ীর গুলিতে ভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীকে হারিয়েছি, তেমনিভাবে শেখ মুজিবুর রহমান ভোরে এক দল ঘাতকের নৃশংস আক্রমণের শিকার হলেন।’

প্রণব মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘একটি সদ্য স্বাধীন দেশ। অসংখ্য সমস্যা ছিল। দেশ গড়ার সমস্যা। দেশকে এগিয়ে নেওয়ার সমস্যা। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূর করার সমস্যা। সেই সমস্যার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় জন্মলগ্নের মুহূর্তে একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হলো। পৃথিবীর কোনো দেশে এ নজির খুব বেশি নেই। আমেরিকা স্বাধীনতা লাভের বহু বছর পর আব্রাহাম লিংকন নিহত হয়েছিলেন।’

এসব কারণ জানতে গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে প্রণব বলেন, ‘রাস্তা কোন দিক জানতে পারলে সেদিকে চলতে পারব। চলাটা সহজ হয়ে যাবে।’

বাংলাদেশ ও ভারত গণতান্ত্রিক পথে রয়েছে জানিয়ে প্রণব মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘আজ এ মাটিতে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করছি গণতন্ত্রের মধ্য দিয়ে দেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যায়। বিশ্বব্যাংকের এক রিপোর্টে দেখেছি, বাংলাদেশ অন্যতম এগিয়ে যাওয়া দেশের স্বীকৃতি পেয়েছে।’

বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞানী, ইঞ্জিনিয়ার, অর্থনীতিবিদ ও গবেষক তৈরি করবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অধ্যয়ন শেষে চাকরির জন্য না ছুটে তাদের গবেষণায় মান বাড়াতে হবে। বিশ্বকল্যাণ বয়ে আনবে, এমন জিনিস তাদের উদ্ভাবন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ সংকীর্ণ হবে না। সব সময় খোলা হাওয়ার মতো মুক্ত থাকবে।’

শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠার পাঁচ দশকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় উপমহাদেশের মধ্যে বিশাল পরিচিতি লাভ করেছে। যখন ৫০ বছর পেছনে ফিরে তাকাচ্ছি, তখন দেখছি, ২০০ শিক্ষার্থী থেকে ২৬ হাজার শিক্ষার্থী, চারটি বিভাগ থেকে ৪৭টি বিভাগ ও গুটিকয়েক শিক্ষক থেকে ৮৫০ শিক্ষক হয়েছে। প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছর পরই স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এখানে পিছিয়ে থাকেনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। অনেক ত্যাগ ও আত্মবিসর্জন দিতে হয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে।’

ডি.লিট ডিগ্রি দেওয়ার জন্য তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘আমি অভিভূত। আমার মতো একজন সাধারণ মানুষকে আপনারা ডি.লিট উপাধি দিয়েছেন। আমি নিজেকে সম্মানিত এবং মর্যাদাবান মনে করছি।’

অনুষ্ঠানে প্রণবের হাতে ডি.লিট ডিগ্রির স্মারক তুলে দেন উপাচার্য ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী। এরপরই উত্তরীয় পরিয়ে দেন উপউপাচার্য শিরীন আখতার। সমাবর্তন পরিচালনা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ড. কামরুল হুদা।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী সভাপতির বক্তব্যে বলেন, ‘অহিংস আন্দোলনের প্রাণপুরুষ মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, চট্টগ্রাম সর্বাগ্রে। মাস্টারদা সূর্য সেন ও প্রীতিলতার চট্টগ্রাম সব কিছুতে সবার আগে। রাজনীতি, উন্নয়ন ও সংস্কৃতির অন্যতম পৃষ্ঠপোষক প্রণব মুখোপাধ্যায় বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। তাঁর মতো একজন ব্যক্তিত্বকে ডি.লিট ডিগ্রি প্রদানের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সোনালি অধ্যায়ের সূচনা হলো।’

সূর্য সেনের জন্মভিটায় প্রণব মুখোপাধ্যায় : সমাবর্তন অনুষ্ঠান শেষে রাউজানের নোয়াপাড়ায় সূর্য সেনের জন্মভিটা পরিদর্শন করেন ভারতের সাবেক এই রাষ্ট্রপতি। গতকাল বিকেল ৫টায় তিনি সূর্য সেন পল্লীতে পৌঁছেন। জন্মভিটায় সূর্য সেনের স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এরপর সেখানে একটি গাছের চারা রোপণ করেন। পরে সূর্য সেন মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুকল্যাণ কমপ্লেক্স ঘুরে দেখেন তিনি।

এ সময় প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে মেয়ে শর্মিষ্ঠা মুখোপাধ্যায়ও ছিলেন। এ ছাড়া রাউজানের সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলাও উপস্থিত ছিলেন।

প্রণব মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে গাড়ি সূর্য সেন পল্লীর দিকে যাওয়ার সময় গ্রামের মানুষ তাঁকে একনজর দেখার জন্য সড়কে, বাড়ির সামনে জড়ো হয়। অনেকে হাত নেড়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে।

এর আগে বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইটে গতকাল সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেন তিনি। জেলা প্রশাসক মো. জিল্লুর রহমান চৌধুরী, সিএমপি কমিশনার ইকবাল বাহার, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি এস এম মনিরুজ্জামানসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রণব মুখোপাধ্যাকে স্বাগত জানান।

বিমানবন্দর থেকে প্রণব মুখোপাধ্যায় সাড়ে ১১টায় র‌্যাডিসন ব্লু চিটাগাং বে ভিউ হোটেলে পৌঁছেন। বিকেলে রাউজানের নোয়াপাড়ায় সূর্য সেনের জন্মভিটা থেকে নগরীতে ফিরে রাতে র‌্যাডিসন হোটেলে ভারতীয় দূতাবাসের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি।


মন্তব্য