kalerkantho


‘ঢাকা ঘোষণা’য় শেষ লেখকদের সম্মিলন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



‘ঢাকা ঘোষণা’য় শেষ লেখকদের সম্মিলন

বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে দিনভর শিল্প-সাহিত্যের মানুষের সরব উপস্থিতি। একাডেমির সবুজ আঙিনা, পুকুরপাড়, ঐতিহাসিক বর্ধমান হাউস—সর্বত্র উৎসবের আমেজ। গোটা চত্বর ঘুরে বেড়াচ্ছেন দেশ-বিদেশের লেখকরা। বিভিন্ন অধিবেশনে লেখক-সাহিত্যিকদের পাশাপাশি শিল্প-সংস্কৃতির নানা শাখার মানুষের সরব উপস্থিতি। আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের শেষ দিনে গতকাল সোমবার বাংলা একাডেমির চৌহদ্দিজুড়ে ছিল এমনই সব দৃশ্য। সমাপনী দিন থাকায় সাহিত্যামোদীর ভিড়ও ছিল লক্ষণীয়। বাংলা একাডেমির বিভিন্ন মিলনায়তন ও অনুষ্ঠানস্থলে আলোচনায় মেতেছিলেন বিভিন্ন দেশের সাহিত্যের দিকপালরা। পাশাপাশি ছিল নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন।

ঢাকা ঘোষণার মধ্য দিয়ে গতকাল শেষ হলো তিন দিনের এই সাহিত্য সম্মেলন। সম্মেলনের প্রধান সমন্বয়ক নাসির উদ্দীন ইউসুফ ‘ঢাকা ঘোষণা’ দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সব ধরনের বিদ্বেষ ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতের বিরোধী এবং তাই বিশ্বশান্তির পক্ষে নিজেদের দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করছি। আমরা সব মানুষের মৌলিক অধিকারে বিশ্বাসী এবং প্রত্যেক মানবগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা তাদের অলঙ্ঘনীয় অধিকার বলে ঘোষণা করছি।’

‘বিশ্বমানব হবি যদি কায়মনে বাঙালি হ’ প্রতিপাদ্যে দুই বাংলার তিন শতাধিক সাহিত্যিকের অংশগ্রহণে বাংলা একাডেমিতে এ সম্মেলনের আয়োজন করে আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন পরিষদ। সহযোগিতায় ছিল বাংলা একাডেমি, নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন ও ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ। শনিবার বিকেলে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর গতকাল এই সম্মেলনের সমাপনী ঘোষণা করেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়।

ঢাকা ঘোষণায় নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, ‘আমরা মানুষের জন্য যা কিছু অকল্যাণকর তা পরিহার করে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করা সব লেখকের কর্তব্য বলে ঘোষণা করছি। আমরা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পক্ষে ভূমিকা পালনের অঙ্গীকার করছি। আমরা ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময়ে ভূমিকা পালনের অঙ্গীকার করছি।’

সমাপনী দিনের আয়োজনে গতকাল ছিল তিনটি সেমিনার, তরুণদের অংশগ্রহণে নানা বিষয়ে কথোপকথন ও গল্প পাঠের আয়োজন। পাশাপাশি মঞ্চনাটক ও লোকগানের সুরে শেষ দিনে জমজমাট ছিল সাহিত্য সম্মেলন।

একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে ছিল দিনের প্রথম সেমিনার। ‘ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতিসত্তা’ শিরোনামে এই সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সৈয়দ আজিজুল হক। ইমেরিটাস অধ্যাপক ও ভাষাসৈনিক ড. রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে আলোচনা করেন ভারতের সাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তী, বাংলাদেশের সমালোচক ও প্রাবন্ধিক আবুল মোমেন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ ও ভারতের সাহিত্যিক অমর মিত্র।

রফিকুল ইসলাম বলেন, বাঙালির মধ্যে মাতৃভাষা নিয়ে মধ্যযুগ থেকেই দ্বিচারিতা ছিল। ইংরেজ আমলেও সেই স্ববিরোধিতার নিরসন হয়নি। সেই প্রেক্ষাপটে ভাষা আন্দোলন নিয়ে আসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সেই পরিবর্তনটিই ছিল অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে প্রথম পদক্ষেপ। জাতি-রাষ্ট্রের সংগ্রামে মূলমন্ত্র হয়েছে এই ভাষা আন্দোলন। এর থেকে আমরা শক্তি পেয়েছি। রাজনৈতিকভাবে গঠিত হয়েছে বাঙালি জাতি-রাষ্ট্র।’

দিনের দ্বিতীয় সেমিনার ছিল কবি শামসুর রাহমান মিলনায়তনে। ‘প্রযুক্তির বিশ্বে সাহিত্যের সংকট ও সম্ভাবনা’ শিরোনামের এই সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাংবাদিক-অনুবাদক রাজু আলাউদ্দীন। ভারতের আসামের লেখক ও প্রাবন্ধিক তপোধীর ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে আলোচক ছিলেন শিশুসাহিত্যিক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, জাতীয় কবিতা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তারিক সুজাত এবং ভারতের কবি প্রবীর শীল ও শ্যামল কান্তি দাস।

সম্মেলনের শেষ সেমিনার ছিল আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে। সেখানে ‘সাহিত্যের অনুবাদ, অনুবাদের সাহিত্য’ শিরোনামে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক আবদুস সেলিম। শিক্ষাবিদ-কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এতে আলোচনা করেন অধ্যাপক নিয়াজ জামান, অনুবাদক জি এইচ হাবীব, কবি মুহাম্মদ সামাদ, ভারতের মৃদুল দাশগুপ্ত ও জাপানের কাজুহিরো ওয়াতানাবে।

‘অনেক আকাশ’ তাঁবুতে সমাপনী দিনেও ছিল নানা বিষয়ে দারুণ সব আলোচনা। ‘কথাপর্ব’ শিরোনামের এই আয়োজনে জনপ্রিয় ধারার লেখা, সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়ণ, লোকসাহিত্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে তরুণ ও প্রবীণ সাহিত্যিকরা মতবিনিময় করেন।

‘সাহিত্যের চলচ্চিত্রায়ণ’ শিরোনামের কথাপর্বে আলোচনা করেন নির্মাতা ফৌজিয়া খান, চলচ্চিত্র গবেষক বিধান রিবেরু, সাংবাদিক উদিসা ইসলাম ও শোয়েব সর্বনাম। ‘বিশ্বায়নের কালে লোকসাহিত্য’ শিরোনামের কথাপর্বে আলোচক ছিলেন নাজিব তারেক, রাহেল রাজিব, রঞ্জনা বিশ্বাস ও রিলকে রশীদ। সঞ্চালনায় ছিলেন কবি শিহাব শাহরিয়ার।

এ ছাড়া দিনভর ছিল নানা আয়োজন। দুই বাংলার কবিদের পরিবেশনায় ছিল স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর। ছিল লোকগান ও আবৃত্তির আয়োজন। সন্ধ্যায় একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে থিয়েটার মঞ্চস্থ করে সৈয়দ শামসুল হক রচিত ও আবদুল্লাহ আল-মামুন নির্দেশিত নাটক ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’।



মন্তব্য