kalerkantho


অপহরণের ১০ দিন পর মিলল শিশুর বস্তাবন্দি লাশ

হত্যার পরও মুক্তিপণ আদায়, গ্রেপ্তার ২

নিজস্ব প্রতিবেদক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

১৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



অপহরণের ১০ দিন পর মিলল শিশুর বস্তাবন্দি লাশ

প্রতীকী ছবি

‘খড়িয়ালা, আশুগঞ্জের প্রিয় ছোট্ট সোনা রিফাত, তোমাকে উদ্ধারের জন্য সারা সপ্তাহ চেষ্টা করেও তোমার শেষরক্ষা করতে পারলাম না।... আজকে যেখানে তোমার কাঁধে স্কুল ব্যাগ থাকার কথা, সেখানে তোমাকেই নিথর হয়ে ব্যাগবন্দি থাকতে হলো এই শীতে দশ দিন দশ রাত। তোমার হত্যাকারীদের আমরা ছাড়িনি সোনা। সকল আলামত প্রমাণসহ ওদের আমরা গ্রেপ্তার করেছি। ওদের সাজা হবেই, হতেই যে হবে। না হলে আমরা তোমার কাছে বড্ড ছোট হয়ে যাব যে। তোমার পরিবারকে সান্ত্বনা দেবার ভাষা নেই, শুধু দুফোঁটা অশ্রু ছাড়া। ইতি তোমার পুলিশ চাচ্চু।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে শিশু রিফাতের বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধারের পর ফেসবুকে এমন ‘হৃদয়ছোঁয়া’ স্ট্যাটাস দিয়েছেন সহকারী পুলিশ সুপার (সরাইল-আশুগঞ্জ সার্কেল) মো. মনিরুজ্জামান ফকির। অপহরণের ১০ দিন পর গতকাল সোমবার ভোরে আশুগঞ্জের দুর্গাপুর ইউনিয়নের খড়িয়ালা গ্রামের মুমিন মিয়ার বাড়ির বাথরুমের ওপর থেকে গলিত অবস্থায় ওই লাশ উদ্ধার করা হয়।

খড়িয়ালা গ্রামের বাহার মিয়ার ছেলে রিফাত স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্র। গতকাল সোমবার দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে তার লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।

এই হত্যার ঘটনায় পুলিশ বরগুনার পাথরঘাটার সিদ্দিকুর রহমানের ছেলে সোহাগ মিয়া (২৪) ও ঝালকাঠির কাঁঠালিয়ার আনছার আলীর ছেলে সোলায়মানকে (২২) গ্রেপ্তার করেছে। অপহরণ এবং  পরবর্তী সময়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তারা জড়িত বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। ওরা স্থানীয় ইউপি সদস্য মুমিন মিয়ার বাড়িতে ভাড়া থাকত। গ্রেপ্তারকৃতরা পুলিশকে জানিয়েছে, টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যেই রিফাতকে অপহরণ করা হয়। কিন্তু কান্নাকাটি করতে থাকায় ঘটনা জানাজানি হওয়ার ভয়ে ওরা হাত-পা বেঁধে শিশুটিকে গলা টিপে হত্যা করে। আর রিফাতকে হত্যার পরও মুক্তিপণ হিসেবে পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায় করে।

পুলিশ ও পরিবার সূত্র জানায়, গত ৫ জানুয়ারি দুপুরে নিখোঁজ হয় রিফাত। কোথাও খুঁজে না পেয়ে ওর বাবা বিষয়টি পুলিশকে জানান। দুই দিন পর রিফাতের বাবার কাছে মোবাইলে ফোন করে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ চায় অপহরণকারীরা। বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করলে পুলিশের পরামর্শমতো বিকাশের মাধ্যমে তিনি ৩০ হাজার টাকা পাঠান। পরে ওই বিকাশ নম্বরের সূত্র ধরেই পুলিশ জড়িতদের ব্যাপারে জানতে পারে। আটক করা হয় খড়িয়ালা গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলীকে। জিজ্ঞাসাবাদে সে জানায়, সোলায়মান নামে এক ব্যক্তি স্ত্রীর অসুস্থতার কথা বলে তার মাধ্যমে টাকা আনে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সোহাগ ও সোলায়মান নামে দুজনকে আটক করা হয়। পরে তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী শিশু রিফাতের লাশ উদ্ধার করা হয়।

দুর্গাপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জিয়াউল করিম খান বলেন, ‘শিশুটির বাবা খুব একটা বিত্তশালী নন। অথচ মুক্তিপণ আদায় করতেই শিশুটিকে অপহরণ করা হয়। আর ওরা টাকা নিল আবার শিশুটিকে হত্যাও করল। ভয়াবহ এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা হওয়া উচিত।’

আশুগঞ্জ থানার ওসি বদরুল আলম তালুকদার গতকাল বিকেলে বলেন, ‘মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশ্যে শিশুটিকে অপহরণ করা হয়। তবে টাকা নেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে শিশুটিকে গলা টিপে হত্যা করা হয় বলে গ্রেপ্তারকৃতরা স্বীকার করেছে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। আটক দুজনকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানিয়ে আগামীকাল (আজ) আদালতে পাঠানো হবে।’

সহকারী পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান ফকির বলেন, ‘অনেক ঘটনার মুখোমুখিই আমাদের হতে হয়। কিন্তু এ ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। টাকার উদ্দেশ্যে অপহরণ করার পর কান্নাকাটি করায় শিশুটিকে মেরে ফেলা হয়। তার পরও টাকার জন্য কল করা হয়।’



মন্তব্য