kalerkantho


মরিয়া আওয়ামী লীগ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিএনপি

কে এম সবুজ, ঝালকাঠি   

১৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মরিয়া আওয়ামী লীগ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিএনপি

রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া নিয়ে গঠিত ঝালকাঠি-১ আসনের রাজনীতি এখন নির্বাচনমুখী। রাজনীতির মাঠে বড় দলগুলোর নেতাদের মধ্যে মনোনয়ন নিয়ে ঠাণ্ডা লড়াই শুরু হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থীরা কেন্দ্রে লবিং ও তদবির শুরু করেছেন। যাঁরা মনোনয়ন চাইছেন, তাঁদের সমর্থকরা আলাদা কর্মসূচি পালন করছে। সব মিলিয়ে জাতীয় সংসদের ১২৫ নম্বর নির্বাচনী এলাকাটির ১২টি ইউনিয়ন ও দুটি উপজেলা এখন সরগরম।

প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে ঝালকাঠি-১ আসনটি আওয়ামী লীগের হাতছাড়া হয়। প্রথম সংসদ নির্বাচনে ঝালকাঠি-রাজাপুর নিয়ে গঠিত আসনে আমির হোসেন আমু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। দ্বিতীয়, পঞ্চম ও ষষ্ঠ সংসদে বিজয়ী হয়েছিলেন বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার মুহাম্মদ শাহজাহান ওমর।  ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঐকমত্যের সরকারে যোগ দিয়েছিলেন জাতীয় পার্টি (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমরের (বীর-উত্তম) কাছে হেরে যান। স্বাধীনতাযুদ্ধের পর ২০০১ সাল পর্যন্ত আটটি সংসদ নির্বাচনে সাতবারই এ আসনে আওয়ামী লীগকে হারতে হয় বিএনপি ও জাতীয় পার্টির কাছে। দীর্ঘ ৩০ বছর পর ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বজলুল হক হারুন নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে আসনটি আবার আওয়ামী লীগের ঘরে আসে।

২০০১ সালে এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রথমে ভূমি প্রতিমন্ত্রী এবং পরে আইন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়ে এলাকায় রাস্তাঘাটের ব্যাপক উন্নয়ন করেছিলেন শাহজাহান ওমর। নবম ও দশম সংসদ নির্বাচনের পর রাজাপুর-কাঁঠালিয়াবাসী কোনো মন্ত্রী পায়নি।

আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে আসনটি ধরে রাখতে আওয়ামী লীগ সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবে, আর বিএনপি আসন পুনরুদ্ধারে সর্বশক্তি নিয়োগ করবে বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়।

বর্তমান সরকারের বন ও পরিবেশ মন্ত্রী আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর ঝালকাঠি-১ আসনে নির্বাচন করার আগ্রহ রয়েছে। তিনি শেখ হাসিনার কাছে এ আসনটি চাইতে পারেন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি এ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। পরে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার অনুরোধে তিনি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন।

আওয়ামী লীগ : আসনটি ধরে রাখতে ইতিমধ্যেই একাদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য নৌকায় ভোট চাইতে শুরু করেছেন জাতীয় সংসদের ধর্ম মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া) আসনের সংসদ সদস্য বজলুল হক হারুন। রাজাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বজলুল হক হারুন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইবেন এটা নিশ্চিত। মনোয়নয়ন পাওয়ার ব্যাপারেও আশাবাদী তিনি।

সংসদ সদস্য হারুন বলেন, ‘আমি রাজাপুর-কাঁঠালিয়া আসনে আওয়ামী লীগের নির্বাচিত প্রথম এমপি। রাজাপুর-কাঁঠালিয়া আসন হওয়ার পর আমার আগে এখান থেকে কেউ নৌকা প্রতীকে নির্বাচিত হতে পারেনি। আমি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে কাঁঠালিয়াবাসীর শতবর্ষের দাবি আমুয়া সেতুর কাজ শেষ করতে পেরেছি। আমুয়া সেতুর জন্য আমি জাতীয় সংসদে আঠারো বার দাবি তুলেছি। আমার নির্বাচনী এলাকার দুটি উপজেলার সব নেতাকর্মী এবং ১২টি ইউনিয়নের ১৫৬ জন চেয়ারম্যান-মেম্বার সবাই আমার সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ। অন্য যারা নমিনেশনের জন্য ছোটাছুটি করে তাদের সঙ্গে কেউ নেই।’

একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে বি এইচ হারুনের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী দীর্ঘদিন পর্যন্ত এলাকায় গণসংযোগ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরব রয়েছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা মো. মনিরুজ্জামান মনির। তিনি ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অত্যন্ত পরিচিত মুখ। টক শো করে দলের উন্নয়ন ও আগামীর ভাবনা প্রচার করে ইতিমধ্যেই দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের চোখে পড়েছেন তিনি। এলাকায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন মনির। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে বরাদ্দ এনে তিনি সহায়তা করেছেন রাজাপুর-কাঁঠালিয়ার গরিব ও দুস্থ মানুষকে।

মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ‘গত প্রায় ৯ বছর আওয়ামী লীগের দুই মেয়াদে আমি এলাকার নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি। এলাকার মানুষ সংসদ সদস্যকে কাছে না পেলেও সব সময় আমাকে কাছে পেয়েছে। আমি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে এলাকার মানুষকে সহায়তা করেছি। আশা করি দলীয় সভানেত্রী এবার আমাকে মূল্যায়ন করবেন। আমি নিজের জন্য, নৌকার জন্য কাজ করছি।’

এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে লবিং করছেন বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব মো. ইসমাইল হোসেন ও ঝালকাঠি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খান সাইফুল্লাহ পনির।

সাইফুল্লাহ পনির বলেন, ‘ঝালকাঠি জেলায় যারা পোড় খাওয়া আওয়ামী লীগার তাদের মধ্যে আমি একজন। বিগত ৯ বছরে অনেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, আবার অনেকে সুযোগ পেয়ে দলীয় নেতাকর্মী ও দলের সঙ্গে বেইমানি করেছে। আমাকে রাজাপুর-কাঁঠালিয়া থেকে মনোনয়ন দেওয়া হলে আর যাই হোক দলের সঙ্গে বা নেতাকর্মীদের সঙ্গে বেইমানি করব না।’

এই চারজন ছাড়াও এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইতে পারেন রাজাপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মিলন মাহমুদ বাচ্চু। আর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন বন ও পরিবেশ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু।

বিএনপি : রাজাপুর-কাঁঠালিয়া দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত। এ আসন থেকে বিএনপির টিকিটে চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর। ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয়, ১৯৯১ সালের পঞ্চম, ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ ও ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমরের কার্যত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের সাবসেক্টর কমান্ডার শাহজাহান ওমরের প্রাপ্ত ভোটের সঙ্গে পরাজিত প্রার্থীর ভোটের বিস্তর ব্যবধান ছিল। দলীয় নেতাকর্মীর বাইরেও শাহজাহান ওমরের রয়েছে ব্যক্তিগত বিশাল কর্মী বাহিনী। দুই ধরনের কর্মীরাই তাঁকে ওস্তাদ বলে সম্বোধন করে। ওস্তাদকে খুশি করতে কর্মীরা যেকোনো ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত থাকে। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সময় প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তাঁকে দেশ ছাড়তে হয়। সে কারণে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি অংশ নিতে পারেননি। আর ২০১৪ সালে বিএনপি দশম সংসদ নির্বাচন বয়কট করায় তিনি প্রার্থী হননি।

আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে শাহজাহান ওমর বিএনপির মনোনয়ন চাইবেন—এটা শতভাগ নিশ্চিত। দলে আগের চেয়ে তাঁর অবস্থানও মজবুত। দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও জেলা শাখার সভাপতির পদ থেকে তিনি এখন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান। মামলা-মোকদ্দমায় জর্জরিত নেতাকর্মীদের তিনি খোঁজখবর রেখেছেন।

এদিকে বিএনপির মনোনয়ন দৌড়ে রয়েছেন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী নেতা প্রকৌশলী এ কে এম রেজাউল করিম। ওয়ান-ইলেভেনের পর থেকে দলীয় নেতাকর্মীদের খোঁজখবর নিচ্ছেন তিনি। এর আগে থেকেই সংসদ নির্বাচনগুলোতে বিএনপির প্রচার সেলে কাজ করেছেন তিনি। যুক্তরাজ্য বিএনপির আগামী কমিটিতে রেজাউল করিম সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী। রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া উপজেলায় তিনি নেতাকর্মীদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। এলাকায় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শের-ই-বাংলা রিসার্চ ইনস্টিটিউট করে সাড়া ফেলেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সাতুরিয়া ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম কলেজে এলাকার গরিব অসহায় মানুষের সন্তানরা পড়ালেখার সুযোগ পাচ্ছে। ভালো সম্পর্ক রয়েছে বিএনপির জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে। যুক্তরাজ্যে তারেক রহমানের সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও যোগদান করছেন তিনি।

রেজাউল করিম বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোতে বিএনপির প্রচার সেলে কাজ করেছি। রাজাপুর-কাঁঠালিয়া আসনে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে সব সময় নির্বাচনে ভূমিকা রেখেছি। এলাকায় গণভিত্তি তৈরি করেছি। এখন সাধারণ মানুষ যুবকদের নেতৃত্ব চায়। তাঁরা চায় ভালো মানুষ রাজনীতিতে আসুক। তাই আমি দলের প্রার্থী হয়ে কাজ করতে চাই। আমার অসংখ্য সমর্থক চাইছে দেশনেত্রী যেন আমাকে ঝালকাঠি-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন দেন।’

এ ছাড়া বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইছেন রাজাপুরের সন্তান ঢাকার ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম জামাল। তিনি ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি তথা চারদলীয় জোটের টিকিটে এ আসন থেকে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছিলেন।

রফিকুল ইসলাম জামাল বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে অবশ্যই আমি বিএনপির মনোনয়ন চাইব। কারণ ২০০৭-০৮ সালে নেতাকর্মীদের ফেলে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন শাহজাহান ওমর। তখন বিপদগ্রস্ত নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। তাই দেশনেত্রী আমার হাতে ধানের শীষ প্রতীক তুলে দিয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে আমাকে হারানো হয়েছিল। দলের কাছে অবশ্যই আমার দাবি আছে এবং দলের যেকোনো সিদ্ধান্ত আমি মাথা পেতে নেব। গত ১০ বছর নেতাকর্মীদের বিপদে-আপদে পাশে ছিলাম।’

বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহান ওমর বলেন, ‘বিএনপি রাজপথের দল। এখানে সুযোগসন্ধানীদের কোনো প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। রাজাপুর-কাঁঠালিয়ার মানুষ আমাকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে এখানে ঈর্ষণীয় উন্নয়ন হয়েছে।’

ঝালকাঠি জেলা বিএনপির সভাপতি মোস্তফা কামাল মন্টু বলেন, ‘ঝালকাঠিতে বিএনপির অভিভাবক হিসেবে ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমরের বিকল্প নেই। ঝালকাঠি-১ আসন থেকে তিনি (শাহজাহান ওমর) নির্বাচন করবেন—এটা দলীয় ফোরামে চূড়ান্ত।’



মন্তব্য