kalerkantho


পুনর্বাসন

স্বাবলম্বী ‘ভিক্ষুকদের’ গল্প

শওকত আলী   

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



স্বাবলম্বী ‘ভিক্ষুকদের’ গল্প

ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে স্বাবলম্বী সোফিয়া বেওয়া নিজ বাড়ির সামনে। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘আগে তো মানুষ হামারে খারাপ চোখে দেখত। ভিক্ষা করতাম যে! এখন ভালো আছি। নিজে আয় করছি।’ ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে স্বাবলম্বী হওয়া মো. আবু বক্কর বেশ তৃপ্তি আর গর্ব নিয়ে বলেন কথাগুলো। তিনি যে এখন আর কারো অনুকম্পাপ্রার্থী নন, তা তাঁর অভিব্যক্তিতেই প্রকাশ পাচ্ছিল।

জানা গেল, আবু বক্কর ছোটবেলা থেকেই অন্ধ। দরিদ্রের ঘরে জন্ম আর নিজের অন্ধত্বের কারণে উপায়ান্তর না দেখে তিনি ভিক্ষাবৃত্তিকেই বেঁচে থাকার একমাত্র মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন। তাঁকে দিয়ে আর কোনো কাজ সম্ভব—এটা তাঁর ভাবনায়ও ছিল না। এই ভিক্ষাবৃত্তি করেই কেটে যায় জীবনের বড় একটা সময়। প্রায় ৩৫ বছর বয়স পর্যন্ত জয়পুরহাটের ধলাহার ইউনিয়নের মানুষ তাঁকে জানত কেবলই ভিক্ষুক হিসেবেই। এর পরই তাঁর জীবনে ঘটে যায় বড় পরিবর্তন।

ভিক্ষা করতে করতে একটা সময় আবু বক্করের কিছু অর্থ সঞ্চয় হয়। তা দিয়ে নিজের চোখের অপারেশন করান। তাতে চোখ পুরোপুরি ভালো না হলেও একটু একটু করে কাছের জিনিস দেখতে পারেন। এবার সিদ্ধান্ত নেন, আর নয় ভিক্ষাবৃক্তি। আর নয় অন্যের করুণা প্রার্থনা। ভিক্ষাবৃদ্ধি ছেড়ে দিয়ে পিকেএসএফের প্রকল্পের আওতায় অনুদানের অর্থে দুটি ষাঁড় ও একটি পাঁঠা ছাগল কেনেন। গড়ে তোলেন ছোট্ট একটি প্রজনন সেন্টার। শুরু হয় তাঁর নতুন পথচলা।

আবু বক্কর তাঁর খামারে বিভিন্নজনের গরু-ছাগলের প্রজননে কাজ শুরু করেন। এই কাজের জন্য গরুপ্রতি ১৫০-২০০ এবং ছাগলের ক্ষেত্রে ১০০ টাকা করে নেন। বর্তমানে এই কাজ করে প্রতিদিন তাঁর আয় হয় ৫০০-৭০০ টাকা। কোনো কোনো দিন বেশিও হয়। এখানেই থেমে নেই আবু বক্কর। রাজহাঁস, টার্কি জাতের মুরগি ও কবুতর পালন করছেন। তাতে সহযোগিতা করছেন তাঁর স্ত্রী। আর তা দিয়ে দিব্বি চলে যাচ্ছে তাঁর সংসার।

সরেজমিনে আবু বক্করের বাড়িতে কথা হলো প্রতিবেশী কৃষক আবদুর রহিমের সঙ্গে। এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, আবু বক্কর যখন ভিক্ষা ছেড়েছে তখন গ্রামের লোক হাসাহাসি করেছে। মনে করেছে দানে কিছু টাকা পেয়েছে। সেটা শেষ হলেই আবার সে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামবে।

তবে যেভাবেই হোক পেশা বদলাতে পেরে বেশ সুখী আবু বক্কর। গ্রামের কেউ আর তাঁকে ভিক্ষুক বলে ডাকে না। বরং একটা কিছু করে রোজগার করার কারণে মানুষের কাছে বেশ সম্মানই পান তিনি।

পিকেএসএফের ‘সমৃদ্ধি কর্মসূচির’ আওতায় আবু বক্করকে পুনর্বাসন করা হয় ২০১৫ সালে। কিছু একটা করার জন্য সে সময় তাঁকে অনুদান দেওয়া হয়। তাঁর মতো আরো অনেককেই অনুদান দেওয়া হয়েছি। আর প্রকল্পের উদ্দেশ্য যাতে ব্যর্থ না হয় তা দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয় স্থানীয় এনজিও জাকস ফাউন্ডেশনকে। আবু বক্কর আজ স্বাবলম্বী। তার পরও এখনো আবু বক্করকে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে থাকে তারা। এনজিওটি গরু-ছাগল কিনে আবু বক্করের প্রজনন কেন্দ্র স্থাপনেও সহায়তা করে।

আবু বক্করের মতো আরো অনেকে পিকেএসএফের অনুদানের টাকায় ভিক্ষা ছেড়ে আজ স্বাবলম্বী। এদের একজন জয়পুরহাট ধলাহারের নিত্তিপাড়ার সোফিয়া বেওয়া। তিনিও বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভিক্ষা করতেন। এখন আর তিনি ভিক্ষা করেন না। প্রয়োজনও পড়ে না। কারণ তিনি স্বাবলম্বী। আর তিনি যে স্বাবলম্বী সেটা তাঁর বাড়ির চকচকে চেহারা দেখলেই আন্দাজ করা যায়।

সরেজমিনে সোফিয়া বেওয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, টিন ও ছন দিয়ে তৈরি একটি ঘরে থাকেন তিনি, তাঁর মেয়ে ও মেয়ের জামাই। বাড়ির চারপাশ বেড়া দিয়ে ঘেরা। ভেতরে প্রবেশের পথে চাটাই দিয়ে সুন্দর করে গেট বানানো। সেখানে আবার পাতাবাহার গাছ লাগানো। উঠানের এক পাশে ফুলের গাছ, অন্য পাশে কেঁচো কম্পোস্ট প্লান্ট, কবুতরের বাক্স, মুগরির খোঁয়াড়, হাঁসের খামার ও গরু রাখার জায়গা। দুটো গাভী দিয়ে শুরু হয়েছিল তাঁর যাত্রা। এখানেও অনুদান দিয়েছিল পিকেএসএফ। তাঁর সঙ্গে অল্প কিছু টাকা যোগ করে তাঁকে গাভী কিনে দিয়েছিল ওই এনজিও। দুধ বিক্রি করে প্রথমে সংসার চালানো শুরু করেন। দুই বছরের মাথায় তাঁর এখন অনেক কিছু হয়েছে।

মেয়ের জামাই অন্যের জমি চাষ করে ফসল ফলান। আর মা-মেয়ে মিলে সামলান অন্য সব। এ দিয়েই আজ তাঁরা স্বাবলম্বী।

নিজের বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ সুফিয়া জানান, ভিক্ষার কাজ করলে মানুষ অনেক কথা বলে। খারাপ চোখে দেখে। আগে মানুষ যতটা কটাক্ষ করত এখন তার চেয়েও বেশি মানুষ তাদের পছন্দ করে। ভিক্ষা করতে তাঁর ভালো লাগত না। তাই এ রকম একটি সুযোগ পেয়ে সব ফেলে পরিশ্রম শুরু করেন।

পিকেএসএফ জয়পুরহাটের ধলাহার ইউনিয়নের মোট ১০ জনকে অনুদান দিয়েছিল। এর মধ্যে ছয়জনই পেশা বদল করেছেন। বাকি চারজন অনুদানের টাকা দিয়ে তাঁদের ভাগ্য ফেরাতে পারেননি।

পিকেএসএফ সূত্রে জানা গেছে, সমৃদ্ধি কর্মসূচির বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যে ‘ভিক্ষুক পুনর্বাসন’ একটি। ২০১৫ সালে শুরু হওয়া এই পুনর্বাসন কার্যক্রমের আওতায় সারা দেশে ৮৩৭ জন ভিক্ষুককে অনুদান দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৬০০ জনেরই সম্পত্তির বর্তমান পরিমাণ জনপ্রতি প্রায় দেড় লাখ টাকা বা তারও বেশি। সম্পদের সঠিক ব্যবহার করতে না পারায় বাকিরা সফল হতে পারেননি।

জয়পুরহাট অঞ্চলে সরেজমিনে এসব কার্যক্রম পরিদর্শনের সময় পিকেএসএফের পুনর্বাসন কার্যক্রম মনিটরিংয়ের দায়িত্ব পালনকারী এনজিও জাকস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক নূরুল আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভিক্ষার কাজটি লজ্জার। ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িতদের সমাজের মূল অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত করার কাজটা বেশ কঠিন। তবে আমরা এই অঞ্চলে পিকেএসএফের নির্দেশনামতো নিয়মিত মনিটরিং করছি।’

পিকেএসএফ চেয়ারম্যান ড. খলীকুজ্জমান টেলিফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, কাউকে অনুদান দিয়ে ছেড়ে দিলে সেটার গুরুত্ব কমে যায়। এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত মনিটরিং। এটা করার কারণেই ভিক্ষুক পুনর্বাসন কার্যক্রমে খুব ভালো সফলতা এসেছে। এর মাধ্যমে ভিক্ষুকরা স্বাবলম্বী হয়ে অর্থনীতির মূল স্রোতে ফিরছে।

পিকেএসএফের দাবি, তাদের সমৃদ্ধি কর্মসূচির মধ্যে সফল একটি কার্যক্রম হলো ভিক্ষুক পুনর্বাসন। প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই কার্যক্রমে সফলতার হার প্রায় ৭২ শতাংশ।


মন্তব্য