kalerkantho


চট্টগ্রামে ১০টি গ্রেনেডসহ নব্য জেএমবির দুই সদস্য গ্রেপ্তার

নারী ওসি থাকায় সদরঘাট থানায় হামলার ছক ছিল

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



চট্টগ্রামে ১০টি গ্রেনেডসহ নব্য জেএমবির দুই সদস্য গ্রেপ্তার

চট্টগ্রাম নগরের একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে ১০টি তাজা গ্রেনেডসহ নব্য জেএমবির দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সদরঘাট থানা এলাকার বালুমাঠের কাছে পোর্ট সিটি হাউজিং সোসাইটির মিনু ভবনের পাঁচতলার একটি বাসায় গত সোমবার মধ্যরাতে অভিযান চালায় চট্টগ্রাম নগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পরিদর্শক আফতাব হোসেন জানিয়েছেন, জঙ্গি আস্তানা

 থেকে উদ্ধারকৃত ১০টি গ্রেনেড গতকাল মঙ্গলবার সকালে পুলিশ লাইনস মাঠে নিয়ে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। নিজেদের তৈরি এসব গ্রেনেড শক্তিশালী ছিল। এগুলো ওই আস্তানায় তৈরি হয়নি। অন্য কোথায় তৈরি করে এখানে আনা হয়ে থাকতে পারে।

জঙ্গি গ্রেপ্তারের ঘটনায় গতকাল দুপুরে নগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) উপকমিশনার মো. শওকত আলী সংবাদ সম্মেলন করেন। এই সময় তিনি বলেন, ‘জঙ্গিরা সদরঘাট থানাকে টার্গেট করে আত্মঘাতী হামলার জন্য জড়ো হয়েছিল। কিন্তু নগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট গোয়েন্দা তৎপরতা চালিয়ে জঙ্গিদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয় এবং তাদের গ্রেপ্তার করতে সমর্থ হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ওই বাসায় চারজনের আনাগোনা ছিল বলে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। দুজনকে গ্রেপ্তার করা গেছে। তাদের কাছ থেকে ১০টি তাজা শক্তিশালী গ্রেনেড পাওয়া গেছে।’

গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে একজন হলো নব্য জেএমবির (জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ) সদস্য মো. আশফাকুর রহমান (২২)। সে ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার শিলাশী গ্রামের আনিসুর রহমানের ছেলে। তার ছদ্মনাম আবু মাহিব আল বাঙালী ওরফে রাসেল ওরফে সেলেবি তিতুশ। তার সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া অন্যজন হলো মো. রকিবুল হাসান জনি (১৯)। সে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার কোদালা কাটা সরকার বাড়ির মো. জসিম উদ্দিনের ছেলে। তার ছদ্মনাম সালাহ উদ্দিন আয়ুবী, আবু তাছিব আল বাঙালী ও হাসান।

গ্রেপ্তারকৃত দুই জঙ্গির বিরুদ্ধে সদরঘাট থানায় একটি মামলা করেছেন নগর পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটের সদস্য রাজেস বড়ুয়া। এরপরই তাদের চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আবু ছালেম মো. নোমানের আদালতে সোপর্দ করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে আদালত সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান নগর ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার এ এ এম হুমায়ুন কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জঙ্গি কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা করা হবে।

যেভাবে অভিযান : জঙ্গি গ্রেপ্তার অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা কালের কণ্ঠকে বলেন, কয়েক মাস আগে চকবাজার থানা এলাকার অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ নিখোঁজ হয়। তার বাবা চকবাজার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।

এ ডায়েরির সূত্র ধরে নগর ডিবি আবদুল্লাহকে খুঁঁজতে থাকে। একপর্যায়ে পুলিশ জানতে পারে, সে নেত্রকোনার কমলাকান্দায় চলে গেছে। এরপর পুলিশ আবদুল্লাহর মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে অন্য কয়েকটি নম্বর পায়। সেই সূত্র ধরেই অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে কর্মকর্তারা কিছু সন্দেহভাজন ব্যক্তির তৎপরতা শনাক্ত করতে সক্ষম হন। এরপর ওই সব ব্যক্তির অবস্থান চিহ্নিত করতে গিয়ে কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন, সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় নিয়মিত যাতায়াত করে। এরই মধ্যে ওই সব জেলায় জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া হয়। প্রায় এক সপ্তাহ আগেই সদরঘাট থানার পোর্ট সিটি হাউজিং এলাকায় সন্দেহভাজন জঙ্গিদের অবস্থান বিষয়ে নিশ্চিত হয় কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। এরপর থেকেই চলে অভিযানের পরিকল্পনা। সেই অনুযায়ী সোমবার রাতে অভিযান শুরু করা হয়। ভবনটির মালিককে নিয়ে সন্দেহভাজন জঙ্গিদের ভাড়া নেওয়া ওই বাসায় টোকা দেয় অভিযানকারী দল। এ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। ভেতর থেকে দরজা খুলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঢুকে পড়ায় জঙ্গিরা হামলা বা পালানোর সুযোগ পায়নি। পরে বাসায় তল্লাশি করে ১০টি তাজা গ্রেনেড, দুটি সুইসাইড ভেস্ট, দুটি মোবাইল ফোনসেট উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া দুটি হাতে আঁকা মানচিত্র পাওয়া গেছে, যার একটিতে সদরঘাট থানা এবং অন্যটিতে সদরঘাট থানার আশপাশের এলাকাসহ সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার তথ্যের উল্লেখ রয়েছে।

কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা জানান, মোবাইল ফোনসেট পরীক্ষা করে দেখা গেছে, জঙ্গিরা বিশেষ একটি অ্যাপস ব্যবহার করে নিজদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে। বিভিন্ন ছদ্মনামে তারা ওই অ্যাপস ব্যবহার করে। অ্যাপসে পাওয়া কিছু কথোপকথনে দেখা গেছে, সেখানে ‘তাগুত’, ‘হিযরত’ শব্দগুলোর বহুল ব্যবহার আছে। এ ছাড়া আটক করা দুজনই দীর্ঘদিন আগেই নিজদের বাড়ি ছেড়েছিল। তাদের মধ্যে রকিবুলের জেএসসির একটি সনদও পাওয়া গেছে। সে ২০১৩ সালে জেএসসি পাস করে।

আত্মঘাতী হামলার নিশানা থানা : পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা জানিয়েছে, সদরঘাট থানার ওসি একজন নারী। তারা (জঙ্গি) নারী নেতৃত্ব মানে না। এ কারণে সদরঘাট থানায় হামলার পরিকল্পনা করেছে। তাদের দলে নব্য জেএমবির ছয়-সাতজন সদস্য আছে। এই দলটির নেতৃত্বে আছে ‘ডন’। এই ডনের সঙ্গে তাদের কখনোই দেখা হয়নি। তাদের মধ্যে যোগাযোগ হয় শুধু মোবাইল ফোনের বিশেষ অ্যাপসের মাধ্যমে। দুজনের ভাষ্য অনুযায়ী, ডন তাদের হামলার নির্দেশনা দিয়েছে।

তবে থানায় হামলার পরিকল্পনার পেছনে জঙ্গিরা যে কারণের কথা বলছে সেটা পুরোপুরি বিশ্বাস করছেন না পুলিশ কর্মকর্তারা।

চট্টগ্রাম নগর পুলিশে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, ‘ডন’ ছদ্মনাম ধারণ করে জেএমবির কোনো শীর্ষ নেতা মূলত প্রতিশোধ নিতেই সদরঘাট থানাকে নিশানা করে থাকতে পারে। কর্মকর্তারা মনে করছেন, জেএমবি চট্টগ্রামে পুনরায় নাশকতা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই কারণেই সদরঘাট থানায় হামলা করেই সেটা শুরু করার চেষ্টা চালাতে পারে।

থানাকে নিশানা করার কারণ হিসেবে পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করছেন, ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে সদরঘাট থানা এলাকায় জেএমবির তহবিল জোগান দেওয়ার লক্ষ্যে ছিনতাই করেছিল ফারদিনের নেতৃত্বাধীন জেএমবির একটি দল। কাছাকাছি সময়ে বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকার ল্যাংটা ফকির ও খাদেমকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ছিনতাইয়ের ঘটনার অনুসন্ধান করতে গিয়েই নগর গোয়েন্দা পুলিশ কর্ণফুলী থানার খোয়াজনগর এলাকায় একটি বাসা থেকে গ্রেনেডসহ জেএমবি সদস্য বুলবুল আহমেদ ফুয়াদ, সুজন, মাহবুবুর রহমান খোকন, শাহজাহান ও জাবেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ওই সময় ‘গ্রেনেড বিস্ফোরণে’ জাবেদের মৃত্যু হয়েছিল। এর পরই চট্টগ্রামে জেএমবির কার্যক্রম কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছিল। এরপর চট্টগ্রামে জেএমবি বড় ধরনের নাশকতা চালাতে পারেনি।

তবে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছরের মার্চ মাসে চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সীতাকুণ্ড এলাকায় জেএমবির আস্তানার সন্ধান পেয়েছিল পুলিশ। সেই ঘটনার প্রায় ১০ মাস পর পুনরায় নব্য জেএমবির আস্তানা পাওয়া গেল চট্টগ্রামে। সদরঘাট থানার যেই এলাকা থেকে জেএমবির আস্তানাটি শনাক্ত করা হয়েছে, সেটা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়। সহজেই আত্মগোপনের সুযোগ আছে। এ কারণেই নব্য জেএমবি হামলার পরিকল্পনা করে থাকতে পারে। এ ছাড়া সদরঘাট থানার পাশেই নগর ট্রাফিক পুলিশের কার্যালয়। এ ছাড়া সেখানে একটি মসজিদ আছে। তাই ওই এলাকায় সহজেই প্রবেশ করা যায়। এ কারণেই সদরঘাট থানায় হামলা করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল ভেঙে দিতে চেয়েছে জেএমবি।

ভুয়া আইডি কার্ড দিয়ে বাসা ভাড়া : জঙ্গিরা গত অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে পরিবহন ব্যবসায়ী ইব্রাহীম মান্নান মিনুর কাছে গিয়ে বাসা ভাড়া চায়। এই সময় মিসবাহসহ দুজন এসেছিল। তারা নিজেদের টায়ার ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দেয়। ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে জাতীয়তা সনদপত্র নিয়ে ভবনের পাঁচতলার একটি কক্ষ (ব্যাচেলর কক্ষ হিসেবে পরিচিত) ভাড়া দেন ভবনের মালিক। কিন্তু গতকাল অভিযানের সময় মেসবাহসহ অন্য যাদের যাতায়াত ছিল তাদের পাওয়া যায়নি। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রকে ভুয়া বলে ধারণা করছে পুলিশ।



মন্তব্য