kalerkantho


আ. লীগের শক্তি উন্নয়ন স্রোত বিএনপি হানা দিতে মরিয়া

এমরান হাসান সোহেল ও জসীম পারভেজ   

১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আ. লীগের শক্তি উন্নয়ন স্রোত বিএনপি হানা দিতে মরিয়া

পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনটি আওয়ামী লীগের অন্যতম দুর্গ। বিতর্কিত নির্বাচন বাদ দিলে সংসদীয় এ আসনে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীরাই বিজয়ী হয়েছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই আসনে উন্নয়ন অবকাঠামো ব্যাপকভাবে গড়ে ওঠায় দলটি অনেক সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আছেন বর্তমান এমপি মাহবুবুর রহমান, বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা আলাউদ্দিন আহমেদ ও সাবেক এমপির ছেলে আবদুল্লাহ আল ইসলাম লিটন। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতিতে যখন এই সম্ভাব্য প্রার্থীরা সবাই সোচ্চার, তাঁদের ঘাঁটিতে আঘাত হানতে মরিয়া আরেক শক্তিমালী রাজনৈতিক দল বিএনপি। দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আছেন এ বি এম মোশাররফ হোসেন, উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক ও পটুয়াখালী জেলা বিএনপির সহসভাপতি মো. মনিরুজ্জামান মনির।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত সরকারের সময়েই এখানে স্থাপন করা হয়েছে পূর্ণাঙ্গ নৌঘাঁটি। অর্থনীতিতে নতুন দিগন্তের অঙ্গীকার নিয়ে উন্মোচন হয়েছে দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পায়রা। একাধিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে কলাপাড়ায়। আন্তর্জাতিকমানের পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণের জন্য কুয়াকাটাকে ঘিরে মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সর্বোচ্চ গতির ইন্টারনেট সার্ভিস প্রদানে স্থাপন করা হয়েছে সাবমেরিন ল্যান্ডিং স্টেশন।

দুইটি পৌরসভা ও ১৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনটি। মোট ভোটারসংখ্যা দুই লাখ ৪৩ হাজার ৩৫১ জন। এর মধ্যে কলাপাড়া উপজেলার দুটি পৌরসভা (কলাপাড়া ও কুয়াকাটা) ও ১২টি ইউনিয়নে মোট ভোটারসংখ্যা এক লাখ ৬৮ হাজার ৫৩৪। রাঙ্গাবালী উপজেলায় পাঁচটি ইউনিয়নে রয়েছে ৭৪ হাজার ৮১৭ জন ভোট। আওয়ামী লীগ : বর্তমান এমপি মাহবুবুর রহমান, বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা আলাউদ্দিন আহমেদ ও সাবেক এমপির ছেলে আবদুল্লাহ আল ইসলাম লিটন এ আসনে আওযামী লীগের প্রধান সম্ভাব্য প্রার্থী। বর্তমান এমপি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মাহবুবুর রহমান ২০০১, ২০০৮  ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। আয়েশী মন্ত্রিত্ব নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়ায়। অভিযোগ ওঠে নিয়োগ বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য ও জমি দখলের। নিজে একা নন, তাঁর স্ত্রী প্রীতি হায়দারও দুর্নীতি মামলার আসামি। ফলে দলের একটি বড় অংশের সঙ্গে তাঁর এখন যোজনযোজন দূরত্ব। তবু রাজনীতির মাঠ ছাড়েননি তিনি। দলীয় কর্মীদের মন জুগিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘কলাপাড়া আওয়ামী লীগকে দুর্বল অবস্থা থেকে শক্তিশালী করেছি। যার ফলে ২০০১ সাল থেকে টানা তিনটি সংসদে এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেছি। ১৫ বছর আমি মানুষের সেবা করেছি। এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। পায়রা সমুদ্রবন্দর এখন দৃশ্যমান। কুয়াকাটা পর্যটনকেন্দ্রকে মাস্টারপ্ল্যান অনুসারে গড়ে তোলা হচ্ছে। তিনটি কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে। সর্বোচ্চ গতির ইন্টারনেট সার্ভিস প্রদানে স্থাপন করা হয়েছে সাবমেরিন ল্যান্ডিং স্টেশন। আমি আশাবাদী পুনরায় আমাকে দল মনোনয়ন দিলে নির্বাচিত হয়ে অসম্পূর্ণ উন্নয়নগুলো সম্পন্ন করব।’

দীর্ঘ বছর কলাপাড়া আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে সাফল্যের সঙ্গে নতৃত্ব দিয়েছেন আলাউদ্দিন আহমেদ। ক্লিন ইমেজের কারণে সাধারণ মানুষের প্রিয়পাত্র তিনি। আলাউদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে জানান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন, এর আগে ১৯৬৬ ও ’৬৯-এর রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহেও বড় ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত কলাপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা ভোগ নয় ত্যাগে বিশ্বাসী হয়ে দলকে সুসংগঠিত করে। ইতিমধ্যে তিনি যদিও আমেরিকা যান, ১৯৯৬ সালে স্থানীয় নেতাকর্মীদের প্রত্যক্ষ সমর্থনে পুনরায় কলাপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। আমেরিকায় থাকাকালীনও তিনি সাংগঠনিক কারিশমা দিয়ে দলকে উজ্জীবিত করেন। সেখানকার নেতাকর্মীরা তাঁকে মেট্রো ওয়াশিংটন আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব অর্পণ করে। উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অনুপ্রেরণায় স্থায়ী বসবাসের জন্য তিনি আবারও কলাপাড়য় ফিরে এসেছেনে। আলাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর কন্যা ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়াতে এবং ভিশন ২১ ও ৪১ বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার জন্য আমি দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে কলাপাড়া ও রাঙ্গাবালী উপজেলায় কাজ করেছি। আশা করছি দল আমাকে মূল্যায়ন করবে এবং দলীয় মনোনয়ন আমি পাব এ ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।’ স্থানীয় আওয়ামী লীগের অনেকেই মনে করেন, আলাউদ্দিন আহমেদকে মনোনয়ন দিলে তিনি ব্যক্তি ইমেজের সুবাদে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হবেন।

এদিকে মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে দলের ভঙ্গুর দশায় কয়েক বছর ধরে মাঠে রয়েছেন সাবেক এমপি মরহুম আনোয়ারুল ইসলামের ছেলে কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক আবদুল্লাহ আল ইসলাম লিটন। বাবার আদর্শকে পুঁজি করে গ্রাম, ইউনিয়ন এবং দুই উপজেলায় গণসংযোগসহ শোডাউন করছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘কলাপাড়া ও রাঙ্গাবালীতে বঙ্গবন্ধুকন্যার নির্দেশে এবং নেতৃত্বে উন্নয়নের ইতিহাস রচিত হয়েছে। এতে অন্য কারো কৃতিত্ব নেই, স্রেফ জননেত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগ এবং তাঁরই কৃতিত। আমার বাবা এ আসনের এমপি ছিলেন। তিনি মানুষের জন্য নিবেদিত ছিলেন সব সময়। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কোনো বিতর্কিত কাজ করেননি। বাবার আদর্শ এবং নেত্রীর ভিশন বাস্তবায়নের সৈনিক হতে চাই। একাদশ সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নে নেত্রী আমাকে মূল্যায়ন করবেন সে বিশ্বাস আমার রয়েছে।’

এছাড়া একাদশ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন চাইতে পারেন জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অধ্যক্ষ মো. মহিবুর রহমান মহিব, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র এস এম রাকিবুল আহসান, ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহসভাপতি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ সৈয়দ নাসির উদ্দিন, উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল মোতালেব তালুকদার, কলাপাড়া পৌর মেয়র ও শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি বিপুল চন্দ্র হাওলাদার, যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহসম্পাদক মো. শমীম আল সাইফুল সোহাগ ও যুবলীগ ঢাকা মহানগর উত্তর সহসভাপতি মোরছালিন আহমেদ।

বিএনপি : কলাপাড়া বিএনপিতে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক ও কলাপাড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি এ বি এম মোশাররফ হোসেন, উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক ও পটুয়াখালী জেলা বিএনপির সহসভাপতি মো. মনিরুজ্জামান মনির মনোনয়নপ্রত্যাশী। এই তিন নেতার মধ্যে মনোনয়ন এবং নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ রয়েছে। তিনজনের মধ্যে মোস্তাফিজ এবং মনির এক গ্রুপে। তাঁদের এ বিরোধের কারণে কলাপাড়ায় দুই গ্রুপের দুটি দলীয় কার্যালয়। তবে মাঠপর্যায়ে শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে মোশাররফের। দলকে সুসংগঠিত করাসহ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ইতিহাস সৃষ্টির ক্ষেত্রে ওই আসনের দুই উপজেলা কলাপাড়া ও রাঙ্গাবালীর মাঠের নেতাকর্মীরা মনে করে মোশাররফের বিকল্প নেই। তাঁর নেতৃত্বেই দলের সিংহভাগ নেতাকর্মী ঐক্যবদ্ধ।

এ বি এম মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘বর্তমান সরকারের অত্যাচার-নির্যাতন ও হামলা-মামলায় নেতাকর্মীদের পাশে ছিলাম, ভবিষ্যতেও থাকব। সাংগঠনিক বিবেচনায় মনোনয়ন দেওয়া হলে আমি শতভাগ আশাবাদী। দলে বিভক্তি ও বিএনপির দুটি কার্যালয় প্রশ্নে তিনি বলেন, মূল স্রেতে সবাই ঐক্যবদ্ধ রয়েছে।’ অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘কলাপাড়া উপজেলা বিএনপির বর্তমান সভাপতি এ বি এম মোশাররফ হোসেন বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছিলেন। তাঁর কারণে নেতাকর্মীরা ও দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ কারণে ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের নিয়ে দলকে সুসংগঠিত করেছি। আশা করি দল আমাকে মূল্যায়ন করবে।’ মো. মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ‘আমার বাবা ১৯৭৯ সালে এ আসনের এমপি ছিলেন। দলের জন্য কাজ করছি। আশা করি মনোনয়নের দিক থেকে দল আমাকে মূল্যায়ন করবে।’

জাতীয় পার্টি : এ আসনে জাতীয় পার্টির অবস্থান খুবই নাজুক। তার পরও চলছে দলীয় তৎপরতা। উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি আমজাদ হোসেন হাওলাদার ও জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি মরহুম আবদুল রাজ্জাক খানের ছেলে হুমায়ুন কবির মাসুম খানের নাম শোনা যাচ্ছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একমাত্র মনোনয়নপ্রত্যাশী মুফতি আলহাজ হাবিবুর রহমান।


মন্তব্য