kalerkantho


বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক

মদনটাকের উত্তরসূরি

শাহীন আকন্দ, গাজীপুর   

২৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মদনটাকের উত্তরসূরি

বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে বাচ্চা দিয়েছে মদনটাক। ছবি : কালের কণ্ঠ

মদনটাক—বৃহদাকৃতির জলচর পাখি। জলবায়ু পরিবর্তন, অপ্রতুল বাসস্থান কিংবা খাদ্যচক্রের সমস্যার মতো নানা কারণে বর্তমানে মহাবিপন্ন এক পাখি। কয়েকটি দেশ থেকে এরই মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাংলাদেশে বড় নদ-নদী ও সুন্দরবনে কদাচিৎ এর দেখা মেলে। প্রতিকূল পরিবেশের কারণে মদনটাকের ডিম থেকে বাচ্চা ফোটার নজির দেশে নেই বললেই চলে। এ অবস্থায় একটা সুখবর এলো গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক থেকে। সেখানে দুই মাসের ব্যবধানে দুটি মদনটাকের চারটি ডিম থেকে বাচ্চা ফুটেছে।

প্রাণিবিদরা বলেছেন, বাংলাদেশে আবদ্ধ পরিবেশে মদনটাকের ডিম থেকে বাচ্চা ফোটার নজির এটাই প্রথম। ওই পার্কের বন্য প্রাণী বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক আনিসুর রহমান জানান, ডিম থেকে ফোটা মদনটাকের চারটি বাচ্চাই সুস্থ আছে।

ওই তত্ত্বাবধায়ক আরো জানান, ২০১৩ সাল থেকে বিভিন্ন সময় দেশের নানা স্থান থেকে ছয়টি মদনটাক সংগ্রহ করা হয়। এদের মধ্যে একটি গত অক্টোবরের মাঝামাঝিতে তিনটি ডিম দেয়। ২৮ দিন তা দেওয়ার পর গত ১৪ ও ১৫ নভেম্বর দুটি ডিম থেকে বাচ্চা ফোটে। একটি ডিম নষ্ট হয়ে যায়। তিনি দাবি করেন, দেশে আবদ্ধ পরিবেশে মদনটাকের ডিম থেকে বাচ্চা ফোটার নজির এটাই প্রথম। পরে আরেকটি পাখি গত নভেম্বরেই তিনটি ডিম দেয়। ৩০ দিন তা দেওয়ার পর গত ১৭ ও ১৮ ডিসেম্বর দুটি ডিম থেকে বাচ্চা ফোটে। একটি ডিম নষ্ট হয়।

সাফারি পার্কের সহকারী ভেটেরিনারি সার্জন ডা. নিজাম উদ্দীন চৌধুরী বলেন, ‘চারটি বাচ্চাই সুস্থ আছে। এগুলোকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।’

সাফারি পার্কের আরেক বন্য প্রাণী তত্ত্বাবধায়ক সরোয়ার হোসেন খান জানান, আলাদা সময় ফোটা চারটি বাচ্চাই ওদের মাকে ঘিরে থাকে সারাক্ষণ। মা-পাখি বাচ্চাদের ঠোঁটে তুলে খাওয়ায়। দুটি বাচ্চা ছুটতে পারলেও এখনো উড়তে শেখেনি। অন্য দুটি বাচ্চা বয়সে ছোট হওয়ায় কেবল মা-পাখিকে ঘিরে হাঁটে। তিনি জানান, খাদ্য হিসেবে প্রতিদিন বাচ্চাগুলোকে ছোট মাছ দেওয়া হয়।

গতকাল বিকেলে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে গিয়ে দেখা যায়, বয়সে ছোট দুটি বাচ্চা মাকে ঘিরে হাঁটছে। আবার কাছে গিয়ে মায়ের পালকের নিচে দাঁড়াচ্ছে। মা-পাখি ঠোঁটে মাছ তুলে নিলেই ছুটে যাচ্ছে বাচ্চাগুলো। কিছু সময় পর পর মা-পাখিও বাচ্চাদের ঠোঁটে তুলে দিচ্ছে ছোট মাছ।

আনিসুর রহমান জানান, ডিম থেকে ফোটার প্রায় তিন মাস পর একটি বাচ্চা উড়তে শেখে। তিনি আরো জানান, প্রজনন মৌসুম ছাড়া এরা সাধারণত একা চলাফেরা করে। এদের প্রজনন মৌসুম অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর।

বৃহদাকৃতির মদনটাকের সম্মুখাংশে নগ্ন বা টেকো মাথা এবং ঘাড় ছাড়াও বড় ধরনের অনুজ্জ্বল হলদে চঞ্চু রয়েছে। গড়পড়তা এদের দৈর্ঘ্য ৮৭ থেকে ৯৩ সেন্টিমিটার (৩৪ থেকে ৩৭ ইঞ্চি) হয়ে থাকে। ওজন চার থেকে ৫ দশমিক ৭১ কিলোগ্রাম। পায়ের উচ্চতা ১১০-১২০ সেন্টিমিটার (৪৩-৪৭ ইঞ্চি)। মদনটাক মাছ, ব্যাঙ, সরীসৃপ এবং অন্যান্য মেরুদণ্ডী প্রাণী খায়। কদাচিৎ এরা গলিত পচা মাংসও খেয়ে থাকে। এ ছাড়া ছোট ছোট পাখি ও ইঁদুরজাতীয় প্রাণীও প্রজনন মৌসুমে খাবার হিসেবে গ্রহণ করে। উঁচু বৃক্ষের শাখায় বাসা বেঁধে এরা ডিম পাড়ে। স্ত্রী মদনটাক সর্বোচ্চ চারটি ডিম দেয়। ২৮ থেকে ৩০ দিন তা দেওয়ার পর ডিম থেকে বাচ্চা ফোটে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে আবদ্ধ পরিবেশে মদনটাক পাখির ডিম থেকে বাচ্চা ফোটা নিঃসন্দেহে খুশির খবর। বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশেই চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এরা। জলবায়ু পরিবর্তন, বাসস্থান বিনষ্ট হয়ে যাওয়াসহ খাদ্যচক্রের সমস্যার কারণে মহাবিপন্ন এ পাখি। বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলে এদের অস্তিত্ব রক্ষা করা সম্ভব।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল মোতালেব হোসেন জানান, আবদ্ধ পরিবেশের মধ্যেও ডিম থেকে বাচ্চা ফোটায় আশা জেগেছে তাঁদের মধ্যে। যেকোনো মূল্যে এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখা হবে।



মন্তব্য