kalerkantho


বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সম্মেলনে বক্তারা

সরকার দিনবদলের সনদ থেকে বহুদূরে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



সরকার দিনবদলের সনদ থেকে বহুদূরে

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণের স্বপ্ন, সংবিধান এবং মহাজোটের নির্বাচনী ইশতেহার ‘দিন বদলের সনদ’ বাস্তবায়ন থেকে বর্তমান সরকার অনেক দূরে সরে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, বর্তমান সরকার দাবি করে তারা বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে গেছে। কিন্তু তারা ‘সমাজতন্ত্র’ কথাটি উচ্চারণ করতে লজ্জাবোধ করে। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষকতা ও জাতীয়তাবাদের কথা উচ্চারণ করে কালেভদ্রে। সমাজতন্ত্রকে তারা নির্বাসনে পাঠিয়েছে।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশে অর্থনীতি সমিতির ২০তম দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন।

সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের প্রথম সেশনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন খান বলেন, ‘মহাজোট সরকারের আমলে আর্থ-সামাজিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও আদর্শ অবস্থা থেকে দেশ এখনো অনেক দূরে আছে।’ তাঁর মতে, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার সামনে সবচেয়ে বড় বাধা আমলাতন্ত্র। সরকার আমলাতন্ত্রকে দায়িত্বশীল করার পরিবর্তে দায়মুক্তি দিতে ও আরো ক্ষমতাবান করার দিকে বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছে। বর্তমান সরকার সমাজতন্ত্র কথাটি ভুলেই গেছে এবং কথাটি বলতে লজ্জাবোধও করছে। তাঁর মতে, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে হলে সমাজতন্ত্রের পথে আসতে হবে। তবে তা অবশ্যই গণতান্ত্রিকভাবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাংকের বিভিন্ন আর্থিক কেলেঙ্কারিরও কঠোর সমালোচনা করেন মোয়াজ্জেম হোসেন খান।

তবে অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন খানের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, সম্পদ উৎপাদনের জন্য পুঁজিবাদ হলো কার্যকর পন্থা। তাই এটি ভালো। সমাজতন্ত্র তাত্ত্বিকভাবে হয়তো ভালো। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে এর আলোকিত উদ্দেশ্যগুলো অর্জন করা বেশ কষ্টসাধ্য।

দিনের অন্য সেশনে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টু দেশের অর্থনীতিবিদদের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে অর্থনীতিবিদদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও বর্তমান বাংলাদেশে তাঁরা সেই ভূমিকা পালনে পুরোপুরি ব্যর্থ। তাঁর মতে, একটি সমাজ ও রাষ্ট্র ধনী হোক আর গরিবই হোক, ওই সমাজে অর্থনীতি ও রাজনীতি দুটো অঙ্গ থাকবেই। কারণ, অর্থনীতির মাধ্যমে রাজনীতি বিকশিত হয় আর রাজনীতি অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। তিনি বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, কোনো বাজার আদর্শই রাজনীতিকে বাদ দিয়ে বিকশিত হতে পারে না।’

দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা মুষ্টিমেয় কয়েকজন নেতার হাতে কুক্ষিগত হয়ে গেছে। যার ফলে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া সরকারগুলো আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক রীতিনীতির কোনো তোয়াক্কা করছে না। তারা স্বৈরচারী আদলে দেশ চালাচ্ছে। এতে করে মানুষ শঙ্কিত ও সংশয়ে আছে। কারণ, বারবার সরকার বদল করেও তাদের দুর্ভোগ কমছে না। বরং বাড়ছে।’ তাঁর মতে, দেশে রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ হলো সমাজে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা।

দিনের আরেক সেশনে উঠে আসে দেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়ম ও প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টিও। সিলেট ক্যাডেট কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ জসীমউদদীন তাঁর প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, শিক্ষাব্যবস্থায় এখন করপোরেট সংস্কৃতি চালু হয়ে গেছে। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার সর্বস্তরের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান করপোরেট আদলে পরিচালিত হচ্ছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত। আর কতিপয় মুনাফালোভী ও সুযোগসন্ধানী ব্যক্তিকে লাভের পথ সুগম করে দিচ্ছে রাষ্ট্র কাঠামো। সরকার দেশ ও জাতির ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করে মুষ্টিমেয় ব্যক্তিকে সুবিধা করে দিতে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে ভঙ্গুর অবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। জসীমউদদীন বলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে এই সংস্কৃতি পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

‘সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন’ শিরোনামের এক প্রবন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ডেনভার বিশ্ববিদ্যালয়ের জোসেফ করবেল স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক হায়দার আলী খান বলেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে রেফারেন্ডাম বা গণভোটের ব্যবস্থা রাখতে হবে। নারী, সংখ্যালঘুদের মানবাধিকারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে এই গণভোট থাকতে পারে। তিনি বলেন, দেশে গণতন্ত্রকে গভীরতম করতে হলে বেশ কিছু অর্থনৈতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক শর্তের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তাঁর মতে, মতপার্থক্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল অবস্থানে থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভিন্ন দল ও মতকে প্রকাশ করার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, অন্যায় আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন হবে; ধর্মঘট হবে অহিংস বিক্ষোভ হবে। এসব প্রদর্শনে জনগণের জন্য পথ খোলা রাখতে হবে।

‘বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি বনাম মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি’ শিরোনামের আরেক প্রবন্ধে সিলেট ক্যাডেট কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ জসীমউদদীন বলেন, দেশে ক্রমেই বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার ঘটছে। আর এই বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে চরম স্বার্থপর করে তুলছে। এই স্বার্থের কাছে অর্থই সব। যদি প্রশ্ন করা হয়—দেশ থেকে কেন দুর্নীতি কমছে না; কেন দারিদ্র্য দূরীকরণ সম্ভব হচ্ছে না। কেন পোশাক শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। উত্তর হলো—বাণিজ্যি দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার। এটি এক ভয়াবহ বিপদ সংকেত।

‘দূষণ অর্থনীতি ও নৈতিকতা’ নিয়ে এক প্রবন্ধে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সদস্য ও শিক্ষক জহিরুল ইসলাম সিকদার বলেন, দেশে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা এবং অস্থিরতার কারণে পরিবেশ নিয়ে কম ভাবা হচ্ছে। সরকার এসব বিষয়ে কম মাথা ঘামাচ্ছে। মানুষকে শুধু সচেতন করে তুললেই হবে না, রাষ্ট্র রাষ্ট্রের প্রতিনিধি সংস্থা ও দপ্তরকে এগিয়ে আসতে হবে।

পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ‘জাতিসংঘ ঘোষিত ১৫ বছরমেয়াদি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা এসডিজি নিয়ে মন্ত্রীরা বলছেন এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে। আসলে মন্ত্রীদের বলা উচিত, এসডিজির লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমরা এটা করেছি।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশে অনেক গবেষণা হয়। কিন্তু ওই গবেষণালব্ধ জ্ঞান যাদের বাস্তবায়ন করার কথা, তারা তা করছে না।



মন্তব্য