kalerkantho


উদ্‌যাপন

স্মৃতির উদ্যানে বিজয়কেতন

নওশাদ জামিল ও রফিকুল ইসলাম   

১৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



স্মৃতির উদ্যানে বিজয়কেতন

বিজয় দিবস উপলক্ষে গতকাল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে শিল্পীদের মনোজ্ঞ নৃত্য পরিবেশনা। ছবি : লুৎফর রহমান

গায়ে লাল-সবুজের পোশাক কিংবা মাথায় জড়ানো পতাকা; তা না হলে গালে বা কপালে সেই বিজয়কেতন। গন্তব্য ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান (আগের রেসকোর্স ময়দান)।

সকাল থেকে ঢাকার স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ দল বেঁধে আসছিল এই উদ্যানে। কারো হাতে আবার ছিল বিজয়বার্তা লেখা স্টিকারও। কেউ কেউ এসেছিল স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশাল প্রতিকৃতি নিয়ে।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামতেই গতকাল শনিবার মহান বিজয় দিবসে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান রূপ নেয় বিশাল জনসমুদ্রে।

বীর বাঙালির সামনে মাথানত করে এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই পরাজয়ের সনদে সই করেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। তখন থেকে বিশ্ব মানচিত্রে নতুন দেশ—বাংলাদেশ।

বিজয়ের দিনে গতকাল সেই স্মৃতির উদ্যানে লাখো মানুষ শপথ নেয় দেশ গড়ার। সেই সঙ্গে ছিল নানা আয়োজন, উৎসব।

উদ্যানের শিখা চিরন্তন চত্বরে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ ’৭১ আয়োজিত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ উদ্যাপনের অনুষ্ঠানে কবিতা, নাটক ও কথামালায় স্মরণ করা হয় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। এতে মুক্তিযুদ্ধের গাথা ফুটিয়ে তুলেছিল নরসিংদীর পথশিশুদের নাট্যদল ‘বাঁধনহারা’। মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতার আলোকে নাটকে তুলে ধরা হয় মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলার শরণার্থীদের হাহাকার ও দুর্দিনের প্রতিচ্ছবি।

তা ছাড়া পিনপতন নীরবতায় অন্যদের সঙ্গে তরুণ প্রজন্ম দেখল একাত্তরের ভয়াবহতার চিত্র। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের আনন্দঘন মুহূর্তটিও দেখানো হয়।

মহান বিজয় দিবসের ৪৬তম বার্ষিকীতে গতকাল বিকেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতাস্তম্ভে ‘জেগে আছে বাংলাদেশ, লাখো শহীদের রক্তের শপথে’ স্লোগানে এবারের এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ ’৭১। অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন সংগঠনের মহাসচিব হারুন হাবীব। ‘রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি বাংলাদেশের নাম’ গান পরিবেশন করেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীরা। নটরাজের পরিবেশনায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক লায়লা হাসানের পরিচালনায় ছিল বিজয়ের গৌরব নৃত্যালেখ্য।

বক্তব্য দেন সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ ’৭১-এর ভাইস চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী ও পুলিশের সাবেক অ্যাডিশনাল আইজি নুরুল আলম।

রক্তের বিনিময়ে অর্জিত লাল-সবুজের পতাকার যথাযথ সম্মান ধরে রাখতে অনুষ্ঠানে নতুন প্রজন্মের হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দেন মুক্তিযোদ্ধারা। গান পরিবেশন করেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক বুলবুল মহলানবীশ ও ইফফাত আর নার্গিস।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থীদের উপস্থাপনায় ছিল ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ। একটি জিপে মিত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জগজিৎ সিং অরোরার কাছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আমির আবদুল্লা খান নিয়াজির আত্মসমর্পণের দৃশ্য তুলে ধরা হয়। এতে ফুটিয়ে তোলা হয় মঞ্চে প্রবেশের পর নিয়াজির মাথানত করে আত্মসমর্পণ দলিলে সই করে রিভলবার জমা দেওয়ার দৃশ্য।

তখন মঞ্চ থেকে ঘোষণা আসে, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পরাজিত হয় এবং আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু তাদের দোসররা এখনো দেশকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে। তারা দেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। আসুন সবাই তাদের অপতৎপরতাকে, রাজাকার-আলবদরদের রুখে দিই। উপস্থিত দর্শকের ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে তখন মুখরিত হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল।

মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আলম বলেন, নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানাতেই হবে। দীর্ঘ সংগ্রাম আর রক্তের বিনিময়ে এই দেশ অর্জিত হয়েছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা দল নিরপেক্ষ। আমাদের দল মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এই চেতনা ছড়িয়ে দিতে লাল-সবুজের পতাকা তরুণ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া হয়।’

হারুন হাবীব বলেন, ‘যুদ্ধে পরাজিত হয়ে এই ঐতিহাসিক ময়দানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। দীর্ঘ সময় যুদ্ধের পর আসে এই স্বাধীনতা। স্বাধীনতা রক্ষায় আমাদের সবাইকে সোচ্চার থাকতে হবে; যেন কোনো অপশক্তি মাথাচাড়া দিতে না পারে।’

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অন্য অংশে ‘বিজয়ের পতাকা হাতে চলি অবিরাম’ স্লোগানে বিজয় উদ্যাপন করেছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। এই আয়োজনে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাতে আলোচনাপর্বে আরো বক্তব্য দেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী।

এর আগে শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীদের ‘জাতীয় সংগীত’ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে বিকেল ৩টায় শুরু হয় বর্ণাঢ্য এ উৎসব। তাতে দলীয়ভাবে শিল্পীরা পরিবেশন করেন ‘আনন্দালোকে মঙ্গলালোকে’ ও ‘ধনধান্য পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’ গান। এরপর ‘একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার’ ও ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’ গান দুটির সঙ্গে দুটি সমবেত নৃত্য পরিবেশন করে শিল্পকলা একাডেমির নৃত্যশিল্পীরা।

এই পরিবেশনা শেষে মঞ্চে আসে ঢাকা সাংস্কৃতিক দল। তারা সমবেতভাবে পরিবেশন করে ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ ও ‘পশ্চিম দেশের গোসাই ঠাকুর’। এরপরে দীপা খন্দকারের পরিচালনায় আবারও নৃত্য নিয়ে আসে শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীরা। ‘হায়রে আমার মন মাতানো দেশ’ গানটির সঙ্গে নাচের মুদ্রার শৈল্পিকতায় সমগ্র আয়োজনকে বর্ণাঢ্য করে তোলে এই নাচিয়েরা।

এরপর পর্যায়ক্রমে সরকারি সংগীত কলেজ সমবেতভাবে পরিবেশন করে ‘তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দিবোরে’।

ত্রিপুরা থেকে আগত শিল্পী ত্রিপুরা পায়েল তাদের দেশাত্মবোধক একটি গান শোনানোর পাশাপাশি গেয়ে শোনান ‘আমার মন পাখিটা যায়রে উড়ে যায়’।

রবীন্দ্রনাথের ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলরে’ সমবেতভাবে পরিবেশন করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এককভাবে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা শাহীন সামাদ গেয়ে শোনান ‘বাংলা আমার জন্মভূমি, ‘এই শিকল পরা ছল’ ও ‘মানবো না বন্ধন মানবো না’—তিনটি গান।

এ ছাড়া সংগীত পরিবেশন করেন কাজল দেওয়ান, হৈমন্তী রক্ষিত, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, রফিকুল আলম ও তিমির নন্দী।

শতকণ্ঠে শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীরা পরিবেশন করে ‘বিজয় নিশান উড়ছে ঐ’ গানটি।

এ ছাড়া ব্যান্ডের গান নিয়ে সমগ্র আয়োজনকে উজ্জীবিত ও উদ্দীপ্ত করে তোলে ব্যান্ড দল ‘দলছুট’ ও ‘সোলস’। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ফোকসম্রাজ্ঞী ও সংসদ সদস্য মমতাজের গান।


মন্তব্য