kalerkantho


দালালের দৌরাত্ম্যে প্রতারিত রোগীরা

পার্থ সারথী দাস, ঠাকুরগাঁও   

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



দালালের দৌরাত্ম্যে প্রতারিত রোগীরা

বিস্ময়কর পরিবর্তন! অনেক দিন ধরে চলে আসা অনিয়ম উধাও। হঠাৎ করেই পাল্টে গেছে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালের চিত্র। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা না বাজতেই খোলা হয়েছে চিকিৎসকদের কক্ষ। খুলে গেছে পুরুষ ও মহিলাদের টিকিট কাউন্টারও। মিনিট দশেক পরই হাসপাতালে একে একে আসতে শুরু করেন দায়িত্বরত চিকিৎসকরা।

মাত্র দুই দিন আগেই দুপুর নাগাদও চিকিৎসকদের দেখা মেলেনি হাসপাতালে। ঠাকুরগাঁও সদর তো বটেই, জেলার বিভিন্ন উপজেলা এমনকি পার্শ্ববর্তী অন্য জেলা থেকেও সাতসকালে রোগীরা এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতেন। আর গতকাল সকাল ১০টা না বাজতেই বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টারের ভেতরে বসে যান হাসপাতালের কর্মচারীরা। আর কাউন্টারের বাইরে রোগীরা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করেন।

দীর্ঘদিনের অনিয়ম কেমন করে রাতারাতি পাল্টে গেল? এ নিয়ে কথা হলো হাসপাতালের এক চিকিৎসকের সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘গত মঙ্গল ও বুধবার কালের কণ্ঠে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালের বিভিন্ন অনিয়ম ও রোগীদের ভোগান্তি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর টনক নড়েছে কর্তৃপক্ষের। অনিয়ম দূর করতে সম্ভবত শীর্ষপর্যায় থেকে চাপও এসেছে। এরই ধারাবাহিকতায় হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে বলা হয়েছে।’

হাসপাতালের বহির্বিভাগে গতকাল সকাল ১১টার দিকে শতাধিক রোগীর ভিড় দেখা গেল। কেউ এসেছেন শিশুসন্তান নিয়ে, কেউবা বৃদ্ধ মা-বাবাকে নিয়ে এসেছেন চিকিৎসা করাতে। বেশ কয়েকজন চিকিৎসকের কক্ষের সামনেও দেখা যায় রোগীর দীর্ঘ লাইন। রোগীরা টিকিট কেটে ডাক্তার দেখাচ্ছেন। ব্যবস্থাপত্র নিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন।

তবে এত কিছু ইতিবাচক দৃশ্যের মাঝেও চোখে পড়ল একদল তরুণ-যুবকের অপতত্পরতা। সময় তখন দুপুর প্রায় ১টা। চিকিৎসকের কক্ষ থেকে রোগীরা বের হয়ে আসতে না আসতেই কিছু ব্যক্তি ঘিরে ধরছে। তারা রোগীদের সস্তায় ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী পাইয়ে দিতে নানা প্রলোভন দেখাচ্ছে। বিভিন্ন ক্লিনিকে রোগী ভাগানোর পাঁয়তারা করছে। তারা সবাই এই হাসপাতালকেন্দ্রিক

দালালচক্রের সদস্য। তাদের সংখ্যা প্রায় ৪০ জন। তাদের মধ্যে শামিম, শাহীন, বাবু, পরিমল, নঈম, সালেহা, সুফিয়া, মনোয়ারা এখানে নিয়মিত। এসব দালালের খপ্পরে পড়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন বিশেষত গ্রাম থেকে আসা রোগীরা।

কথা হলো প্রতারণার শিকার কয়েকজনের সঙ্গে। তাঁদের একজন আনিসুর রহমান সদর উপজেলার রুহিয়া কুজিশহর থেকে বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে এসেছেন হাসপাতালে। টিকিট কেটে সময়মতো ডাক্তারও দেখিয়েছেন। ওষুধ কিনতে যাওয়ার পথে হাসপাতালের বহির্বিভাগের বারান্দায় অপরিচিত এক যুবক এসে তাঁর হাত থেকে ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্রটি নিয়ে নেয়। এরপর খুব কম দামে ওষুধ কিনে দেওয়ার নাম করে হাসপাতালের বাইরের একটি ফার্মেসিতে নিয়ে যায়। সেখানে তিনি ৭৮০ টাকার ওষুধ কিনে হাসপাতালে ফিরে এসে তাঁর অসুস্থ বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করান। ঘণ্টাখানেক পর আনিসুর সেই চিকিৎসাপত্র নিয়ে হাসপাতালের বাইরে আরেকটি ফার্মেসির সেলসম্যানের কাছে গিয়ে ওষুধগুলোর দাম জানতে চান। সেলসম্যান সব ওষুধের দাম চান ৪১৫ টাকা। সেলসম্যানের এমন কথা শুনে তিনি হাসপাতালে এসে সেই যুবক দালালকে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও আর পাননি। আনিসুরের মতোই অনেকে প্রতিদিন দালালদের খপ্পরে পড়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। বিশ্বস্ত একটি সূত্রে জানা যায়, প্রতিটি চিকিৎসাপত্রের বিপরীতে দালালরা ফার্মেসি মালিকদের কাছ থেকে ১০ শতাংশ কমিশন পেয়ে থাকে।

দালালের এই দৌরাত্ম্য সম্পর্কে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুরোপুরি ওয়াকিবহাল। কিন্তু সব জেনেও এই চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কারণ এসব দালাল সরকারদলীয় কোনো না কোনো নেতার ছত্রচ্ছায়ায় রয়েছে। আর নেতাদের ক্ষমতার জোরে তারাও কাউকে পরোয়া করে না।

জানা গেল, দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধে জেলা পুলিশের সহায়তায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সার্বক্ষণিক একজন ডিবি পুলিশ নিয়োজিত রেখেছে। কথা হলো ডিবির দায়িত্বরত ওই সদস্যের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘এই হাসপাতালে কয়েকটি দালালচক্র রয়েছে। রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা করার সময় তিনি গতকাল দুপুরে শ্যামল নামের এক দালালকে হাতেনাতে ধরেন। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। তাত্ক্ষণিক খবর পেয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীরা এসে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান।’

ওই ডিবি সদস্য জানান, দালালদের ধরার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের নেতাসহ অনেকে এসে দালালদের ছেড়ে দিতে উল্টো চাপ সৃষ্টি করেন। ওই সব নেতার বক্তব্য—বেকার যুবকরা (দালাল) এই হাসপাতালে কিছু করে খাচ্ছে; তাতে আপনার কী সমস্যা হচ্ছে। তিনি আরো জানান, অনেক সময় চিকিৎসকের কক্ষ থেকেও তিনি দালালদের বেশ কয়েকবার ধরেছেন। আর এসব বিষয় তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বেশ কয়েকবার অবগতও করেছেন।

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হয় হাসপাতালের সিভিল সার্জন ডা. আবু মো. খায়রুল কবিরের সঙ্গে। মোবাইল ফোনে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘সব সমস্যার খুব দ্রুত সমাধান করা হবে। ইতিমধ্যে সবাইকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসক, সেবিকা ও কর্মচারীদের নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এর পরও কেউ কর্তব্যে অবহেলা করলে তার দায়ভার তাকেই নিতে হবে।’

স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের দাবি, বর্তমানে এক শ শয্যার এই হাসপাতালে জনবল সংকট প্রবল। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ দিয়ে চিকিৎসাসেবার মান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ তাদের। একই সঙ্গে তাদের প্রত্যাশা, হাসপাতালের চিকিৎসক, সেবিকা ও কর্মচারীরা নিজ কর্তব্য পালনে আরো দায়িত্বশীল হবেন। জনগণের চিকিৎসা সেবাদানে তাঁরা সাধ্যমতো চেষ্টা করবেন।



মন্তব্য