kalerkantho


টেংরাটিলার গোলাগুলি কানে বাজে আজও

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



টেংরাটিলার গোলাগুলি কানে বাজে আজও

মুক্তিযোদ্ধা সুশান্ত রঞ্জন

মুক্তিবাহিনীতে যাওয়ায় তাঁর গ্রামের বাড়ি লুটপাট করে সব নিয়ে গিয়েছিল রাজাকাররা। শহরের বাড়িটিও দখল করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা ক্যাম্প করেছিল। আর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর? গল্পটি আরো বিভীষিকার। রাজাকার হত্যা মামলায় সামরিক আদালত তাঁকে ফাঁসির দণ্ড দেন। সহযোদ্ধাদের প্রচেষ্টা ও যুদ্ধকালীন সাবসেক্টর কমান্ডারের সহায়তায় প্রাণ নিয়ে অবশ্য বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন। তবে ১৪ বছর তিন মাস কারাভোগ করতে হয়েছে। এ জন্য  সম্পত্তির বেশির ভাগ বিক্রি করতে হয়। আর এখন রোগেশোকে দুর্বিষহ জীবন অকুতোভয় এই যোদ্ধার।

সুশান্ত রঞ্জন ওরফে সাধন ভদ্রের জন্ম সুনামগঞ্জ শহরতলির ব্রাহ্মণগাঁও গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। এখন তাঁর বাস শহরের উকিলপাড়া এলাকায়। সঙ্গী বলতে নিজের টিনশেডের ক্ষয়িষ্ণু বাড়িতে স্ত্রী ও দুই সন্তান এবং মুক্তিযোদ্ধা সংসদে আড্ডা মারতে আসে একাত্তরের সহযোদ্ধারা। তিনি জেল, দুর্ভোগ ও নির্যাতনের গল্প করেন। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ের সেই গল্প বলতে গিয়ে হাসেন, কাঁদেন। ‘রাজাকারের পক্ষ নিয়ে জিয়াউর রহমান আমার জীবনটা নষ্ট করেছেন।’ সরাসরিই এ অভিযোগ করেন মুক্তিযোদ্ধা সাধন ভদ্র। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জিয়া মুক্তিযোদ্ধাদের পছন্দ করতেন না। আমার বৃদ্ধা মা তিনবার তাঁর কাছে আমার মুক্তির আবেদন নিয়ে গিয়েছিলেন। জিয়া ফিরিয়ে দেন। আমাকে ফাঁসিও দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেঁচে গেছি। আমার মুক্তির জন্য মা সব সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়েছিলেন। এখন বাবার যে সামান্য জমি আছে তার আয়ে আর মুক্তিযোদ্ধা ভাতায় কোনোমতে চলছে জীবন।’

কিভাবে যুদ্ধে জড়ালেন জানতে চাইলে স্মৃতি হাতড়ে সাধন ভদ্র বলেন, তিনি উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের দিনগুলোতেও মিছিলের কর্মী ছিলেন। একাত্তরে তিনি সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ছাত্র ইউনিয়নের সাংস্কৃতিক সম্পাদক। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ২৭ মার্চই সুনামগঞ্জে ঢুকে পড়ে এবং তখনই শুরু হয়ে যায় প্রতিরোধ যুদ্ধ। বিপদ আসন্ন বুঝে সাধন ভদ্র, শামছুল হক, আতম সালেহ, সাব্বির আহমদ মিনুসহ কয়েকজন বন্ধু তাঁদের অপর বন্ধু দেওয়ান মোসাদ্দেক রাজা চৌধুরীর বাসায় রাত যাপন করেন। ভোরে ঘুম থেকে তোলেন আবু মিয়া। আসন্ন বিপদের কথা জানিয়ে বলেন, ছাত্রনেতাদের তালিকা করে গতিবিধি ও নজরদারি চালানো শুরু হয়েছে। এক কাপড়েই বাসা থেকে বেরিয়ে হাওর পাড়ি দিয়ে নিজ গ্রাম ব্রাহ্মণগাঁওয়ে আসেন, যে গ্রামটিই পরবর্তী সময়ে শহরের শরণার্থীদের প্রথম আশ্রয়স্থল ছিল। বাড়িতে আসার পরই খবর পান সুনামগঞ্জে নির্বিচারে গুলি করছে হানাদাররা। কয়েকজন মারাও গেছে। মুক্তিকামী মানুষ প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে। বাড়িতে গরম ভাত, ডিম ও আলু সিদ্ধ খেয়ে তাড়াতাড়ি সুরমা নদী পাড়ি দেন বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে। ওঠেন আশাউড়ার জনৈক কালিবাবুর বাড়িতে। কালিবাবু তাঁদের আপ্যায়ন করে পরদিন বালাটের পথ দেখিয়ে দেন। কিছুদিন শরণার্থী শিবিরে থাকার পর সাধন ভদ্র দেখলেন দেশত্যাগী মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ আর মহামারিতে মৃত্যু উৎসব! এই অবস্থায় মনে খুব দাগ কাটে। বন্ধুরা সিদ্ধান্ত নেন মুক্তিযুদ্ধেই যাবেন। যুদ্ধে পাঠানোর জন্য অনুরোধ জানান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও আওয়ামী লীগ নেতা হোসেন বখত ও আলফাত উদ্দিন মোক্তারকে। তাঁরা বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলে সবুজ সংকেত দিলেন। এর মধ্যেই বন্ধুরা বালাট বিএসএফ ক্যাম্পের পাশে প্রস্তুতি সভা করলেন।

তখন মে মাস। রাতে একদিন দেওয়ান ওবায়দুর রেজা চৌধুরী ও হোসেন বখত তাঁদের ডেকে নেন। এক মাস ট্রেনিং শেষে শিলং ক্যান্টনমেন্টে নেওয়া হয় তাঁদের দলটিকে। তিনটি ভাগ করা হয়। একটি ভাগে সাধন ভদ্র, মোসাদ্দেক রাজা, আবু সুফিয়ান, মালেক হুসেন পীর, নওশাদ, বাদল, মতিউর, এসআই মানিককে রেখে সেলায় পাঠানো হয়। পাথরঘাট সংলগ্ন নির্জন স্থানে ক্যাম্প করেন তাঁরা। জঙ্গল পরিষ্কার করে কোনোমতে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। ২৫ জুন ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি অপারেশনের জন্য সাধন ভদ্রকে গ্রুপ কমান্ডার করে পাঠানো হয়। এটাই ছিল বালাট থেকে যাওয়া ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সেলায় (পরে সাবসেক্টর) প্রথম অপারেশন। নদী পাড়ি দিয়ে স্থানীয় গাইড মাইনুদ্দিনের সঙ্গে পাথরঘাট থেকে সিমেন্ট ফ্যাক্টরি অপারেশনের জন্য রওনা দেন। এর আগে দুপুরে ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা কর্নেল বখসি ডেকে নিয়ে মানচিত্র দেখিয়ে অপারেশনের জন্য প্রস্তুতির নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ক্যাপ্টেন চট্টোপাধ্যায়। গ্রেনেড, ৩০৩ রাইফেল, দুই ইঞ্চি মর্টার, একটি এলএমজি ছিল অপারেশন দলে। কিছুক্ষণ চলার পর হাদাটিলার কাছাকাছি তাঁদের থামিয়ে দেন গাইড এবং নিজে চলে আসেন। এবার বালিউড়া বাজারের এক দোকান কর্মচারীকে সঙ্গে নিয়ে সিমেন্ট ফ্যাক্টরির অভিমুখে রওনা দেন তাঁরা। স্বাধীনতার জন্য প্রথম অপারেশন। সঙ্গে এক প্লাটুন অসীম সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। উত্তেজনা ও আতঙ্কও ছিল। হাঁটতে হাঁটতে সিমেন্ট ফ্যাক্টরির উত্তরের জয়নগর টিলা থেকেই আক্রমণের নিশানা ঠিক করা হয়। একটু এগিয়েই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মধ্যে আতঙ্ক ধরাতে অনবরত ফায়ারিং করেন মুক্তিযোদ্ধারা। পাল্টা ফায়ার করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীও। কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। অপারেশন টাইম ছিল জিরো আওয়ার। কিন্তু পৌঁছতে বিলম্ব হওয়ায় প্রায় আধাঘণ্টা পর অপারেশন শুরু হয়। শেষে দুই ইঞ্চি মর্টার থেকে গোলা ছোড়েন নওশাদ। দুটি গোলা ছোড়ার পর মর্টারে ত্রুটি দেখা দেয়। এটা জানতে পেরে গ্রুপ কমান্ডার সাধন ভদ্র সবাইকে অপারেশন শেষ করে দ্রুত ফিরতে নির্দেশ দেন। ফিরে যান আবার পাথরঘাট ক্যাম্পে।

সাধন ভদ্র বলেন, ‘এই সময়ে শহীদ চৌধুরী ও মোজাহিদ বাহিনীর অনারারি ক্যাপ্টেন কবির আহমদ আনসার ও ইপিআরদের নিয়ে রেঙ্গুয়ায় ক্যাম্প স্থাপন করেন। এই বাহিনীর সঙ্গে রেঙ্গুয়ায় আমাদের যুক্ত করেন ক্যাপ্টেন চট্টোপাধ্যায়। তখনই খবর আসে সেলা সাবসেক্টরে বাঙালি এক অফিসার নিযুক্ত হয়েছেন। অধিনায়ক। নাম ক্যাপ্টেন এস এ হেলাল।’ তিনি বলেন, পাকিস্তানের শিয়ালকোট থেকে পালিয়ে ৫০ মাইল মোটরসাইকেল চালিয়ে ভারত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন হেলাল। তাঁর সঙ্গে মহব্বতপুরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হন সাধন ভদ্র। এই যুদ্ধে ৯ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। আহত হন অনেকে। এই যুদ্ধে মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরেন এস এ হেলাল। পরে টেংরাটিলা যুদ্ধেও সাধন ভদ্র অংশগ্রহণ করেন। এখানে রাত-দিন টানা গুলি ও পাল্টা গুলি চলত মুক্তিযোদ্ধা ও পাকিস্তানিদের মধ্যে। বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদও হন। এখনো যেন টেংরাটিলার অবিরাম গোলাগুলি কানে বাজে—বলেন সাধন ভদ্র। এ ছাড়া জুলাই মাসে দোয়ারাবাজার রসরাই অপারেশনেও সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করেন সাধন ভদ্র। সেসব স্মৃতি এখনো তাঁকে কাতর করে বলে জানান তিনি।

সাধন ভদ্র বলেন, ক্যাপ্টেন হেলাল সাবসেক্টর কমান্ডার হয়ে এসে তাঁকে শহীদ চৌধুরীর কম্পানিতে সহকারী কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। তাঁর কম্পানির নাম ছিল এফ কম্পানি। এভাবে বেশ কয়েকটি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন সাধন ভদ্র। যুদ্ধদিনের স্মৃতির মাঠ এখন অনেকটা ঝাপসা। তবু সহযোদ্ধাদের অনেকের কথা মনে পড়ে। বিশেষ করে টেংরা ও মহব্বতপুর যুদ্ধে শহীদ যোদ্ধাদের নিয়ে আসতে না পারায় আফসোস করেন এখনো।

সাধন ভদ্র জানান, যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে একের পর এক যুদ্ধে রত তখন তাঁর ব্রাহ্মণগাঁও গ্রামের বাড়ি লুট করে শান্তি কমিটির কোষাধ্যক্ষ রাজাকার অ্যাডভোকেট আব্দুল গণি ও অ্যাডভোকেট আফতর আলীর বাহিনী। তাঁর শহরের উকিলপাড়া বাসাও দখল করে নেয় পাকিস্তানি আর্মিরা। ডিসেম্বরের প্রথম দিকে ছাতক, গোবিন্দগঞ্জ, খুরমা, বিশ্বনাথ ও সিলেট হয়ে সুনামগঞ্জে ৯ ডিসেম্বর আসেন তিনি। এসে দেখেন শহর ও গ্রামের বাড়ি ছিন্নভিন্ন। জিনিসপত্র কিছুই নেই। দুটি বাড়িই ভূতুড়ে।

পঁচাত্তরপরবর্তী সময় সাধন ভদ্রের জন্য খুবই বিভীষিকার। একাত্তরে মানুষের বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংেযাগের কারণে অ্যাডভোকেট গণি রাজাকারের প্রতি এলাকার মানুষ চরম ক্ষুব্ধ ছিল। স্বাধীনতার পর গণি আত্মগোপনে চলে যায়, তবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে খুন হলে সে দাপটের সঙ্গে ফেরে। গণি নির্যাতনও করে সাধন ভদ্রের পরিবারকে। সাধন ভদ্র জানান, ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী রাজাকার আব্দুল গণিকে হত্যা করে। ১৫ আগস্টের পর থেকেই সাধন ভদ্র আত্মগোপনে ছিলেন; কিন্তু গণি রাজাকার হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে জেলে নেওয়া হয় তাঁকে। সাধন ভদ্র মনে করেন, এখানে জিয়াউর রহমানের রোষানল কাজ করেছে। তিনি বলেন, রাজাকার গণি হত্যার অভিযোগে ১৯৭৮ সালের ৮ নভেম্বর তাঁকে সামরিক আদালতে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। সাধন ভদ্রের যুদ্ধকালীন সাবসেক্টর কমান্ডার এস এ হেলাল উদ্দিন সামরিক আদালতের বিচারককে বুঝিয়ে শাস্তি যাবজ্জীবন না করালে ফাঁসিতেই ঝুলতে হতো। ১৯৮৯ সালে একটানা ১৪ বছর তিন মাস জেল খাটার পর ছাড়া পান ত্যাগী এই মুক্তিযোদ্ধা।

সুনামগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার আবু সুফিয়ান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাধনদা ছিলেন আমাদের সহকারী কমান্ডার। তাঁর উপস্থিত বুদ্ধি, দক্ষতার জন্য আমরা অনেক অপারেশন থেকে বেঁচে ফিরতে পেরেছিলাম।’ তিনি আরো বলেন, ‘পঁচাত্তরপরবর্তী সাধনদা ও তাঁর পরিবারের ওপর অনেক নির্যাতন হয়েছে। বিপদ থেকে বাঁচতে তিনি সহায়-সম্পত্তি সব বিক্রি করে এখন নিঃস্বপ্রায়। তাঁর উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন।’

 

 

 



মন্তব্য